কমিকস ইন বেঙ্গল : কলকাতায় একমাস ব্যাপী বাংলা কমিকস উদযাপন

বাংলা কমিকস-প্রদর্শনী

এভাবেই প্রদর্শনী দেখতে যাওয়ার পথ নির্দেশিকা বানানো হয়েছে

অনেকের মতে, পটচিত্র ও মন্দিরের গায়ে টেরাকোটা-অলঙ্করণের মধ্যেই নিহিত ছিল বাংলায় কমিকসের বীজ। পরবর্তীতে সেই বীজকেই লালন করেছেন বাংলা কমিকস অগ্রণীরা। এক সময় সন্দেশ, মৌচাক, সচিত্র ভারত, নবকল্লোল, শুকতারা, কিশোর ভারতী, আনন্দমেলা-সহ বহু সাময়িকপত্রে কমিকস নিয়ে যে আগ্রহ ছিল, এখন তা না থাকলেও ইতিবাচক দিক এই যে, এখনও নারায়ণ দেবনাথ, শৈল চক্রবর্তী, প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়, কাফি খাঁ (প্রফুল্লচন্দ্র লাহিড়ী), ময়ূখ চৌধুরী (শক্তিপ্রসাদ রায়চৌধুরী), তুষার চট্টোপাধ্যায়, সুবীর রায় সহ বহু গুণী শিল্পীদের বাংলা কমিকস-এর খোঁজ পড়ে বইমেলায়। বিদেশের অ্যানিম এসেও হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল দ্য গ্রেট বা নন্টে-ফন্টের জমি কাড়তে পারেনি। আসলে কমিকস-এর মতো সময়োচিত শৈল্পিক জ্ঞাপন-মাধ্যম খুব কমই আছে। কিন্তু, কিছু টিকিয়ে রাখার জন্য চর্চার প্রয়োজন হয়, যেটা বাংলা কমিকস-এর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ভাবে হচ্ছিল না দীর্ঘদিন। এই অভাব বোধ থেকেই ‘কমিকস কালচার কালেক্টিভ’ শুরু করেন বাংলার একদল কমিকস-প্রেমী। পিনাকী দে, দেবাশিস গুপ্ত, ঋতুপর্ণ বসু, স্বাগত দত্ত বর্মণ সহ এ প্রজন্মের তরুণ শিল্পীরা কাজ করছেন বাংলা কমিক্সের ইতিহাস যাত্রাপথ পরিবর্তন বিবর্তন নিয়ে। এই প্রয়াসেরই সংযোজিত অংশ বলা যায় কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি (কেসিসি)-র প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আয়োজিত ‘কমিকস ইন বেঙ্গল’ শীর্ষক প্রদর্শনীটিকে।

পৌষ ১৩২৮ সংখ্যার সন্দেশ-এ সুখলতা রাওয়ের চিত্র-কাহিনি ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’

এই প্রথম শহরে একমাসব্যাপী কমিকস উদযাপন চলবে। কলকাতার ইএম বাইপাসের ধারে কেসিসি-র দোতলায় এই প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ৯ ফেব্রুয়ারি, শেষ হবে ৯ মার্চ। ১৩২৮ বঙ্গাব্দের পৌষে, আজ থেকে শতবর্ষ আগে বাংলা কমিকসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাতায়। সুখলতা রাও-এর সচিত্র-গল্প ‘যেমন কর্ম তেমনি ফল’-ই বাংলার প্রথম কমিক বলে ধরা হয়। তাতে ব্যাবহার করা হয়েছিল স্পিচ-বেলুনস। এই প্রদর্শনীটি অবশ্য প্রধানত মুদ্রিত বাংলা কমিকস ঘিরে। সে দিক থেকে দেখলে ১৮৭৪-এর ৩১ জানুয়ারি বসন্তক-এ ছাপা ‘কার্কউড বিলাস, চিটাগং প্ল্যান্টেন’ চিত্র-আখ্যানটিতে কমিকসের অনেক লক্ষণই মজুত। বিগত ৬০-৭০ বছর ধরে কিশোরসাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে কমিকস বা সচিত্রগল্প। বিশ শতকের রাজনীতি-আবর্তেও টিকে ছিল বাংলা কমিকস। ১৯২০-র দশকে বাংলা কমিকস কেমন দেখতে ছিল, এত পথ পেরিয়ে ২০২৪-এ তার চেহারাটা কেমন হয়েছে, সবটাই প্রদর্শিত হচ্ছে এখানে। সঙ্গে চলবে কমিকস সংক্রান্ত বহুমুখী আলোচনা, থাকবে বিশিষ্ট শিল্পীদের তত্ত্ববধানে কমিকস আঁকার ওয়ার্কশপ, নিজস্ব কমিকস স্ট্রিপ তৈরির সুযোগও মিলবে। পত্রপত্রিকায় লিখে-এঁকে যাঁরা জনপ্রিয় করেছেন বাংলা কমিকসকে, তৈরি করেছেন কমিকসপ্রেমী কয়েক প্রজন্ম। চর্চা হবে এঁদের ঘিরেও। 

১৩২৮ বঙ্গাব্দের পৌষে, আজ থেকে শতবর্ষ আগে বাংলা কমিকসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাতায়। সুখলতা রাও-এর সচিত্র-গল্প ‘যেমন কর্ম তেমনি ফল’-ই বাংলার প্রথম কমিক বলে ধরা হয়। তাতে ব্যাবহার করা হয়েছিল স্পিচ-বেলুনস। এই প্রদর্শনীটি অবশ্য প্রধানত মুদ্রিত বাংলা কমিকস ঘিরে।

এভাবেই জেনে নিতে পারবেন বাংলা কমিকসের ইতিহাস

একমাস ধরে শহরে কমিকস-প্রদর্শনী, ব্যাপারটা কীভাবে দেখছেন কার্টুনশিল্পী উদয় দেব? বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানিয়েছেন, “কার্টুন দলের প্রেসিডেন্ট ঋতুপর্ণ বসুর থেকে যখন প্রথম এই ব্যাপারে জানতে পারি, ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। এই শহরে বেশ কিছু সময় ধরে কমিকস নিয়ে কাজ হচ্ছে, তার থেকে বড়ো কথা কমিকসের বহু পুরোনো ইতিহাস আছে। বেশ কিছু মানুষ যাঁদেরকে আমি চিনি, যেমন পিনাকী দে যিনি গবেষণা করেন, অর্ঘ্য মান্না যিনি পেশায় একজন বিজ্ঞানী হলেও নেশায় একজন কমিকস স্ট্রিপ আর্টিস্ট, মনোজিৎ চট্টোপাধ্যায় পেশায় রোবোটিক ইঞ্জিনিয়ার হলেও কমিকস স্ট্রিপ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন এবং জাপানের মাঙ্গা কমিকস নিয়ে ওঁর বিপুল পড়াশোনা।  আরও অনেকেই আছেন যাঁরা কমিকস নিয়ে দারুণ কাজ করে চলেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “খুব সুন্দর প্রদর্শনী হয়েছে। রেয়ার কমিকস স্ট্রিপ আছে। কমিকস স্ট্রিপ নিয়ে সেরকম ধারণা না থাকলেও ছোটোবেলা থেকেই কমিকস পড়ে বড়ো হয়েছি। বাংলার কমিকস নিয়ে বহুদিন ধরেই একটা যুদ্ধ চলছে — বাংলায় এত প্রথিতযশা শিল্পীরা কমিকস নিয়ে কাজ করেছেন, প্রত্যেকেই অসম্ভব ট্যালেন্টেড। বাংলা কমিকস নিয়ে এত ভালো উদ্যোগকে আমার সাধুবাদ। এটা প্রতি বছর হোক, আরও বড়ো আকারে ছড়িয়ে পড়ুক – চাই আলাদা করে উৎসব হোক এই নিয়ে। নতুন প্রজন্ম আরও উৎসাহ পাক। কার্টুনদল যেমন রাজনৈতিক কার্টুন নিয়ে গবেষণা করছে, ছোটো থেকে ধীরে ধীরে বড়ো পরিসরে কাজ করার চেষ্টা করছে, সেরকম কার্টুনদলের আগে থেকেই  কমিকস নিয়ে এরকম অনেকেই কাজ করেছেন। যেমন রীড বেংগলি বুক স্টোরে এরকম উদ্যোগ নিয়ে ছিলেন প্রীতম সেনগুপ্ত, পিনাকীদা, শান্তনু মিত্র, আমার ব্যাচমেট শঙ্খ ব্যানার্জিরা। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কার্টুন ও কমিকস, এই দুটোকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।”

৯ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা কমিকস জগত নিয়ে বক্তব্য রাখেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ গুপ্ত। বাংলা কমিকসের একাল-সেকাল বিষয়ে আলোচনা করেন প্রখ্যাত শিল্পী দেবাশীষ দেব, সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় এবং কমিকস-প্রেমী অভিজিৎ সুকুল। উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র বিষয়ের অধ্যাপক মধুজা মুখোপাধ্যায়, নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি গ্রাফিক নভেলে আর্ট-ওয়ার্ক ছাড়াও এই ধরনের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য করেছেন তিনি। শিল্পী ঋতুপর্ণ বসু লাইভ কমিকস আঁকেন এইদিন। 

শিল্পী ঋতুপর্ণ বসু লাইভ কমিকস আঁকছেন

আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি, বাংলায় কমিকসের ইতিহাস নিয়ে বিকেল চারটে থেকে থাকছে বিশেষ আলোচনা। ‘ভায়োলেন্স অ্যান্ড অ্যাগ্রেশন ইন বেঙ্গলি কমিকস’ নিয়ে বক্তব্য রাখবেন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক সুদেব প্রতিম বসু। ‘থিয়েট্রিক্যাল মুভমেন্ট অফ বডি : কমিক আর্ট অফ শঙ্খ ব্যানার্জি’ নিজের বই নিয়ে শিল্পী কথা বলবেন নিজেই। ‘বেঙ্গলি কমিকস অ্যান্ড সন্দেশ ম্যাগাজিন’ নিয়ে কথোপকথনে থাকবেন সন্দেশ-এর সম্পাদক এবং চিত্র-পরিচালক সন্দীপ রায় এবং সন্দেশের সম্পাদকীয় মন্ডলীর সদস্য দেবাশীষ সেন।  

আছে মজাদার কমিকস-সেলফি স্ট্যান্ড

অতএব, ছোটোবেলার কমিকস-দিনগুলোর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে, মাতৃভাষায় কমিকসের গুরুত্ব নিজেকে ও ছোটোদের বুঝিয়ে এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, অবশ্যই হাতে সময় নিয়ে সবান্ধবে বা সপরিবারে নিয়ে ঘুরে দেখে আসুন, সাক্ষ্মী থাকুন একটি বিরল ও সময়োপযোগী প্রদর্শনীর।

Post Tags
Developed by DXDasia