
রেকর্ডের বদলে ক্যাসেট এসে বিপ্লব ঘটালো বাংলা গানের জগতে
গত শতকের সত্তরের দশকের শেষ অবধি বাংলা গানের বেসিক আধুনিক ও ফিল্মের গানে বাঙালির দুই আইকন একটানা সাম্রাজ্য বিছিয়ে রেখেছিলেন – হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মান্না দে – তাঁদের দু’জনেরই এটা শততম জন্মবর্ষ। অবশ্য আধুনিক ও ফিল্মের গানের পাশাপাশি হেমন্ত রবীন্দ্রগানেও একটা নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন যা মান্না দে তাঁর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পারেননি। কিন্তু সত্তরের মাঝামাঝি থেকে নব্বই দশক অবধি বাংলা আধুনিক গানের যে স্তিমিত প্রবাহ, যার সবচেয়ে বেশি ছাপ পড়ল আশির দশকের বাংলা আধুনিক গানের শরীরে, সেখানে মান্না দে-র মতো সামর্থ্যবান শিল্পীর ভূমিকা কী? হেমন্তর কথাটি এখানে ছেড়ে রাখাই সংগত, কারণ, আশির দশকের গোড়ার থেকেই হেমন্ত ছিলেন অসুস্থ, কণ্ঠের লাবণ্য তখন তাঁর ফুরিয়ে আসছে এবং ১৯৮৯ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু মান্না দে তার পরে অনেকদিন সক্রিয় ছিলেন তাঁর কণ্ঠে ও সামর্থ্যে – অথচ এমন এক ক্ষমতাধর পারফর্মারকে আমরা বাংলা গানে কাজে লাগাতে পারিনি।
আরও পড়ুন
একশোয় পড়লেন কফি হাউজের কবিয়াল
১৯৮০-তে ইডেন উদ্যানে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ফুটবল ম্যাচে (১৬আগস্ট) যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে ও ষোলোজন সমর্থকের মৃত্যু হয়, সেই ঘটনা নিয়ে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় কয়েকটি গান লিখে মান্না দে-কে দিয়ে রেকর্ড করান – যার মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল “খেলা ফুটবল খেলা” – কিন্তু তারপরে আর তেমন স্মরণীয় অ্যালবাম কই? এর অনেক পরে একই জুটির আরেক মাইলস্টোন “আমায় একটু জায়গা দাও” – এর অল্প পরেই মান্না দে-র বেশিরভাগ বাংলা গানের কথাকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই প্রয়াত হন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এ গান রোমান্টিক মান্না দে-র সিগনেচার নয় – ভক্তিগীতির আধারে মান্না দে-কে আমরা অনেকেই দেখতে বা পেতে অভ্যস্ত ছিলাম না।
এইখানেই মনে পড়ে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির একটা ট্রাজিক পরিণতির কথা। ভালো কণ্ঠ বা প্রশিক্ষিত শিল্পী হাজির থাকলেও ঠিকঠিক কম্পোজারের অভাবে ভালো গান যেমন তৈরি হতে পারে না, তেমনই সেই শিল্পীর ক্ষমতাকেও যথাযথ প্রয়োগ করা যায় না। এই অপচয়ের আমরা সব থেকে বেশি মুখোমুখি হয়েছি আশির দশকের বাংলা গানে। সক্ষম শিল্পী আছেন, সুরকারও হয়তো আছেন, কিন্তু তেমন গান নেই – আর নতুন গান ছাড়া শিল্পী বাঁচবেন কী করে, কীভাবেই বা টিকবে গানের ইন্ডাস্ট্রি? বিপরীত দিক দিয়ে একজন কৃতী শিল্পী সব সময়েই চাইবেন নতুন নতুন গানের আধারে নিজেকে বিকশিত করতে। সেটা যে সর্বদা আর্থিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, তা নাও হতে পারে, একজন পেশাদার সংগীতশিল্পীর বেঁচে থাকবার উপাদান তাঁর গান। আর আশির দশকে মান্না দে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন, যখন তাঁর স্বাধীনতা আছে কোন গান তিনি গাইবেন আর কোন গান গাইবেন না । তাই অন্য যে কোনও শিল্পীর মতোই তিনি খুঁজবেন ভালো গান, ভালো সুর, ভালো কম্পোজিশন। যদি না পান? তবে একজন পেশাদার হিসেবে তাঁর দুর্ভাগ্যের সূচনা। যদি বলি শিল্পী মান্না দে একটা পর্বের পরে এই আকালের মুখোমুখি হয়েছেন?
বাংলা আধুনিক গান তখন একটা মজে যাওয়া নদীর মতো স্রোতহারা। এককালের নামজাদা সুরকাররা অস্তমিত, সেই অর্থে কোনও যোগ্য কম্পোজার বাংলা গানের ইন্ডাস্ট্রিতে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আকাশবাণীও তেমন কোনো নতুন গানের জোগান দিতে অপারগ। তাঁদের স্টুডিও রেকর্ডের যে গান একসময় বাংলা আধুনিক গানে সজীব অক্সিজেন দিতে পেরেছিল, সেই ধারাবাহিকতা মরুপথে বিলীন। কার্যত রেডিওতে আধুনিক গানের ঘোষণা হলে শ্রোতা রেডিও বন্ধ করে পিঠটান দিচ্ছেন – পুরোটাই এক দমবন্ধ অবস্থা। এই অবস্থায় সব থেকে কষ্টের মুখোমুখি হয়েছেন দুই পক্ষ – আধুনিক বাংলা গানের শ্রোতা, যারা অনেকদিন ধরে এই গানকে মাথায় করে রেখে ইন্ডাস্ট্রিকে সচল রেখেছিলেন, আর দু’নম্বর হল, শিল্পীরা, বিশেষত মান্না দের মতো সিনিয়র শিল্পীরা। ইচ্ছে করলে তিনি তখন পুরোপুরি রবীন্দ্রনাথের গানে চলে যেতে পারতেন, কিন্তু যাননি। কারণ, তিনি সেখানে একদিকে যেমন সংযমের পরিচয় দিয়েছেন, অন্যদিকে যে ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে মান্না দে করেছে তার প্রতি ছিল তাঁর অপেক্ষা ও সমর্থন। যদি একটা কিছু ভালো হয়! একটা দুটো ভালো গান কি হতে পারে না? তিনি অপেক্ষা করছেন, করছেন, করছেন। কিন্তু না, সে এক গ্রস্ত সময়।
আরও পড়ুন
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘বাংলা’র সুর
গান, অন্তত আধুনিক গান কিছুটা হলেও সময় ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির ক্রীতদাস। রেকর্ড যুগের পরে ক্যাসেট এসে এই পরিস্থিতিটাকে উল্টে পাল্টে দেয়। ক্যাসেট এমন এক মাধ্যম, যা গানের বাজারটাকেই অন্য একটা সংকটে ফেলে দেয় তার পরিমাণের দাপটে। আগে একটা রেকর্ড মানে ছিল দুটো কি চারটে গান – খেটেখুটে সুরকাররা বছরে একবার তেমন দু’চারটে গান তৈরি করতেন। কিন্তু একটা ক্যাসেট মানে অন্তত দশটা বা বারোটা বা কুড়িটা গান – রেকর্ডের পাঁচ-দশগুণ বেশি! এত নতুন গান, এত নতুন নতুন গানের কথা-সুর হবে কোথা থেকে? এত সঞ্জীবনী প্রতিভা কি আদৌ থাকা সম্ভব? হয়ওনি। অথচ তার থেকে ঢের সহজ একটা কুড়ি কি পঁচিশ টাকার ফাঁকা ক্যাসেট কিনে আর দু-দশ টাকা খরচ করে বিশ তিরিশটা পুরোন গান রেকর্ড করে ফেলা ? কারণ, মানুষের গানের চাহিদা তো রয়েছে সমানভাবে আর সেই চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল ক্যাসেট যুগে । তার একটা বাণিজ্যিক দিকও ছিল। একটা রেকর্ডের দাম আশির দশকে তিরিশ-পঁয়তিরিশ টাকার আশেপাশে, যাতে আছে দু’টি/চারটি গান। অথচ তিরিশ টাকার কম দামে গড়পড়তা পঁচিশ টাকার ক্যাসেটে পাওয়া যায় অন্তত বারো চোদ্দটা গান, আর নিজে ফাঁকা ক্যাসেট কিনে রেকর্ড করিয়ে নিলে সংখ্যাটা আরো বেশি।
মূল গল্পটা আসলে চাহিদা ও জোগানের, যা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গানের জগতেও সমান সত্যি। শুধু সত্যি নয়, ভয়াবহভাবে সত্যি। এই সত্যিটা অন্য এক সত্যিকে গিলে খেয়ে ফেলে। অন্য এক দুমড়ে যাওয়া কষ্টকে আড়াল করে দাঁড়ায় ।
কেউ বলবে না, মান্না দে-র গলা শেষ বয়সে খারাপ হয়ে গিয়েছিল। নব্বই পেরিয়েও তিনি মঞ্চ অনুষ্ঠান করেছেন, লোকে ভিড় করে শুনেছে। কিন্তু সেই মানুষটা কলকাতায় একটা সংগীত প্রশিক্ষণ করতে চেয়ে নিরাশ হয়েছেন শুধু নয়, আরো অনেক বড় বেদনার জালে তিনি বন্দি থেকেছেন, গান না-গাইতে পেরে – আমরা তাঁকে দিয়ে একটা সময়ের পর আর কোনও নতুন গান গাইয়ে নিতে পারিনি। একজন শিল্পীর কাছে এর চাইতে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?
