কার্টুন দলের উদ্যোগে ‘বাংলা কার্টুনের ১৫০ বছর’ যেন চলমান এক আন্দোলন

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গনে চলছে কার্টুন মেলা – প্রদর্শনী ও কর্মশালা

ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে সাহেবদের সঙ্গে টক্কর দিতে শুরু হয়েছিল ব্যঙ্গ আঁকা। কার্টুন। বসন্তক, হরবোলা ভাঁড় – শাসককে ব্যঙ্গ করা বা ব্যঙ্গ করার পত্রিকা আমাদেরও এককালে ছিল। বাংলা অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রথম কার্টুন বেরনোর সময়ের (১৮৭২) হিসেবে এখন বাংলা কার্টুনের ১৫০ বছর। এই যাত্রাপথকে স্মরণ করতে এবং আগামীতে বাংলা কার্টুনে পথ প্রসারিত করতেই ২০২২-এ কলকাতার কার্টুন দল পরিচালিত ‘কার্টুন মেলা’র আয়োজন করা হয়েছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গনে, উদয়শঙ্কর মঞ্চে; যেখানে একদা বাসিন্দা তিন ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ কার্টুন এঁকেছেন। ছাপাখানা বসিয়ে তিনটে কার্টুন বই এঁকে প্রকাশ করেছেন। তখন লোকে কার্টুন কিনতো। চওড়ায়, গভীরতায় দু’দিক দিয়েই বাংলা কার্টুনশিল্পের ঐতিহ্য ও ইতিহাস বেশ বড়ো। সেই ইতিহাস কি সহজে মুছে ফেলা যায়, যেখানে মিশে আছে বাঙালির প্রতিবাদী সত্ত্বা?

“বইমেলা, খাদ্যমেলা, হস্তশিল্প মেলা সবাই শুনেছেন…কার্টুনমেলা কখনো শুনেছেন?” – গত বছর ‘কার্টুন মেলা’ ঘুরে দেখার পর ঠিক এই কথাটিই বলেছিলেন শিল্পী সুমন চৌধুরী। ডিসেম্বর, ২০২১। বাংলায় সেই প্রথম আয়োজিত হয়েছিল ‘কার্টুন মেলা’। সেবছরই ছিল বিশিষ্ট কার্টুনিস্ট রেবতীভূষণ ঘোষের শতবর্ষ। যাঁরা শিল্প ভালোবাসেন, ভালোবাসেন কার্টুন, তাঁদের কথায় শহরে এরকম মেলা বিরল। এবছর বাংলা কার্টুনের ১৫০ বছর। বর্তমানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা কার্টুনের অবস্থানটা কীরকম?

“১৮৭২ থেকে ২০২২-এর যাত্রাপথে অনেক বিবর্তন এসেছে। সমাজ বদলে গেছে। বর্তমান সময়ে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু কার্টুনের সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত রয়েছেন তারা যেকোনও কারণে ঠিকঠাক ভাবে সেই সম্ভাবনাগুলোর সদ্ব্যবহার করতে পারছেন না। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষার অবনমন, প্রকৌশলগত জটিলতা -এর বহুবিধ কারণ রয়েছে। বাজারে এখন ‘মিমস’ চলছে। কিছু ছবির কোলাজ করে, তাতে কয়েকটা শব্দ বা বাক্য জুড়ে দেওয়া গভীরতাহীন, পরিশ্রমহীন, শিক্ষা-রুচিহীন একটা তাৎক্ষণিক জগাখিচুড়ি বিষয়। এই প্রজন্মের বেশিরভাগেরই ‘মিমস’-এর সঙ্গে কার্টুনকে গুলিয়ে ফেলার, দৃশ্যশিল্পের অপব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে। এই আবহে কার্টুন আগামীতে কীভাবে টিকে থাকবে, এটাই একটা বড়ো প্রশ্ন।” বঙ্গদর্শন-কে বলেন বিশিষ্ট কার্টুনিস্ট-ইলাস্ট্রেটর ঋতুপর্ণ বসু।

ঋতুপর্ণ বসুর কথার রেশ টেনেই বলা যায়, তুলনামূলকভাবে কার্টুন বাড়লেও কমেছে ‘স্পেস’ এবং ‘ডেপথ্‌’। ভাববার অবসর কমেছে, অভ্যেস পাল্টে গেছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘অতিরিক্ত’ লাভের আশায় ভালো কার্টুনের জায়গা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, জনপ্রিয় ফরাসী ব্যঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘শার্লি এবদো’ ((Charlie Hebdo is a French satirical weekly magazine) বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্রে। পত্রিকাটির সদর দফতরে ২০১৫ সালের ৭ই জানুয়ারি ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়। শার্লি এবদোর কয়েকজন কর্মীকে অফিসে ঢুকে গুলিতে ঝাঁঝরা করেছিল জঙ্গিরা। সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিল সেই ঘটনা। তবে, সেই নৃশংস জঙ্গিহানার পরও শার্লি এবদোর সাহসে ভাঁটা পড়েনি। প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার ব্যাপারে বারবার সওয়াল করে চলেছে এই পত্রিকা। আর বারবারই বিতর্কিত বিষয়ে কার্টুন এঁকে তাঁরা খবরের শিরোনামে থেকেছে। কার্টুনই হল সেই শক্তিশালী হাতিয়ার -এই ভাবনাকে সঙ্গে নিয়েই পথ চলছে কার্টুন দল। আর তাঁদের সেই রুটম্যাপে জায়গা করে নিয়েছে কার্টুন মেলা। ঋতুপর্ণ বলেন, “এখানে সংবাদপত্রের ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংবাদপত্র এমনকী টেলিভিশনের জায়গা দখল করেছে সোশ্যাল মিডিয়া। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভাবতে হবে আমাদের। এখন সংবাদপত্র বিজ্ঞাপন নির্ভর। সেখানে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন বিজ্ঞাপন থাকে। তাই সংবাদপত্র বা যেকোনও সংবাদমাধ্যমের পক্ষে তাদের বিপক্ষে সমালোচনার অবকাশ থাকছে না। সংবাদপত্রে কার্টুনের জন্য বরাদ্দ জায়গা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ‘পকেট কার্টুন’ মাত্র দুটো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। আগে পাতা জুড়ে এডিটোরিয়াল বা সম্পাদকীয় কার্টুন বের হতো, এখন দেখাই যায় না।”    

বিগত কয়েক দশক ধরে অবহেলিত হয়েছে। অনেকেই মনে করেন কার্টুন হল ছোটোদের বিষয় – মনোরঞ্জনকারী হাসিঠাট্টা। আমরা যদি সর্বাধিক জনপ্রিয় কার্টুন গুলোর দিকে তাকাই, দেখবো কার্টুনে অন্তর্নিহিত থাকে সমাজ ও রাজনীতি। এ এমন এক নির্ভেজাল জিনিস যে সিরিয়াসলি হেসে ফেলা যায়। ‘স্যাটায়ার’। “আমরা মূলত রাজনৈতিক বা সামাজিক কার্টুনের কথাই বলছি। কার্টুন যে হাসির বিষয় নয়, খুবই সিরিয়াস একটা ব্যাপার, একটা উচ্চমানের ‘মেন্টাল এক্সারসাইজ’, তা বোঝেন না অনেকেই। এ ব্যাপারে সচেতনতার অভাব রয়েছে। কার্টুন কমিক নয়, অ্যানিমেশনও নয়। বাংলা কার্টুনের ১৫০ বছর, অতিক্রান্ত অথচ আজ পর্যন্ত স্কুলের সিলেবাসে কার্টুন নেই, এ বিষয়ে কিছু পড়ানো হয় না। সোশ্যাল মিডিয়ার খারাপ দিকও রয়েছে, ভালো দিকও রয়েছে।  উপযুক্ত বুদ্ধি, মেধা, বোধ প্রয়োগ করে কেউ যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা, আঁকা বা বিশ্লেষণ পোস্ট করাই যায়। কাজ ভালো হলে তা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকেই, বর্তমান সময়ে যে সুযোগ কোনও সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যাবে না। সোশ্যাল মিডিয়াতেও দর্শক বা পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করা সম্ভব। একজন ‘কার্টুনিস্ট’ হতে গেলে যে পরিশ্রম, পড়াশোনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, তা এখন অনেকেই করতে চাইবে না। চেষ্টা যে কেউ করছে না, তা নয়। আমরা অপেক্ষা করছি সেই সফলতম কার্টুনিস্টের, যে কার্টুনশিল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।” বলেন বিশিষ্ট কার্টুনশিল্পী উদয় দেব।

কার্টুন দল নিজেদের মতো করে চেষ্টা করে চলেছে প্রতি বছর কার্টুন মেলার মাধ্যমে সচেতনা বৃদ্ধির। যে ভিড় রাজ্যের অন্যান্য মেলা বা উৎসবগুলোতে দেখা যায়, তা হয়তো এখানেও একদিন হবে আশা রাখছেন তাঁরা। তাঁরা এমন একটা মগজ চাইছেন, যে নিজে বুঝবে কার্টুন কী ও কেন, তার পাশের জনকেও বোঝাবে। তত্কালীন সাময়িক পত্র, খবরের কাগজে প্রকাশিত বিভিন্ন সময়ের কার্টুন, পুস্তিকা, ব্যাজ ও বই প্রদর্শনীর পাশাপাশি নামকরা কার্টুনিস্টরা কার্টুন মেলায় ওয়ার্কশপ করছেন। দর্শকরা নিজেদের কথা লিখতে ও আঁকতে পারেন যাতে, একটি টেবিলে রাখা রয়েছে একগুচ্ছ স্পিচ-বাবল কার্ড, স্কেচ পেন, মার্কার। 

কার্টুন সংরক্ষণ করা, প্রদর্শনীর মাধ্যমে মানুষকে সজাগ রাখা, কার্টুন সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মশালা অয়োজন, চারুকলা মেলায় অংশগ্রহন, শহরে-মফস্‌সলে দেওয়ালে-গাড়িতে কার্টুন এঁকে, কার্টুন ক্যালেন্ডার, লেটার প্যাড সহ বিভিন্ন সামগ্রীতে কার্টুন এঁকে, কার্টুন পত্রিকা, ই-পত্রিকা, বই প্রকাশ করে, ছোটোদের কার্টুন আঁকা শিখিয়ে একটা স্বপ্ন বুনছেন কার্টুন দল—্বাংলা কার্টুনের হারানো স্থান পুনরুত্থানের একটা আন্তরিক প্রয়াস বলা যেতে পারে।

ঋতুপর্ণ বসু ও উদয় দেব

১০ ডিসেম্বর শুরু হয়েছে এই মেলা, চলবে ১৯ তারিখ পর্যন্ত।

____________

ছবি নিজস্ব

Developed by DXDasia