
এইসব জাহাজে চড়েই ব্রিটিশ সৈন্যদল পৃথিবীর নানা প্রান্তে পৌছে যেত
তখন পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও ইংরেজ নৌবহর ভারতের জলপথে বেশ শক্তিশালীভাবেই দখল নিয়ে শাসন করছে। বণিকের মানদণ্ড ততদিনে দেখা দিয়েছে রাজদণ্ড হয়ে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া সরকার তখন কলকাতায় পাকাপাকিভাবে বসেছে। সেই সময়ে কলকাতা শহরে কোম্পানির সেনাদল আসত ইস্ট ইন্ডিয়াম্যান জাহাজে করেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজগুলি এই নামেই পরিচিত ছিল।
এইসব জাহাজে চড়েই ব্রিটিশ সৈন্যদল পৃথিবীর নানা প্রান্তে পৌছে যেত। সরকারি নির্দেশমতো ব্রিটিশ সৈন্যদলের কিছু সদস্য ইংল্যান্ড থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতেন এমন জাহাজে। মূলত তাদের প্রশাসনিক ছাড়পত্র পেলে তবেই আনা হত। নানান বিদ্রোহ দমনের জন্য এইসব সৈন্যদের পাঠানো প্রয়োজন হয়েছিল। প্রথমে মোজাম্বিক নামের পর্তুগিজ একটি দ্বীপে সেনাদল এসে পৌছত এরপর সেখানে সপ্তাহ খানেক কাটিয়ে মাদ্রাজের দিকে জাহাজ রওনা দিত। সমুদ্রের আবহাওয়া সব সময় এক থাকে না। ঝোড়ো হাওয়ায় সমুদ্র উত্তাল হয়। আকাশের মুখ পাল্টাতে থাকে। উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে জাহাজ এগোতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। নাবিকের সামান্য ভুলচুকে ঝড়ের মুখে ইস্ট ইন্ডিয়াম্যান জাহাজ সমুদ্রের ঢেউয়ে যে কোন মুহূর্তে বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। মাইলের পর মাইল পথ অতিক্রম করে জাহাজ অবশেষে আসতো গঙ্গা নদীর বুকে। ক্রমশ জাহাজ কোম্পানির বসত এলাকা কাছে আসতে থাকে। এখানে নদী বেশ অনেকখানি জুড়ে চওড়া। নদীর পাড় ধরে বাড়িগুলি জাহাজ থেকে খুব সুন্দর দেখতে লাগত।
ইংল্যান্ড থেকে রওনা হবার পর অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া, বিভিন্ন রোগ, নানা ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পড়ে কোম্পানির অনেক সৈন্য মারা যেতেন। এখানকার আবহাওয়া ব্রিটিশদের কাছে ছিল খুবই অস্বাস্থ্যকর। তারমধ্যে ম্যালেরিয়া, কলেরা, ওলাওঠার মতো কিছু মহামারি রোগ লেগেই থাকত। সৈন্যদলের যে ক’জন এসে পৌঁছতেন, তার মধ্যে কিছুজন বাদে প্রায় সকলেই এই কয়েক মাসে মারা যেতেন বিভিন্ন রোগে, এই নতুন আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে। ইউরোপীয় সৈন্যরা জাহাজ থেকে দেখতেন এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা। হাট-বাজার, মানুষের চলাচল, শান্ত দুপুরে গাছের নিচে বসে হুকা সেবন। তাছাড়া সেই সময়ে দেখা যেত, কোনও রোগীর আর ভালো হওয়া সম্ভব নয় বুঝলে নদীর ধারে তাকে বয়ে এনে অস্বাভাবিকভাবে মাটি দিয়ে কান, নাক ও মুখ বন্ধ করে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হত। মৃত স্বামীর সঙ্গে জীবিত স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারা হত। তবে এদেশে এসে ব্রিটিশ সৈন্যদল দেখেছিল, ইংল্যান্ডের চেয়ে খাবারদাবার এখানে খুবই সস্তা ও যথাযথ পরিমাণে পাওয়া যায়। তাই খাওয়াদাওয়া প্রচুর পরিমাণে কয়েক সপ্তাহ তারা করতেন। জাহাজে এখান থেকে উৎকৃষ্ট মানের হাঁস মুরগি, মাছ, তরিতরকারি প্রচুর খাবার মজুত করে নেওয়া হত।
কলকাতার ট্যাঙ্ক স্কোয়ারে সেকালের প্রথম দিককার কিছু ট্যাভার্ন গড়ে উঠেছিল। এগুলি সবই ছিল সাহেবদের বিশ্রামস্থল। জাহাজে আগত সাহেবরা মূলত এখানে কিছু দিনের জন্য খানাপিনা হৈহল্লায় মেতে উঠতেন। তারা বুঝেছিলেন বাংলায় যেমন সজ্জন নির্ঝঞ্ঝাটভাবে অনেক মানুষই থাকতেন তেমনই অভাবের সাথেও কষ্ট করে মানুষকে থাকতে হত। তবে শ্বেতাঙ্গদের এইসব মানুষ এড়িয়ে চলেন। মসলিন, রেশম আর আফিম বাংলা থেকে রপ্তানি হতে দেখতেন সৈন্যরা।
ইস্ট ইন্ডিয়াম্যান জাহাজগুলির সৈন্যরা বেশ কয়েক মাস কলকাতায় থাকার পর অনেকেই আবার রোগের কবলে পড়ে অসুস্থ হতেন। মাদ্রাজে ভালো সাহেব ডাক্তার দেখাতে ফের জাহাজে চড়ে রওনা দিতেন। মাদ্রাজে গিয়ে বেশ সৈন্যরা খানিকটা সুস্থ হলে দেশে ফেরত পাঠানো হত। সেকালের ধূসর নগর জীবনের মোটামুটি অনেকটা এরকম ছবি পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র – Calcutta in 18th Century, P. Thankappan, Bengal Past and Present (1933 Edition)
ছবি – টমাস ডানিয়াল
