লোকসংগীতের অনন্য একটি অঙ্গ – শ্রমজীবিদের ‘ছাদ পেটানোর গান’

গানের পরতে পরতে রয়েছে সমাজের গাথা

ছবি ঋণঃ ‘ভৈরবী – Bhoirobee’ ফেসবুক পেজ

সারিবদ্ধ ভাবে বসে, মুগুর দিয়ে ছাদ পেটাতে পেটাতে, ধুপ ধাপ আওয়াজের তালে তালে সুর করে গান গাইছেন পারি বাউরি, অষ্টমী বাউরি, জ্যোৎস্না বাউরি, কটি বাউরিরা। এই সুর-কথা মূলস্রোতের নয়, শুনে ছোটোবেলার এক অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছিল। গ্রাম বা মফস্‌সলের দিকে কোথাও কোথাও এখনও পানীয় জলের একমাত্র ভরসা, টিউবওয়েল। ছোটোবেলায় অবাক হয়ে দেখতাম এই টিউবওয়েল তৈরির প্রক্রিয়া। মাটির গভীর খুঁড়ে জল তুলে আনা রীতিমত হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কাজ। দেখতাম, যাঁরা এই পরিশ্রম করছেন, কাজের তালে তালে লোকভাষায় একত্রে গান গাইছেন। গানের কথায় মজার সব আঞ্চলিক লোককাহিনি। এই গান ভিড় জমাতো। পথ চলতি মানুষ দাঁড়িয়ে শুনতো। তখনও জানতাম না শ্রমগান বা সারিগান কাকে বলে। পরে জেনেছিলাম, এই গান ছিল শ্রমিকদের পরিশ্রম লাঘবের মহৌষধি। দলবেঁধে শ্রমের তালে তাল মিলিয়ে সে এক বিমূর্ত আনন্দলহরি।

শুরুতেই বাউরিদের যে গানের কথা বলছিলাম, তার নাম ‘ছাদ পেটানোর গান’। যা মূলত লোকসংগীত, শ্রমগান বা সারিগানের অঙ্গ। প্রতিটি মানুষের জীবনে একসময় শিকড়ে যাওয়ার দরকার হয়। জাতির জীবনে হয়। এই আত্মসন্ধানের প্রয়োজনেই কিন্তু লোকসংগীতকে অবিকৃত রাখা দরকার। ভুললে চলবে না, সংগীতের শিকড় এই লোকসংগীতেই। সে কারণেই ধ্রুপদ সংগীতের দুটি ভাগ- উচ্চাঙ্গ এবং দেশিয় বা লোকজ। ভাষার ক্ষেত্রে যেমন প্রাকৃত ও সংস্কৃত।

আলাদা করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, ছাদ ঢালাই প্রক্রিয়ার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়ন ও সুবিধে গ্রাম-মফস্‌সল থেকে শ্রমজীবিদের এইসব নিজস্ব গানও কালের গর্ভে বিলীন করেছে। প্রায় হারিয়েই গিয়েছে লোকসংস্কৃতির মূল্যবান এই সম্পদ। কেন ‘সম্পদ’ এবং কেনই বা ‘মূল্যবান’, এ বোধ সকলের থাকে না। যাঁদের থাকে তাঁরা বিচক্ষণ জানেন সংরক্ষণের গুরুত্ব। বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলে এবং পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চল সহ বেশ কিছু জেলায় শোনা যেত এই গান। ‘চৌরঙ্গী’ ছবির জন্য কবি নজরুল ইসলাম বেশ কিছু গান রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল—

‘সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ গো

সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ।

পাত ভরে ভাত পাই না, ধরে আসে হাত গো।

সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ…।’

নির্মাণশিল্পে তখনো সিমেন্ট ও স্টোন চিপসের প্রচলন শুরু হয়নি। সুরকির গুঁড়ো ও চুনের মিশ্রণে আস্তরণ তৈরি করে সেটা ছাদের ওপর পিটিয়ে পিটিয়ে বসানো হতো। তৈরি হতো জলছাদ। ছাদ পেটাতে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। তাই ছাদ পেটানোর এক শ্রেণির পেশাজীবী গড়ে ওঠে। নির্মীয়মাণ ইমারতে ছাদ পেটানোর ছন্দে অনুরণিত ধুপ ধুপ শব্দ গ্রামবাসীর কাছে ছিল খুবই পরিচিত। একজন ‘সর্দারে’র তত্ত্বাবধানে দল বেঁধে শ্রমিকরা ছাদ পেটানোর কাজ করত। তাদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করত মহিলারাও। আসলে শারীরিক অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করতে তারা এ ধরনের গান গাওয়াকে মোক্ষম দাওয়াই হিসেবে ব্যবহার করত। গানগুলোতে সাজানো-গোছানো পরিপাটি কোনো আয়োজন থাকত না, প্রকৃতপক্ষেই যা মেহনতি মানুষের গান হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে যা ছাদ পেটানোর গান হিসেবে পরিচিতি পায়।

এসব গানের না ছিল কোনো স্বরলিপি, না ছিল কোনো লিপিবদ্ধ রূপ। ছিল শুধু ছন্দ-তাল-লয়ের অপূর্ব মেলবন্ধন। গায়ক সর্দার গানের প্রথম কলিটি গাইত, এর পর শ্রমিকের দল কাঠের তৈরি মুগুর দিয়ে ছাদ পেটাতে থাকত। আর যখনই সর্দারের কণ্ঠ থেমে যেত, তখনই শ্রমিকরা ছাদ পেটানি থামিয়ে সমস্বরে গানের কলিটি একই সুরে গেয়ে উঠতো। পুরো গানটি এভাবেই গাওয়া হতো। অবস্থাভেদে কখনো দ্রুত আবার কখনো ধীর লয়ে গাওয়া হতো। ছাদ পেটানোর তালে তালে সমান্তরালভাবে ধেয়ে যেত গানের তাল। বিষয়বৈচিত্র্য ছিল ছাদ পেটানো গানে। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, হাসি-ঠাট্টা, তামাশা স্থান পেত গানের কথায়। 

লোকসংগীতকে অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত রাখার ব্যাপারটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আধুনিকতা, মুখে মুখে ঘুরতে ঘুরতে কথা-সুর পাল্টে যাওয়া, ইচ্ছাকৃত পাল্টে দেওয়া, ভৌগলিক বৈচিত্র্যের ফলে যেমন সুরের কাঠামোর বৈচিত্র্য ঘটে তেমনি ভাষার ধ্বনিগত পার্থক্য। লোকসংগীতের আঞ্চলিক চরিত্রই তার প্রাণ। গ্রামীণ স্তর থেকে লোকসংগীত সংগ্রহ করতে গিয়ে হামেশাই এর বিকৃত ঘটে চলে। লোকভাষাকে ফেলে দিয়ে গানকে শহুরে করে তোলার জন্য ব্যবসায়িক কারণে মার্জিত করা হচ্ছে। আমাদের শিকড় গ্রাম। শহরকে আমরা বানিয়েছি। ‘লোকসংগীত সন্ধান’ বইতে খালেদ চৌধুরী লিখছেন, “আমি মানুষ হয়েছি গ্রামীণ পরিবেশে। লোকসংগীতের ক্ষেত্রে ওটাই আমার নেপথ্য ভূমিকা হিসেবে কাজ করেছে। আমার বাড়ি ছিল নদীর পারে। গ্রামীণ মেয়েলি গান, পদ্মপুরাণ, ভাটিয়ালী, বাইচ, ধামাইল, সারি, ব্রত, বিচ্ছেদের গান—এগুলি গ্রামে থাকতে বহুবার শুনেছি। বিচ্ছেদের গান সাধারণত গাইত ভিখারিনীরা। খঞ্জনী বাজিয়ে রাধা কৃষ্ণের প্রেম বিরহের গান গাইলেই মুষ্টি ভিক্ষা দেওয়া হত। এই গানগুলি মূলত বৈষ্ণব সাহিত্যের অঙ্গীভূত। আবার কখনও শুনতাম ছাদ পেটানোর গান। এটার সঙ্গে নৌকা বাইচের গান কিছুটা মেলে। দুটির শারীরিক কসরৎ আলাদা। একটাতে মুগুর দিয়ে ছাদ পেটানো চলে। অপরটায় বৈঠা বাওয়া তাই ছন্দ ও ঝোঁক একটু আলাদা। একটায় রয়েছে হৈ হৈ… (নৌকা বাইচ)। অপরটায় শুধু হেই (ছাদ পেটানো)। এগুলি আসলে সবই সারিগান অর্থাৎ বৃন্দগান। এগুলি সবই ত্রিমাত্রিক বা চতুর্মাত্রিক।”

যে বৈচিত্র্যের কথা খালেদবাবুর বক্তব্যে উঠে এসছে, সে বিষয়ে কিছু তথ্য এখানে যোগ করা যেতে পারে। ১৯৩৩ সালের অগাস্টে আর্নল্ড বাকে-এর একটি সিলিন্ডার প্রকাশিত হয়, যা তিনি রেকর্ড করেছিলেন শান্তিনিকেতনে। নাম দিয়েছিলেন ‘সং অফ লেবার’ (British Library ওয়েবসাইটে তা সংরক্ষিত রয়েছে)। সেই রেকর্ডেরই একটি অংশ ছিল ‘বাউরি উইমেন ওয়ার্কিং অন দ্য রুফ অফ দ্য পোস্ট’। যাঁরা গান করেছিলেন, তাঁদের নাম-ঠিকানা জানননি আর্নল্ড, জানিয়েছিলেন শুধুমাত্র জাতি এবং পেশাগত পরিচয়। তবে, আর্নল্ডের রেকর্ডে ছাদ পেটানোর গানের আসল ভাবটা অধরা ছিল। কারণ, ওই বাউরি মহিলাদের গান তিনি তাঁদের কর্মক্ষেত্রে রেকর্ড করেননি, আলাদা করে গাইয়েছিলেন। ঠিকঠাক ভাব না ধরতে পারলেও আর্নল্ড সফল ভাবে ধরতে পেরেছিলেন সেই গানের ইতিহাস – গানগুলোর পরতে পরতে সমসাময়িক সমাজের গাথা।

আবার, ছাদ পেটানোর গান নিয়ে এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে ‘তবুও প্রয়াস’ প্রকাশনী। তাঁদের কাজে যে ধরনের ছাদ পেটানোর গানের উল্লেখ পাওয়া যায় তা আরনল্ডের রেকর্ডের থেকে আলাদা – গানের কথার ধরন আলাদা। কাজটা করার সময় খুঁটিনাটি গবেষণা করেছিলেন দুই বন্ধু, ‘ছাদ পেটানোর গান’ বইয়ের সম্পাদকদ্বয় রবিউল ইসলাম এবং সেলিম মন্ডল। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাদ পেটানোর গান সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁরা খুঁজে পান নদিয়া জেলার বদর মিস্ত্রিকে। বদর ছাদ পেটানোর গানের জীবিত উত্তরসূরি। দারিদ্রের জন্য ছোটো থেকেই মেহেনত করতে হয় ফলে, প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে তাঁকে। এক সময় রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ থেকে তিনি ছাদ পেটানো জীবিকায় ঢুকে পড়েন। অনায়াসে ২০০-২৫০ টি ছাদ পেটানোর গান গেয়ে ফেলতে সক্ষম তিনি। তবে, সে সুযোগ আর পান না। ছাদ পেটানো বন্ধ হয়ে গেলে তিনি আবার জীবিকা পরিবর্তন করেন। শেষে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি ও বাসন বিক্রি করতে শুরু করেন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে লোকশিল্পী হিসেবে ভাতা পাচ্ছেন বদর মিস্ত্রি।

www.thetravellingarchive.org-এ মৌসুমী ভৌমিক ছাদ পেটানোর গান নিয়ে দুর্মূল্য আর্কাইভ করেছেন। সেই সূত্রেই জেনেছি, ছাদ পেটানোর গানের মতো অধুনা অপ্রচলিত প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য এবং লোকসংগীতের এই ধারাটিকে সংরক্ষণের ইচ্ছে নিয়ে বিশ্বভারতীর সহযোগী অধ্যাপক, কলাভবনের অন্যতম শিল্পী সঞ্চয়ন ঘোষ ২০১৬ সাল থেকে বীরভূমের মহম্মদ বাজারের বাউরি মহিলাদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। বাউরিরা নিম্ন বর্ণের মানুষ এবং বীরভূমে ঐতিহ্যগত ভাবে এই সম্প্রদায়ের মহিলারাই ছাদগুলি তৈরি করতেন। আর্নল্ড বেকের রেকর্ডে যে বাউরি মেয়েদের গান শোনা গিয়েছিল, সঞ্চয়নও মোটামুটি তাঁদের সঙ্গেই কাজ করেন (পারি, চায়না, জ্যোৎস্না, কটি, মঙ্গলি, শান্তি, শুকসারি এবং তুলসি)। এঁদের নেতা পারি বাউরি, যিনি পঞ্চাশ পেরিয়েছেন।

এখন ছাদ পেটানোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে তাই, পুরোনো দিনের মতো  ছাদ তৈরির আয়োজন করে পুরো প্রক্রিয়াটি নথিভুক্ত করেন সঞ্চয়নবাবু। ছাদ পেটানোর গান নিয়ে তাঁর এই তথ্যচিত্র দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে পুরোটাই পরিকল্পিত। অধুনা অনভ্যস্ত হলেও এই তথ্যচিত্রে পারিরা খুব যত্ন করে ছাদ পেটানোর গানের আসল আমেজ ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন। (অধ্যাপক সঞ্চয়ন ঘোষ সংগৃহিত ‘ছাদ পেটানোর গান’ শুনতে এখানে ক্লিক করুন)

সঞ্চয়ন ঘোষের ‘ছাদ পেটানোর গান’

নিয়ম মতো একদিন হয়তো পারি বাউরি, বদর মিস্ত্রিরা হারিয়ে যাবেন, উত্তরসূরি না থাকায় বাস্তব থেকে চিরকালের জন্য কালের গর্ভে তলিয়ে যাবে ‘ছাদ পেটানোর গান’ও। শুধু থেকে যাবে আর্নল্ড বাকে, সঞ্চয়ন ঘোষ, মৌসুমি ভৌমিক, সেলিম মণ্ডল, রবিউল ইসলামদের লোকগান সংরক্ষণের আন্তরিক প্রচেষ্টাগুলি।

তথ্যসূত্রঃ

লোকসংগীত সন্ধান – খালেদ চৌধুরী

Roof-making songs of Baori women (www.thetravellingarchive.org)

itibritto.com

কালের কণ্ঠ

Developed by DXDasia