ভোটের আসল রাজা নির্বাচন কমিশন, যে প্রতিষ্ঠান সংবিধান স্বীকৃত
ভোটের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অনেকেই নিজেদের রাজা-মহারাজা মনে করেন। সেটা হয়তো খুব একটা অসংগত নয়। কারণ ভোট গণনা মিটে যাবার পর তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কেন্দ্রে বা অঙ্গরাজ্যগুলিতে ভাগ্যবিধাতা বনে যান। ফলে ভোটের ঘণ্টা বেজে যাবার পর থেকেই তাঁরা রাজমহিমায় নিজেদের অলংকৃত করার আকাঙ্ক্ষা চেপে রাখতে পারেন না।
কিন্তু ভারতের মহান সংবিধান অনুযায়ী ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হবার পর থেকে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত সময়সীমার আসল রাজা হলেন নির্বাচন কমিশন। এই প্রতিষ্ঠানটি সংবিধান স্বীকৃত। অর্থাৎ তার কোনও মৃত্যু নেই। তাকে কখনওই লাটে তোলা যায় না। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। দেশে যখন জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়, তখন প্রেস কাউন্সিলের মতো অনেক সংস্থারই ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ এরা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়। কিন্তু তখনও নির্বাচন কমিশনের দরজায় তালা পড়েনি।
এই কমিশনের প্রধান চালিকাশক্তি কে? সেই শক্তিকে কখনও চোখে দেখা যায় না। কারণ রবীন্দ্রনাথ লিখিত ‘রক্তকরবী’-র রাজার মতোই সে অদৃশ্য এবং ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আমরা নির্বাচন কমিশনের যে কর্তাদের চোখে দেখতে পাই, তাঁরা হলেন বড়ো সর্দার, মেজো সর্দার বা ছোটো সর্দার। তবে তাঁরা সকলেই অদৃশ্য রাজার প্রতিনিধি। এঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এঁরা রাজার সমস্ত হুকুম শুনতে পান, কিন্তু নন্দিনী বা বিশু পাগলদের অভিযোগ তাঁদের কানে ঢোকে না।
সাহিত্যের উপমা ছেড়ে দিয়ে পাঁচ রাজ্যের ভোটপর্বের কথায় আসা যাক। দুটি ঘটনার কথা বলি। আসামের এক ভোট কেন্দ্রে ইভিএম মেশিন পাওয়া গেছে কোনো এক বিজেপি নেতার গাড়িতে। আর আমাদের রাজ্যে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে একটি বুথে ভোটদাতা যে বোতামই টিপছে তাতে ফুটে উঠছে বিজেপির পদ্মফুল। আসামের ঘটনায় কমিশন সাজা দিয়েছে নিচুতলার সেপাইদের – কোনও বড়ো বা মেজো সর্দারের টিকি ধরে টান পড়েনি। যে বিজেপি নেতার গাড়িতে মেশিন পাওয়া গেল, তিনিও সাজার বাইরে। আসলে নির্বাচন কমিশন সবসময় আত্মশুদ্ধিতে বিশ্বাস করে। তাতে গড়দান যায় ছোটো সেপাইদের। নন্দীগ্রাম নিয়ে অভিযোগ কমিশন গোড়াতেই উড়িয়ে দিয়েছে।
এইসব ঘটনার পরেই কমিশনের বড়ো সর্দারের একটি ফরমান জারি হয়েছে। ভোটের শুদ্ধতা বজায় রাখতে এবার নতুন একটি বিধি সামনে এসেছে। ভোটের পর যাবতীয় ব্যালট বাক্স বা ইভিএম মেশিন সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে স্ট্রং রুমে চলে যায়। এবারও তেমনটাই গেছে। কিন্তু এবার বিভিন্ন কেন্দ্রে গণনার আগেই কমিশনের পর্যবেক্ষকরা স্ট্রং রুমে ঢুকে মেশিনের প্রদত্ত ভোট এবং ভিভিপ্যাট সংখ্যা মিলিয়ে দেখবেন। তখন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির কোনও প্রতিনিধি থাকবেন না। কিন্তু এমন একটি সিদ্ধান্ত সর্বদলীয় বৈঠকে গৃহীত হয়েছে বলে শোনা যায়নি। ভারতের মতো দেশে সেটা বেশি প্রয়োজন, কারণ ইভিএম মেশিনের প্রযুক্তি নিয়ে দেশের আমজনতা আদপেই ওয়াকিবহাল নন। স্ট্রং রুম খোলার আগে সেখানেও সর্বদলীয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতি প্রয়োজন। যেমন ভোট গণনার সময় হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ততোধিক চমকপ্রদ। কারণ তার সঙ্গে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়িয়ে আছে। মহামান্য নরেন্দ্র মোদি গত শনিবার হুগলি জেলার হরিপালে ভাষণ দিয়ে বলেছেন, রাজ্যে বিজেপির সরকার প্রথম বৈঠকেই পিএম কিষাণ প্রকল্প কার্যকর করবে। সেই জন্য তিনি রাজ্যের অফিসারদের এখন থেকেই যাবতীয় কাগজপত্র তৈরি রাখতে বলেছেন। নির্বাচনী সভায় দাঁড়িয়ে তিনি নানা প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন, কিন্তু রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের কোনোরকম নির্দেশ দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই। যেহেতু এখানে নির্বাচনবিধি বলবত আছে। আসলে মোদির অভ্যেসটাই খারাপ হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দেশের নির্বাচন কমিশন তাঁর প্রতিশ্রুতি পর্ব শেষ হলে তবে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করে থাকে। এবারে পাঁচ রাজ্যের ভোটের আগেও তেমনটাই হয়েছে। কিন্তু ভোটের প্রচারে এসে প্রশাসনিক হুকুমনামা জারি করার তিনি কেউ নন।
কিন্তু ভারতের নির্বাচন কমিশন এই গুরুতর বিষয় নিয়েও সম্পূর্ণ চুপচাপ। কোনও বিধিভঙ্গের ঘটনা নিয়ে কেউ অভিযোগ না করলে কমিশন কিছুই শুনতে পান না। আবার অভিযোগ জমা দিলেও কমিশনের সর্দারেরা রাজার মর্জির খবর আগে জেনে নেন। এই রাজ্যে ১৯৭২ সালে যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল সেটাই তার বড়ো প্রমাণ। ১৯৭১ আর ১৯৭২-এর ফলাফল পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সেনবর্মা, ইন্দিরা গান্ধি এবং সিদ্ধার্থ রায়ের হাতের পুতুল হিসাবে কাজ করেছেন। ১৯৮৩ সালে আসাম বিধানসভা নির্বাচনের সময়েও বড়ো সর্দার শ্যামলাল শাখদের একই ভূমিকা পালন করেছিলেন।
কারণ এইসব সর্দারেরা অদৃশ্য রাজার যাবতীয় মর্জি যথা সময়ে বুঝতে পারেন। গণতন্ত্র গোল্লাই গেলেও তাঁদের কিছু যায় আসে না।