কিছু গান বুদ্ধিদীপ্ত, কিছু মায়াভরা, কিছু হাসির, কিছু সমসময়ের
চন্দ্রবিন্দুর গান শুনেছিলাম স্কুলবয়েসে। এক বন্ধু শুনিয়েছিল। ছোটো একটা একতলা বাড়িতে বসে শোনা গান। জানালার বাইরে দুপুরবেলার বাঁশবন। বাতাস লেগে শব্দ হচ্ছে। রোদের রং তখন অন্যরকম।মাধ্যমিক দেব। একসঙ্গে বসে টেষ্ট পেপার সলভ করছি। ও শোনাল – ও আমার মধ্যবিত্ত ভীরু-প্রেম তোমার কাছে রাখা…
মফস্বলের ছেলে আমরা। অন্যের শোনানো গানের পিছনে পিছনে হেঁটে গান শুনেছি। জেনেছি। এর আগে গান মূলত রেডিওতে। পুজো প্যান্ডেলে। কিন্তু এইরকম নতুন ধরনের গান আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। রক্তের ভিতরে সিঁধিয়ে গেল গান। আমার ওই বন্ধু গান শুনিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, রীতিমতো ডিকোড করে বুঝিয়েছিল, কীভাবে এই গানে বয়ঃসন্ধির আলো আঁধার ও গুপ্ত সংকেত লুকানো আছে।
এরপর দিন গেছে। জল দিয়ে বয়ে গেছে জলের আলো। এইটা তোমার গান, মন, বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব বিকেলবেলায় আমাদের সঙ্গে আছে। প্রকৃত অর্থেই। সেই বয়েসের পর বোধ চিন্তা পছন্দ অন্যরকম হয়েছে। অনেক গান ঝরে গেছে জীবন থেকে, কিন্তু চন্দ্রবিন্দু রয়ে গেছে। বন্ধু চলে গেছে দূর শহরে। আড্ডা বদলে বদলে গেছে। গানগুলো রয়ে গেছে। কিছু গান আছে, থাকবে। টেনশন বেড়েছে, প্রেম ও যৌনতার ধারণা বদলেছে, রোজগারচিন্তা মাথা ও হৃদয় খাক করেছে, আমাদের চন্দ্রবিন্দু আছে, আমার চন্দ্রবিন্দু আছে। তবে ছিল অপেক্ষা, নতুন অ্যালবামের। সাইকেল চালাতে চালাতে কতো নম্বর গানে কোন দিগন্তে গিয়ে বুঁদ হয়ে থাকব নতুন গানে।

বায়নাখোকা-র গানে গানে মগজ খেল বিটলেপোকার সুর নাছোড় হয়ে ঘুরছে। ঘুরেই চলছে। ছাড়ছে না কিছুতেই।
এখনও নতুন আড্ডায়, নতুন বন্ধুত্বে গান শুনি বসে বসে। নতুন গান শোনার চেষ্টা করি। নিজেরা নিজেদের গান অদলবদল করে নিই। বুঝি আমি পছন্দ করি গান শুনতে, গানের হাত ধরে থাকতে।
লেখাটির এই অংশে এসে মনে পড়ল, আরেক বন্ধুর কথা, যে চন্দ্রবিন্দুর গান চালিয়ে রান্না করে। পেঁয়াজকলি কাটতে কাটতে মুখের ওই ঈষৎ হাসি রান্নায় সুস্বাদ আনে, ওঁর বিশ্বাস।
চন্দ্রবিন্দুর টালোবাসা-র জন্য আলাদা করে অপেক্ষা করেছিলাম। কবে শুনতে পাব গান! পাতা পড়লে চমকে উঠি! কবে শুনব নতুন গান!
অ্যালবাম ইউটিউবে এসেছে খবর পেলাম তখন লাইব্রেরিতে বসে আছি। মনটা বিষণ্ণ। সাইকেল চালাতে শুরু করব ঠিক তখনই গান শোনা শুরু হল, বায়নাখোকা গান। অজান্তে মুখে হাসি ফুটে উঠল। এই যে একটা খারাপ দিনে মনখারাপে এক চিলতে হাসির আলো এ আমাকে অন্য কোনো গানের দল দিয়েছে কীনা জানা নেই। এই হাসি কিন্তু জীবনের দিকে তাকিয়ে চোখের জল মুছে তাকানো। প্রতি প্রেমে সার্কাস দেখিয়ে ডিগবাজি খাওয়ার বোকা জোকারের হাসি।
ঈষৎ হাসি ঈষৎ মজা ও একেবারে মায়ার পিদিমের ওমে আত্মা সেঁকে নিতে বারবার গেছি চন্দ্রবিন্দুর কাছে। পুরোনো স্মৃতির কাছেও ফিরে যেতে। গানগুলির সঙ্গে থাকতে থাকতে বোঝা যায়, কোনগুলির সঙ্গে থাকব। কোনগুলি কয়েকবার শুনব। কয়েকদিনের মধ্যে বারবার অফুরন্ত অসংখ্য শুনে স্পষ্ট হবে তা। কিছু গান থাকবে, কিছু গান হারাবে, মানুষের মতোই। গান তাহলে মানুষ, মানুষই তাহলে গান।
এক লজেন্সে গানে যা মনে হল, মধ্যবিত্ত মানুষের আয়নামহল। একেবারে ছাপোষা বিশেষত্বহীন মানুষের পদাবলী। সব ভুলে যাওয়া, সব হেরে যাওয়া। আত্মহত্যা করতে গিয়ে পিছিয়ে আসা লোক। ছোটোগল্পের বিষণ্ণ লোকের গান। আমার নতুন অ্যালবাম শুনতে শুনতে মনে পড়ছিল সেই হারানো বন্ধুর কথা। কতোদিন যে পাশাপাশি বসে গান শুনিনিকো।
বায়নাখোকা-র গানে গানে মগজ খেল বিটলেপোকার সুর নাছোড় হয়ে ঘুরছে। ঘুরেই চলছে। ছাড়ছে না কিছুতেই। বাস ধরব কলকাতায়, ভিড়, আখের রস, পেয়ারা, ভাতের হোটেল, নোংরা, মুখখিস্তি, আমি গুনগুন করছি।
কুকুর ও প্রজাপতি – এই গানটি থাকবে আমার সঙ্গে। এমন মায়া এমন প্রেম আবার সেই বুকের ধুকপুকানি। এরপর যাকে ভালোবাসব বইমেলার আগেই যত্ন করে, তার সঙ্গে শুনব এই গানখানি, বিধুর গানখানি।
মার শুনতে গিয়ে নতুন চন্দ্রবিন্দুর নতুন রং দেখলাম। মজার আড়ালে আঘাত রঙা মরিচা-লাল। এই ঢং যেন পুরোনো কবিয়ালের। এ্যান্টনি ফিরিঙ্গি যেন কথা বলছিলেন ফিসফিসিয়ে। টালোবাসা শুনতে শুনতে কথা বলা অমৃতলাল ডেকে উঠল আকাশে।
আমার জানলা দিয়ে গানটাও ওমন মায়ামেদুর। গানটির জন্য আজীবন প্রেমে পড়া যায়, যে কোনও বয়সে, যে কোনওদিন।
সংমিশ্রণ ঘটেছে গানের। বিভিন্ন রস এসেছে এখানে। বিভিন্ন মুডের গান। যে যার পছন্দ মতো খুঁজে নেবে।তারপর পথ হাঁটবে। গান শোনার পথ। একা ও বন্ধুজনের।
আমি কি চন্দ্রবিন্দুর কাছে আবার একটা মন, বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব চাইছিলাম? মনে হয়! কিন্তু কেন কে জানে! স্মৃতির দাবি! আবার ওই স্মৃতিকাতরতা, আবার মায়া; কিন্তু কেন চাইব? একের পর এক মন বা উঠে যাওয়া সিঁড়ি তৈরি করতে থাকলে তো, নিজেদের কেউ নিজেদের বিষে মরে যেতে হবে।
বুঝতে পারলাম, কিছু গান বুদ্ধিদীপ্ত, কিছু মায়াভরা, কিছু হাসির, কিছু সমসময়ের ধকধকে নাভিতে হাত রেখেছে। অনেক আদর ও প্রেম, অনেক মনকেমন ও ভালোবাসার পর হয়তো মার লিখতেই হয়তো, গাইতেই হতো। হতোই।
যার যার পছন্দমতো নিজের নিজের গান নিয়ে সে চলে যাবে। সাজানো আছে সব। নাও গান, হাতে হাত রাখো। বলো জীবন আলোসমান।
এই গানগুলি শুনলে আনন্দ হবে, ভাবনা হবে, আবার ভালোবাসতে ইচ্ছে হবে, প্রেমিক বা প্রেমিকাকে কিনে দিতে ইচ্ছে করবে ফুল। যারা ভালোবাসতে ভুলে গেছে তারা আবার ভালোবাসবে।
চুমুর গান মনে লেগে রইল মনের জলপুকুরের এক ধারে। এমন আদর, এমন সৌন্দর্য গহনা গানে বারে বারে শুনছি। একটা থ্যাঁতলানো খোসা ছাড়ানো সময়ের মধ্যে এমন ভালোলাগার বীজ পুঁতে দেওয়া হয়েছে গানে গানে।
বিকেল গানটিতে ছোটো ছোটো ডিটেইলে ছোটো ছোটো চিত্রকল্পে এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্য উড়ে গেছে। ঘন সকালবেলায় এ গানে বিকেলবাতাস আছে। অনেক দিনের মনে না পড়া আলো। এ গানের পিঠে ডানা আছে।
এই গানগুলি শুনলে আনন্দ হবে, ভাবনা হবে, আবার ভালোবাসতে ইচ্ছে হবে, প্রেমিক বা প্রেমিকাকে কিনে দিতে ইচ্ছে করবে ফুল, অনেকদিন ফোন না করা বন্ধুকে কল দিতে সাধ হবে। যারা ভালোবাসতে ভুলে গেছে তারা আবার ভালোবাসবে, আদরে বিশ্বাস ফিরে আসবে।
আজ বহুদিন পর, কুকুর ও প্রজাপতি চালিয়ে আমি হাঁটতে বেরোলাম। সাইকেল সঙ্গে নিয়ে। সাইকেল হাঁটিয়ে। পরিস্কার সাদা প্যান্ট পরে, স্নান করে উষ্ণজলে, ভাত খেয়ে। নিজেকে দেওয়া ছুটি আজ। গান শোনার ছুটি। এমনি এমনিই।
ফর্সা চায়ের দোকানে বসে চায়ে চুমুক দিলাম একলা। কয়েকটি বিস্কুট। কুকুরকে হাত থেকে খাওয়ালাম। এই গান এমনি শোনার। অকারণের। আনন্দের। কয়েকটি গান শুনব বারে বারে, নতুন করে, বিভিন্ন জায়গার, বিভিন্ন পর্যায়ের, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ক্ষণে। সেই পুরোনো বন্ধু, স্কুল বয়েস যার সঙ্গে নিয়মিত কথা হত, তাকে সকালবেলা গানটি পাঠিয়েছি। এই অ্যালবামের গানগুলি প্রেমের যোগাযোগ, বন্ধুত্বের সেতু।
টালোবাসা অ্যালবাম যদি তারাপদ রায়, ভাস্কর চক্রবর্তীকে শোনাতে পারতাম, খুশি হত মন। মনে মনে শোনাই। সব বন্ধুদের কথা না হওয়া গ্রুপে বা অল্প কথা হওয়া গ্রুপে রেখে আসি গান। চন্দ্রবিন্দুর সবাইকে সব বন্ধুদের আমার ভালোবাসা জানাই, তারা যেন গান বানায় আমাদের জন্যে, এমনকরেই; তাদের লাল চায়ের স্বাদ চিরদিন সুন্দর থাকুক।