একই অঙ্গে টক ও ঝাল – সাবেকিয়ানায় ভরপুর আন্দুল রাজবাড়ির রুই মাছের হরগৌরী

বনেদিবাড়ির পাকঘর-এর পঞ্চম পরিবেশন

নেদিবাড়ির ঐতিহ্য, ইতিহাস, রোমান্টিকতা শুধুমাত্র কলকাতাতে আটকে থাকে না, পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে অসংখ্য বনেদিবাড়ি রয়েছে—বরং সেখানে অনেক বেশি রং এবং গভীরতা। ইতিহাসের পাতায় যেমন অমর হয়ে থাকবে এসব বাড়ি, তেমনই তাদের রান্নাঘরও। রান্নার কিছু কিছু পদ কোনও কোনও পরিবারের হাত ধরে ঢুকে পড়ে ইতিহাসের খাতায়, সর্বসাধারণের হেঁশেলে। দেশিয় থেকে কন্টিনেন্টাল, আমিষ থেকে নিরামিষ, নোনতা থেকে মিষ্টির নানান পদ আজও ‘পাক’ হয় সেই সব পরিবারের উত্তরসূরির রন্ধনশালায়। প্রতিটি বনেদি পরিবারের খাওয়া-দাওয়াতেই থাকত এক-একটি সিগনেচার পদ। শতক পেরিয়ে ধুমধাম, আনন্দ-জৌলুসে ঘাটতি পড়লেও রীতি ভাঙতে পারেনি এখনও বহু পরিবার। বাংলার বিভিন্ন অভিজাত পরিবারের বিশেষ বিশেষ পদের কথা, তাদের বিচিত্র সব নাম শুনলে জিভে জল আর মনে কৌতূহলের উদ্রেক হয় বইকি! তাই বনেদিবাড়ির রাজকীয় রান্না, তাদের পাকঘরে এবার ঢুঁ মারবে ‘বঙ্গদর্শন’।

প্রথম দিনের প্রথম কিস্তিতে পরিবেশন করা হয়েছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির ১১৭ বছরের পুরোনো পদ ‘পদ্মলুচি’। দ্বিতীয় কিস্তিতে ছিল প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি মিষ্টি পদ – ঠাকুরবাড়ির ‘দামোদা’। এই মিষ্টান্ন’র উল্লেখ পাওয়া যায় পূর্ণিমা ঠাকুর প্রণীত ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’ বইতে। তৃতীয় পর্বে ছিল গিরিশ ভবনের ছানার কালিয়া আর চতুর্থ কিস্তিতে শিবপুর রায়চৌধুরী বাড়ির ‘কদলী পায়েসান্ন’। পঞ্চম কিস্তিতে কোন বনেদি হেঁশেলে ঢুঁ মারা যায় ভাবতে ভাবতে হাতে পাওয়া গেল কবিতা চৌধুরীর লেখা ‘রাজবাড়ির রান্নাঘর’। কবিতা চৌধুরী আন্দুলের জমিদার দত্ত চৌধুরী বাড়ির বৌ এবং আন্দুল রাজবাড়ির মেয়ে। তিনি তাঁর বইতে লিখেছেন, তিনি বড়ো হয়েছেন যে বাড়িতে, সেই আন্দুল রাজবাড়ি তখন ভগ্নপ্রায়। পরিবারের লোকজনদের মুখে শুনেছেন পূর্বপুরুষদের বিলাস-ব্যসন, দানধ্যান ইত্যাদির গল্প। একান্নবর্তী পরিবারের রাজবাড়ির বিশাল পরিধির মধ্যে প্রচুর আত্মীয় ও জ্ঞাতিদের বাস। মা-ঠাকুমার পাকশালে পরিচয় পেয়েছেন সেকালের রাজবাড়ির রান্নার স্বাদ, যা সাবেক, চিরকালীন বাংলার সংস্কৃতিরই অঙ্গ। এই রান্নার সঙ্গে যোগ হয়েছিল—শৌখিন ভূস্বামীদের বহাল করা হালুইকর ও বাবুর্চিদের সৃষ্ট পদও। কবিতা চৌধুরীর লেখা বই থেকেই পাওয়া গেল আন্দুল রাজবাড়ির বহু বছর পুরোনো রেসিপি, রুই মাছের হরগৌরী। বঙ্গদর্শনের পাঠকদের জন্যে এটিই পঞ্চম পরিবেশন।

 

হরগৌরী বা গঙ্গাযমুনা বাঙালি রন্ধনশৈলীর অন্তর্গত একটি ঐতিহ্যবাহী মাছের পদ, যেখানে মাছের এক পাশটা হয় ঝাল ও অন্য পাশটা টক। ঝাল ও টক দুইয়ের সমাহার থাকায় এই পদটিকে অনেক সময় টক-ঝালও বলে। হরগৌরী যে কোন মাছেরই হতে পারে, তবে রুই, বোয়াল, চিতল, ইলিশ, রাইখর ও কই মাছের হরগৌরী বিশেষ জনপ্রিয়।

যেভাবে বানাবেনঃ

বড়ো রুই মাছ বা বড়ো বাটা মাছের আঁশ ভালো করে ছাড়িয়ে গা-টা একটু চিরে দিতে হবে। ভালো করে নুন-হলুদ মাখিয়ে বড়ো ফ্রাইপ্যানে ভেজে নিতে হবে। ওই ফ্রাইপ্যানে পোড়া তেল তুলে পরিষ্কার সরষের তেল দিয়ে টম্যাটো কুচি দিয়ে নাড়তে হবে। টম্যাটো নরম হলে লঙ্কাবাটা, হলুদবাটা, নুন দিয়ে কষে জল দিতে হবে। জল কিছুক্ষণ ফোটার পর আলাদা একটা পাত্রে ঢেলে রাখতে হবে। এবার ওই ফ্রাইপ্যানে মাছ দিয়ে যে টম্যাটো-লঙ্কার জুস করা আছে মাছের পাশ দিয়ে অল্প অল্প করে ঢালতে হবে। আঁচ কমিয়ে রাখতে হবে। মাছ সিদ্ধ হয়ে গেলে গ্রেভি যা আছে মাছের গায়ে লাগিয়ে রাখতে হবে। ফ্রাইপ্যান ধুয়ে এবার সরষের তেল দিয়ে সরষে ও শুকন লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে মাছের যে পিঠটা ভাজা আছে সেদিকটায় দিতে হবে। একটি পাত্রে তেঁতুল ও আখের গুড় গোলা ঘন জল করে রাখতে হবে। এবার পাশ থেকে অল্প অল্প তেঁতুলের জল দিতে হবে যতক্ষণ না মাছ সেদ্ধ হয় ও তেঁতুল জল শুকিয়ে না যায়। মাছ সুন্দর প্লেটে সাজিয়ে পরিবেশন করুন। 

Developed by DXDasia