‘বিসর্জন’ নাটক চলাকালীন আবেগে বিহ্বল হয়ে কালীমূর্তি ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ
উডকাট কালী প্রিন্ট, সৌজন্যে- দ্য বেঙ্গল স্টোর
দেবতাদের শারীরিক অবয়ব নিয়ে লোককল্পনা ছিল অন্তহীন। মীমাংসা দর্শন লিখেছিলেন জৈমিনী। বলেছিলেন, দেবতারা ছিলেন মন্ত্রময়ী। মন্ত্রই দেবতাদের শরীর। প্রাচ্য দেবতাদের মনুষ্যোচিত কতগুলি শব্দ দিয়ে অভিহিত করার মধ্য দিয়েই দেবতাদের মানবিক প্রতিমূর্তির ইঙ্গিত রয়ে যায়। পাশ্চাত্য দার্শনিক জেনোফেনিস ছিলেন প্রায় ঔপনিষদিক। তাই দেবতাদের মর্ত্যমানুষের মতো আচরণ আবার তিনি মেনে নিতে পারেননি। ইথিওপয়িনরা নিজেরা নাক খাঁদা আর কালো বলে দেবতাদের একই রূপ দিয়েছিলেন। এই নিয়ে ব্যঙ্গও করেছিলেন জেনোফেনিস। তাঁদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে মানুষ নিজের মতো করেই দেবতার সৃজন করেছে। সেই কারণে দেবতাদের রূপ অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে। পৃথিবীর দেবসভার চিত্র পরিবর্তিত হয়ে চলেছে ক্রমশ। রবীন্দ্রনাথের দেবতা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ছিল নিজস্ব। ব্রাহ্ম পরিচয় তীব্র হলেও রবীন্দ্রসাহিত্যে দেবতাদের নিত্য আসা যাওয়া। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে রবীন্দ্রনাথ দিব্যি গড়েছেন এই দেবসমাজ। এখন আধুনিক সময়। কিন্তু দেবদেবীদের নিয়ে বিতর্ক কিছু কম হয় না। অথচ আমরা ভুলে যাই শিল্প ও সাহিত্যে কল্পনার স্বাধীনতার কথা। আজ রবীন্দ্রনাথের দেবী কালীকে নিয়ে চিন্তাভাবনার একটা রূপরেখা টানার চেষ্টা করি। রবি ঠাকুরের কালীভাবনাও একসময় বিতর্ক তৈরি করেছিল বটে।
দশমহাবিদ্যার প্রথম মহাবিদ্যা হল কালী। শক্তি উপাসকদের কাছে কালী হলেন আদ্যাশক্তি। এই দেবীর চার হাতে খট্বাঙ্গ ও চন্দ্রহাস, দুই বাঁ হাতে চর্ম এবং পাশ। গলায় নরমুণ্ড, দীর্ঘ দাঁত, রক্তচক্ষু, বিস্তৃত মুখ এবং স্থূল কর্ণ দেবীকে ভয়ঙ্কর রূপ দিয়েছে। এই দেবীর বাহন মুণ্ডহীন শব। পুরাণের গল্প থেকে জানা যায় দেবাসুরের সংগ্রামের সময় আদ্যাশক্তি মহামায়ার শরীর থেকে কৌষিকী নামের আরেকজন দেবীর আবির্ভাব ঘটে। এই দেবীর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই মহামায়া কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেন। তিনিই কালী। রাত্রিদেবী কালী নিজের রূপেই অন্ধকার দূর করেন। তিনি দিকবসনা, মুক্তস্বভাবের, মুক্তকেশী ও তাঁর গলায় মুণ্ডমালা। তিনি অশুভ বিনাশিনী।
আরও পড়ুন: বাংলার শিল্পীদের ভাবনায় কালী
রবীন্দ্রনাথ কালী বিগ্রহকে খুব সদর্থকভাবে দেখেননি। কালীর উপাসক শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্কেও তিনি সহজ হতে পারেননি। সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু দেবী কালী ও বলিপ্রথাকে সমর্থন করতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রসাহিত্যে দেবী কালী এসেছেন অন্য রূপে। ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের পনেরো সংখ্যক কবিতায় কালী হয়েছেন ‘রুদ্রাণী’। সুন্দর যখন অবমানিত হয়েছে, তখনই সেই রুদ্রাণীর তৃতীয় নয়ন থেকে বিচ্ছুরিত হয়েছে প্রলয় অগ্নি। ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের ‘মোহনা’ কবিতায় কালী ও মহাকালের এক আশ্চর্যসুন্দর রূপকল্প খুঁজে পাওয়া যায়— ‘কালীরে বক্ষে ধরি শুভ্র মহাকাল,/ বাঁধে না তারে কালো কলুষ জাল।’
রবীন্দ্রনাথ কালী বিগ্রহকে খুব সদর্থকভাবে দেখেননি। কালীর উপাসক শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্কেও তিনি সহজ হতে পারেননি। সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু দেবী কালী ও বলিপ্রথাকে সমর্থন করতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ।
‘বক্সাদুর্গস্থ রাজবন্দিদের প্রতি’ কবিতায় ‘রুদ্রাণীর বর’-এর কথা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর জীবনের শুরুতে ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘হরহৃদে কালিকা’। এই কবিতায় কালীভাবনার সার্থক প্রকাশ লক্ষ করা যায়। একদিন প্রলয়শিঙা যখন বেজে উঠবে তখন কালী রক্তআঁখি মেলে প্রলয়জগৎ নিয়ে যে খেলা খেলবেন তারই বর্ণনা আছে এই কবিতায়। ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের গানে কালীপ্রসঙ্গ আছে— ‘সন্ধ্যা হল গো ওমা, সন্ধ্যা হল, বুকে ধরো।/ অতল কালো স্নেহের মাঝে ডুবিয়ে আমায়, স্নিগ্ধ করো।’
কালীর ভয়ঙ্করী নগ্নিকা মূর্তি রবীন্দ্রনাথের কাছে আকর্ষক ছিল না। হয়তো তাই, ‘স্বদেশ’ পর্যায়ের ২১ সংখ্যক গানটিতে এই দেবীরই এক নবসৃজন করলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে…’। এই রাবীন্দ্রিক কালীমূর্তির ডান হাতে খড়গ, বাঁ হাত শঙ্কাহরণ করছে, দুই নয়নে প্রেমের হাসি এবং ললাটনেত্র আগুনবরণ। রবীন্দ্রনাথ নিজের মনের ইচ্ছায় পৌরাণিক নগ্নীকাদেবীকে রৌদ্রবসনী বলেছিলেন।
‘রাজর্ষি’ উপন্যাসে দেবী ত্রিপুরেশ্বরীর উপর কালীর প্রভাব স্পষ্ট। কালীপুজো ও বলি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নঞর্থক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে জয়সিংহের মন্তব্যে— ‘এইজন্যই কি সকলে তোকে মা বলে মা! তুই এমন পাষাণী! রাক্ষসী, সমস্ত জগৎ হইতে রক্ত নিষ্পেষণ করিয়া লইয়া উদরে পুরিবার জন্য তুই ওই লোলজিহ্বা বাহির করিয়াছিস। স্নেহ, মমতা, সৌন্দর্য, ধর্ম সমস্তই মিথ্যা , সত্য কেবল ওই অনন্ত রক্ততৃষা।’ এই উপন্যাসেই কথক রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ত্রয়োদশিয়ে দেবতার মাঝখানে কালী দাঁড়াইয়া নররক্তের জন্য জিহ্বা মেলিয়াছেন।’
ঠাকুরবাড়িতে ‘বিসর্জন’ নাটক অভিনয়ের সময় রবীন্দ্রনাথ রঘুপতি সেজেছিলেন। নাটক চলাকালীন আবেগে বিহ্বল হয়ে কালীমূর্তি ছুঁড়ে ফেলে দিতেও গিয়েছিলেন। শেষমুহূর্তে সম্বিত ফেরে। অবনীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, “অতবড় মাটির মূর্তি দুহাতে তুলে ধরে স্টেজের একপাশ থেকে আর এক পাশে হাঁটতে হাঁটতে একবার মাঝখানে এসে থেমে গেলেন। হাতে মূর্তি তখন কাঁপছে। আমরা ভাবি, কী হল রবিকাকার, এইবার বুঝি পড়ে যান মূর্তিসমেত। তারপর উইংসের পাশে এসে মূর্তি আসতে আসতে নামিয়ে রাখলেন। তখনো রবিকাকার উত্তেজিত অবস্থা।”

রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন
‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে সন্দীপ বিমলাকে কালী রূপে কল্পনা করেছিল— ‘মেয়েরা যদি পুরুষের কৃত্রিম বন্ধন থেকে মুক্তি পেত তাহলে পৃথিবীতে কালীকে প্রত্যক্ষ দেখতে পেতুম— সেই দেবী নির্লজ্জ, সে নির্দয়। আমি সেই কালীর উপাসক, বিমলাকে সেই প্রলয়ের মাঝখানে টেনে নিয়ে আমি একদিন কালীর উপাসনা করব।” এছাড়াও এই উপন্যাসের আরেকটি জায়গায় মহাকালীর সুন্দর ইঙ্গিত আছে— ‘এই বাড়ির মনের মধ্যে ডাকাতের দল খাঁড়া হাতে নৃত্য করতে করতে বর মাগতে লাগল।’ ‘অনধিকার প্রবেশ’ গল্পের জয়কালী নামের চরিত্রটির সম্পর্কে কথকের মন্তব্য— ‘এই স্ত্রীলোকটির প্রকৃতির মধ্যে বহুল পরিমাণে পৌরুষের অংশ থাকাতে তাঁর যথার্থ সঙ্গী কেউ ছিল না।’ ‘জাপানযাত্রী’-র ৪ সংখ্যক অধ্যায়ে ‘কলবাহন বাণিজ্য’-র সমালোচনা লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘অন্নপূর্ণা আজ হয়েছেন কালী, তাঁর অন্নপরিবেশনের হাতা আজ হয়েছে রক্তপান করবার খর্পর। তাঁর স্মিতহাস্য আজ অট্টহাস্যে ভীষণ হল।’ ‘বাতায়নিকের পত্র’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ‘প্রতাপসুরামত্ত য়ুরোপের পলিটিক্স’-কে শক্তিপুজো বলেছিলেন। সেখানে শক্তিমূর্তি সম্পূর্ণ উলঙ্গ নয়। ‘কিন্তু তার লেলিহান রসনার উলঙ্গতা কোথাও ঢাকা নেই। পীস কনফারেন্সের সভাক্ষেত্রে তা লকলক করছে।’ একই বইয়ের ‘শক্তিপুজো’ প্রবন্ধে কালীকে তিনি ‘দস্যুর উপাস্য’, ‘ঠগীর উপাস্য’, ‘কাপালিকের উপাস্য’ দেবতা শক্তি বলেছিলেন। ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ নাটকে ডাকাতদের উপাস্য ছিলেন কালী। কিন্তু সরস্বতীর আশীর্বাদধন্য বাল্মিকী কালীকে ছেড়ে সরস্বতীর কাছেই আত্মসমর্পণ করেন। ‘বিসর্জন’ নাটকেও জনতা চরিত্র বলে, ‘মা পাঁঠা পায়নি, এবার জেগে উঠে তোদের এক একটাকে ধরে ধরে মুখে পুরবে।’ এই নাটকের শেষে কালীমূর্তি বিসর্জন দেওয়ার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের তীব্র কালীবিদ্বেষই প্রকাশিত হয়েছে।
কালীর ভয়ঙ্করী নগ্নিকা মূর্তি রবীন্দ্রনাথের কাছে আকর্ষক ছিল না। হয়তো তাই, ‘স্বদেশ’ পর্যায়ের ২১ সংখ্যক গানটিতে এই দেবীরই এক নবসৃজন করলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে…’।
আমাদের মনে হয় যে কালী উপাসনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বলি প্রথা, সেই উপাসনা পদ্ধতিকে রবীন্দ্রনাথ সমালোচনা করেছিলেন। কালীর বিবসনা, উগ্র মূর্তিকেও নিজস্ব কল্পনায় অনেক কোমল করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কখনও পদ্মা নদীর জল আর কালীমূর্তি এক হয়ে গিয়েছিল তাঁর চোখে। ‘তাঁকে মনে করলে আমার কালীমূর্তি মনে হয়— নৃত্য করছে, ভাঙছে এবং চুল এলিয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে।’ নিজের কল্পনার দেবলোকে কঠিনে কোমলে রবীন্দ্রনাথ গড়েছিলেন কালীকে।
আসলে মানুষ দেবতা গড়ে, যুগে যুগে নিজের মতো করে এই নির্মাণপর্ব চলছে এবং আগামীদিনেও চলবে। দেবতা মানুষের অন্তরের শক্তির প্রকাশ। কালী এক অত্যন্ত আধুনিক ভারতীয় দেবী। শুধুমাত্র অতিভক্তির উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে তাঁকে ধরা এবং বোঝা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথ শৈল্পিক কল্পনার তুলির টানে ইচ্ছেমতো কালীমূর্তি গড়েছেন। সেই দরজাটা শিল্পের স্বার্থে উন্মুক্ত থাকুক।
সহায়ক গ্রন্থঃ
হিন্দুদের দেবদেবী, হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য
রবীন্দ্রনাথের দেবলোক, মহুয়া দাশগুপ্ত