‘অভিজাত বনমানুষ’ কিংবা ‘এস্কিমো কবি’ : রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ করে হরেকরকম কার্টুন

তাঁর চেহারা, পোশাক, চুল, দাড়ি, কণ্ঠ— সবকিছুই ব্যঙ্গের বিষয় হয়েছিল

সেঅনেক বছর আগেকার কথা। মধ্যযুগে অর্থাৎ ১৪শ থেকে ১৭শ শতকে রেনেসাঁর সময় ইতালিতে দেওয়াল চিত্র আঁকা চলছিল। চিত্রকরদের দলবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য আলাদা কাগজে স্কেচের মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হত। এই স্কেচগুলি পরিচিত ছিল কার্টোনি নামে। এর থেকেই পরবর্তীকালে ‘কার্টুন’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছিল। ১৮৪০ সাল থেকে কার্টুন শব্দটির প্রচলন হয়। ইংরেজি সাময়িকী পাঞ্চে প্রথমবার ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর থেকে সংবাদপত্রে নিয়মিত ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করা হত। ব্যঙ্গচিত্রের সঙ্গে শব্দ বা বাক্যও থাকত কখনও। অনেক সময় রাজনৈতিক অথবা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র আঁকা চলত। এই ধারা আজও চলছে। কার্টুন হল সমালোচনার এক অন্যতম পদ্ধতি। ঠাকুরবাড়ির জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতবর্ষে কার্টুন চিত্রের ধারাটিকে নিয়ে আসেন। এই কার্টুন চিত্র তৈরি হয়েছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরও। রবীন্দ্রনাথের বর্ণময় ব্যক্তিত্বকেও ব্যঙ্গের হূল ফোটানো হয়েছিল কার্টুনচিত্রের মাধ্যমে। স্তুতি হোক বা নিন্দা—রবি ঠাকুরের কার্টুন কম আকর্ষক বিষয় নয়।

জীবনের শুরু থেকেই বিচিত্র সব ব্যঙ্গ বিদ্রূপে অভ্যস্ত  ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর তাঁর উপর এসে পড়ল সারা বিশ্বের আলো। যশ ও অপযশ একত্রে এল। তাঁকে বিষয় করে কার্টুন আঁকতে বসলেন পৃথিবী বিখ্যাত কার্টুনিস্টরা। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কার্টুন প্রথম প্রকাশিত হয় জার্মানের পত্রিকা ও সংবাদপত্রে। সেই সব কার্টুনচিত্র এক একটি এক একরকম। কখনও রবীন্দ্রনাথের কার্টুন বলছে, “আমি এখানে এক ঘণ্টাও থাকব না, কেউ আমার লম্বা চুলের জন্য সামান্যতম যত্নও করছে না।” কখনও চুম্বন করতে ছুটে আসা বিদেশিনী মহিলাদের থেকে ছাতা বা ব্যাগ মাথায় দিয়ে ছুটে পালাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর দীর্ঘ কেশ ও শ্মশ্রূ গুম্ফের ভালোই পরিচর্যা করতেন। তাঁর লেখা চিঠিপত্র থেকে জানা যায় বিলিতি প্রসাধন কোম্পানি বুটসের হেয়ার টনিক ব্যবহারের প্রসঙ্গ। এছাড়াও তিনি নাকি চুলে সর্ষে বেটে লাগাতেন।

তাঁর চেহারা, পোশাক, চুল, দাড়ি, কণ্ঠ— সবকিছুই ব্যঙ্গের বিষয় হয়েছিল। তবে জার্মানদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি ছিল। কারণ তাঁদের ধারণা ছিল অস্ট্রিয়ান কবি Peter Rosegger সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হবেন। কিন্তু এটা তাঁদের ভুল ধারণা ছিল। রবীন্দ্রনাথ সে বছর নোবেল না পেলে পুরস্কার পেতেন ফ্রান্সের সাহিত্যিক Emilie Faguet। রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রবল ক্ষোভ থেকে জার্মানরা তাঁকে বলেছিল— ‘এস্কিমো কবি।’ সেসব ধরে রাখতে রবীন্দ্রনাথের চেষ্টাও তো কিছু কম ছিল না। 

কারণ যাই হোক, রবীন্দ্রনাথ তখন কার্টুন চিত্রকরদের জন্য জমজমাট বিষয়। একটা অন্যরকম ব্যক্তিত্ব তখন রবীন্দ্রনাথের। অনেকটা প্রফেটসুলভ। নিজেও খুব সচেতন সেই বিষয়ে। চুল, দাড়ি, আলখাল্লা এবং চেহারায় ঋষিসুলভ জেল্লা! আশ্চর্য ভোজনের অভ্যাস। নিমপাতা ফোটানো জল, করলার সবুজ শরবত, গোটা ভিজে মুগডাল আরো বিবিধরকম খাদ্য। রবীন্দ্রনাথ তাঁর দীর্ঘ কেশ ও শ্মশ্রূ গুম্ফের ভালোই পরিচর্যা করতেন। তাঁর লেখা চিঠিপত্র থেকে জানা যায় বিলিতি প্রসাধন কোম্পানি বুটসের হেয়ার টনিক ব্যবহারের প্রসঙ্গ। এছাড়াও তিনি নাকি চুলে সর্ষে বেটে লাগাতেন। এইসব রূপটানও কার্টুন শিল্পীদের আঁকার বিষয় হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ মঞ্চে এবং তাঁকে সামনে রেখেই চাঁদা তোলা হচ্ছে— এমন ছবিও পাওয়া যায়।

আরেকটি ছবিতে রবীন্দ্রনাথের কার্টুনমূর্তি এবং তাঁর পদতলে বসে আছেন রোটেনস্টাইন। এই কার্টুনে রোটেনস্টাইনের রবীন্দ্রস্তাবকতার ইঙ্গিতটি স্পষ্ট। আরেকটি কার্টুন ছিল এইরকম— দেওয়ালে লাগানো রয়েছে রবীন্দ্রনাথের গুরুগম্ভীর ছবি, সেই ছবি দেখে মূর্ছা গেলেন এক বিদেশিনী। কখনও কোনো বিখ্যাত সুন্দরীর সঙ্গে আইস স্কেটিং খেলা চলছে রবীন্দ্রনাথের— এমন সব কার্টুন। আসলে রবীন্দ্রনাথের আকস্মিক নোবেলপ্রাপ্তিতে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথও তাঁদের কাছ থেকে শীতল ব্যবহারই পেয়েছিলেন। অনেকেই, বিশেষ করে টমাস মান রবীন্দ্রনাথের লম্বা চুল, পোশাক ও নম্র ব্যবহার দেখে তাঁকে ‘একজন সুন্দর ইংরেজ বৃদ্ধা’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন। সেই আমলের বিদেশি ধর্মপ্রচারকরা অনেকেই রবীন্দ্রনাথকে ‘অভিজাত বনমানুষ’ বলেও ভেবেছিলেন। সেই ভাবনার প্রকাশও করেছিলেন।

উড়ন্ত রবীন্দ্রনাথের হাতে ছোট্ট তানপুরা আর তাঁর কাঁধে বসে থাকা ছোট্ট দোয়েল পাখি! সূর্যোদয় হচ্ছে, লাল টুপি পরা উড়ন্ত রবীন্দ্রনাথ গগন স্পর্শ করেছেন। এই কার্টুনটিতে মিশে রয়েছে সদর্থক আবেগ আর শ্রদ্ধা।

ইতালি সফরের একটি হাঙ্গেরিয়ান কার্টুন বেশ উল্লেখযোগ্য। কবি সম্বর্ধনা সভায়! সেখানে সকলে বিবিধ প্রকারে রবীন্দ্রনাথের মনোরঞ্জনের চেষ্টা চলছে। হিন্দু নর্তকী নৃত্যরত, বহু খাদ্যপানীয়ের সম্ভার। এসব দেখে জোব্বা পরা রবীন্দ্রনাথের চুল খাড়া হয়ে গেছে। এমন আরো অনেক ব্যঙ্গচিত্র ছড়িয়ে আছে পৃথিবী জুড়ে। কিন্তু এইসব কার্টুন কখনও রবীন্দ্রনাথের ভারতীয়ত্বকে ব্যঙ্গ করেছে, কখনও তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশেষত্বকে। খোলা মনের ব্যঙ্গচিত্র হিসেবে এইগুলিকে মনে রাখা যাবে না। সজনীকান্ত দাশ সম্পাদিত ‘শনিবারের চিঠি’-তে রবীন্দ্রনাথের কার্টুনচিত্র রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের একটি কার্টুন এঁকেছিলেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। স্বদেশির মাটিতে এ এক আশ্চর্য ব্যঙ্গচিত্র। এই ছবিতে চাকা লাগানো চেয়ার-সহ আকাশে উড়ে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর চশমা, জোব্বার প্রান্ত, রুপোলি চুল দাড়ি সব আকাশে উড়ছে। উড়ে যাচ্ছে কলমসহ ডায়ারি,বই, পাণ্ডুলিপি, ঘর সাজানোর শ্বেতপদ্ম আর ইংলিশম্যান পত্রিকা, ডেইলি হিন্দু, স্টেটসম্যান ইত্যাদি কাগজের পৃষ্ঠা। উড়ন্ত রবীন্দ্রনাথের হাতে ছোট্ট তানপুরা আর তাঁর কাঁধে বসে থাকা ছোট্ট দোয়েল পাখি! সূর্যোদয় হচ্ছে, লাল টুপি পরা উড়ন্ত রবীন্দ্রনাথ গগন স্পর্শ করেছেন। এই কার্টুনটিতে মিশে রয়েছে সদর্থক আবেগ আর শ্রদ্ধা। দূর বিদেশের পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা রবীন্দ্রনাথের কার্টুনগুলি এই আবেগের আকাশ ছুঁতে পারবে না কখনও। 

সহায়ক গ্রন্থঃ

কবিকে নিয়ে কার্টুন, সুশোভন অধিকারী

Developed by DXDasia