জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই যুবক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে নিজের স্বপ্নের পথ চওড়া করছেন

সালটা ২০১৪। সবে মাত্র উচ্চমাধ্যমিকের বেড়াজাল টপকে কলেজের চৌকাঠে পা রেখেছি। থিয়েটার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার একটা চাপা কষ্ট যখন মনে বাসা বাঁধছিল, তখনই লেখালেখি নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখলাম। ধীরে ধীরে টান বাড়ল। সেই শুরু। আসলে পড়াশোনার বাইরেও বেঁচে থাকতে কিছু লাগে। সিলেবাস বা মূল স্রোতের বাইরে কিছু। আমার লেখালেখি আমার জীবন হয়ে দাঁড়াল। মধ্যবিত্ত পরিবারে পড়াশোনা যতটা গুরুত্ব পায়, তার সঙ্গে যদি অন্য কিছু করা হয় তাহলে সেটা গুরুত্বহীন হিসাবেই সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। ২০১৬ সালে আমাদের একটি পত্রিকা বেরোয়। সকলেই খুব খুশি। কিন্তু ওই যে, যতই হোক মধ্যবিত্ত পরিবার। তাই “পড়াশোনাটাও মন দিয়ে করো। ওটা কিন্তু আগে।”

স্বভাবতই আমি দুটোকেই সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছিলাম। পড়াশোনা আর পত্রিকা। পত্রিকার নাম কবি কলম। আর এই পত্রিকাকে অন্যান্য পত্রিকার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করার কথা ভাবছিলাম। সমাজের চিন্তাধারা, নতুন নতুন বিষয়কে কবিতা ও বিভিন্ন তথ্য সহকারে পরিবেশন করাই আমাদের লক্ষ্য। তৃতীয় সংখ্যা থেকে সমাজের কিছু অচেনা মানুষদের নিয়ে লেখা শুরু হয়। আমি লিখলাম তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে। সেখানেই আমার চোখ খোলে। নতুন কিছু ভাবতে শিখি।

তারাও তো মানুষ। সামান্য শৌচালয় ব্যবহারে তাদের নানা কটূক্তি শুনতে হয়- “কীরে ছেলেদেরটায় যাবি নাকি মেয়েদেরটায়?” 

শুধুই কি লিখলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? শুরু হল দৌড়। কথা হল ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডের  সদস্যা মাননীয়া রঞ্জিতা সিনহার সঙ্গে। কথা বলে জানতে পারি আলাদা শৌচালয়ের দাবিতে বহুদিন তারা আবেদন জানাচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। যেখানে পুরুষ-মহিলা একই বাথরুম ব্যবহার করছেন, সেখানেই তারা স্থান পাবেন, আর তা হবে স্বল্প মূল্যে। সেই চিন্তা ভাবনা থেকে শুরু ত্রিধারা পরিকল্পনা। নানা জায়গার মানুষ খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেও কলকাতার ১১২ নম্বর ওয়ার্ডের পৌরমাতা মাননীয়া অনিতা কর মজুমদার এককথায় আমায় ত্রিধারা স্টিকার ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। তাঁর ওয়ার্ডের ৫টি বাথরুমে শুরু হল ত্রিধারা প্রকল্প। কলকাতার বাঁশদ্রোণী সুলভ শৌচালয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের জন্য বাথরুম খোলা হল এক ছাদের তলায়। সেই দিন থেকেই শুরু হল আমার জীবনের অন্যতম একটা অধ্যায়। ২০১৭-র ভাইফোঁটার আগের দিন থেকেই এই প্রকল্পটি শুরু হল। তারপর একে একে সকলে এগিয়ে এলেন। তাদের মধ্যে অনেকে হাসিঠাট্টা যেমন করেছেন, অনেকে আবার নিজে থেকে এগিয়েও এসেছেন। এই চিন্তাধারার জন্য ২০১৮-তে ভারতরত্ন শ্রী চিদম্বরম সুব্রামনিয়ম জাতীয় পুরস্কার পাই। কিন্তু এটাও ঠিক যে, আজও এই কাজ কোথাও একটু থমকে আছে আমাদেরই কিছু ভ্রান্ত মানসিকতার জন্য।

(চলবে…)

Developed by DXDasia