“শিল্পী নই, আমি একজন প্রপাগান্ডিস্ট”

আজ উৎপল দত্তের ৯০তম জন্মদিন

উৎপল দত্তের জন্মের সময় বিশ্বব্যাপী এক ভয়ংকর বিক্ষুব্ধ ঝোড়ো হাওয়া বয়ে চলেছে। সারা বিশ্ব এবং বিশেষ করে পাক-ভারতীয় উপমহাদেশে তখন প্রতিদিনের পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করা কঠিন ছিল। বিশ শতকের প্রথম দশক থেকে বিশ্ব রাজনীতির পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকল অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধের প্যাটার্ন, এমনকি মানুষের অন্তর্লীন রাজনীতিও। উৎপল দত্তের বেড়ে ওঠা এই সময়ের ভেতরে। ছোটো থেকেই তাই রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সংঘাত তাঁকে খুব করে টেনেছে। 

উৎপল দত্ত কেবলমাত্র একজন অভিনেতা, নির্দেশক বা লেখকই ছিলেন না, তাঁর রাজনীতির আদর্শ ছিল বামপন্থা ও মার্ক্সবাদ। কলেজ জীবনেই অভিনয় শুরু করেন উৎপল। ১৯৪৭ সালে নিকোলাই গোগলের ‘ডায়মন্ড কাটস ডায়মন্ড’ এবং মলিয়েরের ‘দ্য রোগারিজ অব স্ক্যাপা’ দিয়েই তার কলেজ জীবনের অভিনয় শুরু। নাটক দুটি প্রযোজনা করেছিল কলেজের ইংরেজি একাডেমি এবং পরিচালনায় অধ্যাপক ফাদার উইভার। ক্রমশ উৎপল ও কলেজের কয়েকজন সহপাঠী মিলে গড়ে তোলেন একটি নাট্যদল- ‘দ্য অ্যামেচার শেক্সপিয়ারিয়ান্স’। তাদের প্রথম উপস্থাপনা ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ এবং ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের নির্বাচিত অংশ।

রাজনৈতিক থিয়েটারের ইতিহাস শুরু হয় মূলত দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মাধ্যমে। তখন উনিশ শতকের মধ্যভাগ। রামমোহন, বিদ্যাসাগর’রা এসে প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এরপর জাতীয়তাবাদী উন্মেষ পর্বে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, উমেশচন্দ্র গুপ্ত প্রমুখরা আসেন রাজনৈতিক নাটক নিয়ে। পরবর্তীকালে গিরিশ ঘোষ বা দ্বিজেন্দ্রলালবাবুরা, এমনকি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত রচনা করেছিলেন রাজনৈতিক নাটক। এই তালিকার পর আসেন উৎপল দত্ত, সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে। তাঁর ‘টিনের তলোয়ার’-এর ঝনঝনিতে বাংলা থিয়েটারের দর্শক এক জায়গায় চুপটি মেরে বসে থাকতে পারেননি। বিদেশি নাটক বিশেষত শেক্সপিয়ার থেকে অনুপ্রাণিত উৎপল বারবার বলতেন, “আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যেকোনো আখ্যা লোকে আমায় দিতে পারে। তবে আমি মনে করি আমি একজন প্রপাগান্ডিস্ট। আর এটাই আমার মূল পরিচয়।”

১৯৫০ সালে ‘বিদ্যাসাগর’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর হাতেখড়ি। ‘মাইকেল মধুসূদন’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজের আসন পাকা করে নেন। পরবর্তীকালে একের পর এক বাণিজ্যিক ছবিতে কাজ করেন। ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘ভুবন সোম’, ‘গোলমাল’, ‘নরম গরম’, ‘সাহেব’ ইত্যাদি ছবিতে তাঁর অভিনয় আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল। উৎপল দত্তের নাটকে সমাজব্যবস্থার পাশাপাশি উঠে এসেছে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে জোরালো কণ্ঠস্বর।

আজ উৎপল দত্তের নব্বই তম জন্মদিন। এখনও কি আমাদের মনে হয় না, কোথায় হারিয়ে গেলেন উৎপল! তাঁর মতো রাজনীতি সচেতন মানুষ যে বড়োই প্রয়োজন এই সমাজে। তিনি একজন আদর্শ, তিনি শিক্ষক। আজকের ঘুণধরা সমাজে ধর্ম নিয়ে, জাত নিয়ে, বর্ণ নিয়ে রাজনীতির মরশুমে উৎপলরা একজন সাধারণ মানুষের মতোই বারবার ফিরে আসুক। এরকম বিক্ষুব্ধ সময়ে বন্ধু হওয়াটাই সবথেকে প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র- ভোরের কাগজ 

Developed by DXDasia