কাঠের ট্রে-কোস্টারে বাংলার রূপ

ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন

“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।” ঊনবিংশ শতকের নব্বই দশকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই আকাঙ্ক্ষা আজ বড়োই স্পষ্ট। প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার চাহিদা আজ বেশি করে অনুভূত হয়।
বাংলার কারুশিল্প বহুদিন ধরেই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে কাঠ, মাটি সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে। বাংলার কাঠশিল্প সেই ঐতিহ্যেরই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে সাধারণ কাঠ-কারিগরের দক্ষ হাতে হয়ে ওঠে শিল্পের অনন্য নিদর্শন।

মূলত পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি এবং নান্দনিকতাকে সামনে রেখেই এ রাজ্যের কারুশিল্পীরা নতুন ধরনের পণ্য বাজারে আনছেন। তবে কাঠশিল্প কখনই অরণ্যের ক্ষতি করে পণ্য উৎপাদন করেনি।

ভারতীয় উপমহাদেশের একটা বড়ো অংশ কাঠশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমবঙ্গ এর মধ্যে অন্যতম। বাংলার উত্তরে শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, দিনাজপুরের মতো জেলাগুলির পাশাপাশি দক্ষিণের হাওড়া এবং চব্বিশ পরগনায় তৈরি হয় সেগুন, শিশু ও মেহগনি কাঠের নানান গৃহসজ্জার উপাদান। অন্যদিকে বাঁকুড়া, যা মূলত টেরাকোটা শিল্পের জন্য বিখ্যাত, বর্তমানে কাঠশিল্পের দিকেও ঝুঁকছে। সেখানে টেরাকোটার মোটিফ এবং শিল্পশৈলীকে ভীত বানিয়েই তৈরি করা হচ্ছে কাঠের বিভিন্ন পণ্য। পূর্ব বর্ধমানে ‘বাংলার পুতুল গ্রাম’ নামে পরিচিত নতুনগ্রামের কাঠশিল্পী তথা সূত্রধরেরা দশকের পর দশক ধরে বয়ে নিয়ে চলেছে কাঠশিল্পের ঐতিহ্য। তাঁদের নিপুণ কারুকার্যে কাঠের মাধ্যমে ফুটে ওঠে নানা দেবদেবীর মূর্তি কিংবা পশুপাখির অবয়ব। একইভাবে এই জেলার কালনা অঞ্চলের সূত্রধরেরা আমগাছের কাঠ থেকে বানান বিভিন্ন আকারের থালা ও বাটি। এই জেলার একটা বড়ো অংশের আয়ের উৎস হল কাঠের হস্তশিল্প।  

রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল সহ কলকাতায় অসংখ্য পরিবারের রুজিরুটি চলে এই কাঠের কাজ করে। এখানে শুধু কাঠের আসবাব বা পুতুলই নয়, আধুনিক ধরনের ব্যবহারিক এবং গৃহসজ্জার পণ্যও তৈরি করা হচ্ছে। মূলত পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি এবং নান্দনিকতাকে সামনে রেখেই এ রাজ্যের কারুশিল্পীরা নতুন ধরনের পণ্য বাজারে আনছেন। তবে কাঠশিল্প কখনই অরণ্যের ক্ষতি করে পণ্য উৎপাদন করেনি। বরং সহজেই বেড়ে ওঠা গাছ এবং পুরোনো কাঠের পুনর্নবীকরণকে সঙ্গী বানিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলার কাঠ শিল্পীরা। 

বাজারে আধুনিক পণ্য হিসাবে দেখা যাচ্ছে কাঠের চিরুনি থেকে শুরু করে রান্নার বাসনপত্র, ট্রে, কাঠের বাতি (ল্যাম্প), ট্রে-কোস্টার আরও কত কী। এমনকি, বর্তমান প্রজন্মের মনের মতো পণ্য সরবরাহেও খামতি রাখছেন না শিল্পী এবং শহুরে বিপণিগুলি। যেহেতু গৃহসজ্জায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নান্দনিকতা অগ্রাধিকার পাচ্ছে, তাই জনপ্রিয়তা এবং নস্টালজিয়া মেশানো কিছু বিষয়কে থিম বানিয়ে নানান বাণিজ্যিক পণ্য বানানো হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম বাঙালিয়ানা এবং কলকাতার নস্টালজিয়া।

বর্তমানে কাঠশিল্প শুধুই যে জীবিকার উৎস তা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার কারুশিল্পীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্য, যা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং হস্তশিল্পীদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকেও শক্তিশালী করছে।

কলকাতার যোধপুর পার্কে অবস্থিত দ্য বেঙ্গল স্টোর-এ পাওয়া যাচ্ছে এমনই কিছু মনমুগ্ধকর ট্রে-কোস্টার। শিল্পী উদয় দেব-চিত্রিত, স্থানীয় দারুশিল্পীর হাতে তৈরি পাইন কাঠের ট্রে-কোস্টারে দেখা মিলবে কলকাতার গলি ক্রিকেট থেকে শুরু করে, হাওড়া ব্রিজ, শহীদ মিনার, কফি হাউস, হলুদ ট্যাক্সি, হাতে টানা রিক্সা সহ নানান নস্টালজিক বিষয়ের। এর পাশাপাশি শিল্পীর অলঙ্করণে ধরা পড়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা বিষয়। টেরাকোটার হাতি-ঘোড়া, বাংলার মেছো বেড়াল, কুমোরপাড়ার মৃৎশিল্পী, উত্তরবঙ্গের মুখোশশিল্প, নকশি কাঁথার মাঠ থেকে শুরু করে রয়েছে বই পড়া-নাচ-গান-নাটক-চারুকলার মতো বাংলার নানা সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ। উদয় দেবের শিল্পকর্ম ছাড়াও বাংলার মাদুর, বেতের চাটাই, হাতে বোনা কাপড় দিয়ে তৈরি অসাধারণ কিছু কাঠের ট্রে-কোস্টারের সংগ্রহ এখানে পাবেন। দ্য বেঙ্গল স্টোর-এর এই পণ্যগুলি যেমন বাংলার ঐতিহ্যকে সমসাময়িকভাবে উপস্থাপন করছে, তেমনই পরিবেশবান্ধব জীবনধারার প্রসারেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমানে কাঠশিল্প শুধুই যে জীবিকার উৎস তা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার কারুশিল্পীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্য, যা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং হস্তশিল্পীদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকেও শক্তিশালী করছে।

____________ 
দ্য বেঙ্গল স্টোর | ১২৭, গড়িয়াহাট রোড, যোধপুর পার্ক, কলকাতা ৬৮ | সোম-শনি ১১-৮টা | রবিবার ১২-৮টা
অনলাইন স্টোর:
https://thebengalstore.com/ 
 

Developed by DXDasia