আজও বাসকে ঘিরে ‘মায়া’ তৈরি হয়নি মহানগরে
কলকাতার পরিবহনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, কেমন একটা অনাদর যেন এই যানটিকে ঘিরে। লঝঝরে বাদুড়ঝোলা চেহারা। কলকব্জা ঢিলেঢালা। বিশাল বপু। আর তা নিয়ে কলকাতার রাস্তায় তার যাতায়াত বেশ সমস্যাজনক। ট্রাম বা ট্রেনের মতো কৌলীন্য তার নেই। ফলে আলাদা লাইন নেই। সাদা রঙ দিয়ে যতই বাস-বে লেখা জায়গা থাক না কেন, ঠিক সেই রাস্তা দখল হয়ে যায় ঝাঁ-চকচকে বেয়াদব চার-চাকায়। এত বিশাল যে, তাকে এত্তটুকু সমীহ নেই কারো। কলকাতার ট্রাফিকে এই বাসের দল সবথেকে বেশি কেস খায়। ঠিক তেমনটা খেয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির বিখ্যাত ওয়ালফোর্ড কোম্পানির বাস। কলকাতায় একটা পরিমাণ জনপ্রিয়তা পেয়ে সে আসর জমিয়ে বসেছিল। অথচ কিছুদিনেই শুনতে হল ‘নিকাল যাও’। এমন কত বাসই যে কলকাতা থেকে বাতিল হল – তার আর ইয়ত্তা নেই।
আরও পড়ুন
ঘোড়ার গাড়িই একসময়ের ফ্যাশান ছিল কলকাতায়
শোনা যায়, কলকাতায় প্রথম বাস চলেছিল ১৮৩০ সালে। প্রথম যুগে অবশ্য তার নাম ছিল, ‘ওমনিবাস’। পরবর্তীকালে শেষ দুটো অক্ষর দিয়েই সে পরিচিত হয়। ইংল্যান্ড থেকে এসেছিল ওমনিবাস। চারটি লোহার চাকাসহ একটা কাঠামো শুধু। বাকি বসার জায়গা ও অন্যান্য কলকব্জা কলকাতায় বসানো হত। তিনটি ঘোড়ায় টানা এই ওমনিবাস চৌরঙ্গী ছাড়িয়ে শহরতলি অবধিও পৌঁছে যেত। কিন্তু সেসময়ে মোটেই সে জনপ্রিয়তা পায়নি। অমসৃণ রাস্তায় যখন সে চলত, ঝাঁকুনির ঠেলায় ভিতরে যাত্রীদের নাকি অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে উঠত। ফলে ওমনিবাসকে এদেশের পাট গোটাতে হয়। পালকি, ঘোড়ার গাড়ির রাজত্বে সে কিস্তিমাত করতে পারেনি।
১৮৬৫ সালে টিই টমসন অ্যান্ড কোম্পানি স্টিমচালিত গাড়ির বিজ্ঞাপন বের করে। সেসময় থেকে গরু বা ঘোড়ার গাড়ির বদলে বাষ্পশক্তি চালিত যান কলকাতার রাস্তায় দেখা যেতে থাকে।
ধীরে ধীরে তার কাঠামোর উন্নতি ঘটে। ১৯১২ সালে ওয়ালফোর্ড কোম্পানির বাস কলকাতায় বেশ ভালোই সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ তার শত্রুপক্ষের বাসকে ১৯১৪ থেকে আর ছাড়পত্র দেয়নি। ইতিমধ্যে ট্রাম কোম্পানি কিছু বাস কলকাতায় চালাতে শুরু করে। ট্রামের ভাড়ার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বাসের ভাড়া নির্ধারিত হত। বাসের গ্যারেজে সেই অর্থনৈতিক মন্দার যুগে অনেক বাঙালি যুবক কাজ পেয়েছিল। তবে বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কলকাতায় বেশ আকালই ছিল বাস নামক গুরুত্বপূর্ণ যানটির।
১৯২০-তে দোতলা বাস। একশো বছর আগে। চালু হয়েছিল অবশ্য ১৯২৬-এ। তারপর ৯০-এর দশকে সেও বন্ধ। ইতিমধ্যে অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে কলকাতায় বাস চলেছে। ভাড়া বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন হয়েছে। ইদানিং প্রচুর বেসরকারি নতুন মডেলের বাস কলকাতায় চলে বটে। তবে আজও এই যানকে ঘিরে ‘মায়া’ তৈরি হয় না। ঠাসাঠাসি ভিড়ে কোনো গল্প গজিয়ে ওঠে না। বাস আমাদের একান্ত প্রয়োজনের বাহন। এটুকু ছাড়া তার আর কীই বা গুরুত্ব!
ঋণ : ‘বাংলার কলকারখানা ও কারিগরি বিদ্যার ইতিহাস’, জিতেন্দ্রনাথ রায়