নীতীশের চলে যাওয়া রাহুল গান্ধীর বিরাট ধাক্কা

খুব চটে গিয়েছেন রাহুল গান্ধী

খুব চটে গিয়েছেন রাহুল গান্ধী। বলেছেন, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়বেন বলে মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নীতীশ কুমার। তাতে ভরসা রেখেই মুক্তহস্তে ভোট দিয়েছিলেন বিহারবাসী। কিন্তু সাধারণ মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির চেয়ে আজ ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি।’ বলেছেন, ‘তিন-‌চার মাস ধরেই ওঁর মতিগতি অন্যরকম ছিল। টের পাচ্ছিলাম আমরা। উনি যে এনডিএ শিবিরে যোগ দেওয়ার ছক কষছেন তার আভাস পেয়েছিলাম। নীতীশ আমাদের ঠকিয়েছেন।’

রাহুল গান্ধীর জানা উচিত ছিল, নীতীশ সারা জীবনই কংগ্রেস–বিরোধী রাজনীতি করেছেন। লালুপ্রসাদ বা সুশীল মোদির মতোই তিনিও জয়প্রকাশ নারায়ণ আন্দোলনের ফসল। লালুপ্রসাদের পরিবারতন্ত্র বরদাস্ত করতে না–পেরে তাঁর সঙ্গ ছেড়ে তিনি ও জর্জ ফার্নান্ডেজ বিজেপির দিকে গিয়েছিলেন। ২০১৫ সালের আগে নীতীশ কখনওই কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাননি। তিনি লালুপ্রসাদ নন। ২০১৫ সালে বিহারে লালুপ্রসাদ ও কংগ্রেসের সঙ্গে এসে তিনি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমন একজনকে ধরে রাখতে হলে যে পরিমাণ রাজনৈতিক বিচক্ষণতা দেখাতে হয়, তা কি দেখিয়েছিলেন রাহুল? বুধবার নীতীশের রাজ্যপালের কাছে যাওয়ার একঘণ্টা আগেও কংগ্রেসের নেতাদের ধারণা ছিল, বিহারে সব ঠাণ্ডা রয়েছে। এই রাজনৈতিক পারদর্শীতা দিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে লড়া যায়?

কংগ্রেসের দিগ্বিজয় সিং আবার আরও দড়। তিনি নীতীশের উদ্দেশে বলেছেন, ‘বিজেপি এবং সঙ্ঘের বিরুদ্ধে মানুষ আপনাকে ভোট দিয়েছিলেন। সেই মর্যাদা রাখতে পারলেন না আপনি। তেজস্বীকে নিয়ে সমস্যা থাকলে ওঁকে বরখাস্ত করতেন!‌‌’ প্রশ্ন হল, সেই পরামর্শ কি কংগ্রেস দিয়েছিল? তা হলে তো সব সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত। দিগ্বিজয় বলেছেন, সবাই মিলে একটা বৈঠক করলেও তো হোত। যদি ঘুরিয়ে দলের নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে তিনি এসব বলে থাকেন, তাহলে ভিন্ন কথা। ‌তাহলে বলতে হয়, একদম ঠিকঠাক কাজ করেছেন। নাহলে, এখন আর এসব বলে লাভ কি? এই কাজগুলো তো কংগ্রেস নেতৃত্বেরই করা উচিত ছিল। নীতীশ তো এসে রাহুলের সঙ্গে কথাও বলে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতি না বদলালে যে পদত্যাগ করতে পারেন তাও বলে গিয়েছিলেন। তারপরেও কেন অকালে শীতঘুম? বিষয়টার গুরুত্বই কি রাহল গান্ধী বুঝতেই পারেননি?

সহজ কথা হল, বিহারে ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি ওয়াকওভার পেয়ে গেলেন। ২০১৫ সালেও এনডিএ–র ভোট ছিল ৩৪ শতাংশ (‌দুই–তৃতীয়াংশ আসনে লড়ে বিজেপি একা পেয়েছিল ২১.‌৮১ শতাংশ)‌। আর মহাজোটের ভোট ছিল ৪২ শতাংশ। মহাজোটের মধ্যে নীতীশের ১৬.‌৮, লালুপ্রসাদের ১৮.‌৪, আর কংগ্রেসের ৬.‌৭। জোটের মধ্যে সত্যি কার কত ভোট, বোঝা ভার। কিন্তু ২০১৫–এ নীতীশ কুমারের ভোট কমে গিয়েছিল প্রায় ৬ শতাংশ। তাঁর দল অবশ্য ২০১০–এ ১৪২ আসনে লড়েছিল, আর ২০১৫ সালে ১০১টি আসনে। এখন নীতীশ আবার ঘরে ফিরে গেলেন।  লালুপ্রসাদের দল আর কংগ্রেস মিলে ২০১০–এও পেয়েছিল ২৫ শতাংশের মতো ভোট, ২০১৫ সালেও তাই। অর্থাৎ বাড়তি ভোট নিয়ে এসেছিলেন নীতীশ। এখন সেই ভোট আবার ফিরে গেলএনডিএ–র কাছে। নীতীশের এই ভোট যদি ১৬–১৭ শতাংশ থেকে যায়, তাহলে এনডিএ–র ভোট ৫০ শতাংশ পেরিয়ে যাবে।

রাজ্যের ৪০টি লোকসভা আসনের সবগুলোই ২০১৯–এ এই জোট পেয়ে গেলে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।

সহজ কথায়, নীতীশের জোটবদলে মোটের উপর ২০টি আসন বিরোধীদের হাত থেকে চলে গেল এনডিএ–র হাতে। ধাক্কা খেল ২০১৯–এ মোদির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা।

এই হিসাবটা খুব একটা বদলে যাওয়া বেশ কঠিন। নীতীশের দলে কেউ কেউ ক্ষুব্ধ। যেমন শরদ যাদব। বিরোধী দলগুলোর বৈঠকে তিনি বলে এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদির বিজেপি’র বিরুদ্ধে লড়বে সংযুক্ত জনতা দল। এর মধ্যেই বিজেপি’র সঙ্গে সরকার গড়ে ফেললেন নীতীশ। অপমানিত বোধ করছেন শরদ। ক্ষুব্ধ জেডিইউ সাংসদ আনোয়ার আলিও। এইসব ক্ষোভ–বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে লালুপ্রসাদ সংযুক্ত জনতা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই সরকার গড়ার দাবি জানিয়েছিলেন তেজস্বী প্রসাদ। কিন্তু ভোটের বাজারে এই সব ক্ষোভ কাজে আসবে না। সংযুক্ত জনতা বলতে বিহারের মানুষ বোঝেন নীতীশ কুমারকেই।

Developed by DXDasia