শহরকেন্দ্রিক বাজারের গেরোয় কদর কমেছে কাঠের খেলনা গাড়ির

রূপ ও বৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলার লোকশিল্প

শৈশবের ভালোবাসাগুলো মাঝে মাঝেই পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে। তার মধ্যে নতুন করে পাওয়ার কিছু থাকে না। শুধু থেকে যায় হারিয়ে গিয়ে ফিরে পাওয়া ভালোলাগার রেশ। বঙ্গজীবনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এমন বহু স্মৃতি রয়েছে, যা ফিরে ফিরে আসে। সেই ফিরে আসার পথে তারা বাঙালিকে স্মৃতিমেদুর করে তোলে। আর সেই স্মৃতিমেদুরতাকে পাথেয় করে মাঘের মিঠে রোদ গায়ে মেখে পৌঁছে গেছিলাম হুগলি-র ঐতিহ্যবাহী জনপদ পাণ্ডুয়ার মাঘ মেলায়।

গোপাল দত্তের কথায় রথযাত্রার সময় কাঠের রথও তৈরি করেন। এর পাশাপাশি কাঠের খেলনা লড়ি, বাড়ি, ড্রেসিং টেবিল ইত্যাদি নানা রকম খেলনা-সামগ্রী তিনি শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে এই প্রতিভার কদর কমে আসছে।

অন্যান্য গ্রামীণ মেলাগুলোর মতোই এই মেলার মধ্যেও শহরকেন্দ্রিক বাজার অর্থনীতির ছাপ সুস্পষ্ট। এর মাঝেই খুঁজে পেলাম বছর ৬২-র গোপাল দত্তকে। প্লাস্টিকের খেলনার ভিড়ে নিজের তৈরি বিভিন্ন উচ্চতার চাকা লাগানো, কাঠের খেলনা জিপ গাড়ি নিয়ে ক্রেতার মুখ চেয়ে বসে আছেন। তাঁর লোকজশৈলীর জিপগাড়িগুলোর শরীরে লাল রঙের নিয়ন্ত্রিত ছোঁয়ায় তা আরো বেশি খেলনা সুলভ হয়ে উঠেছে। নদিয়া জেলার বাদকুল্লার বাসিন্দা গোপাল দত্ত বারোমাসই এই ধরনের খেলনা তৈরি করে থাকেন। বিভিন্ন মেলায় এই খেলনা কাঠের গাড়ি নিয়ে বসেন। পাণ্ডুয়ার মাঘ মেলা ছাড়াও নদিয়া—কল্যাণীর সতী মায়ের মেলায় তাঁর হস্তশিল্পের প্রতীক কাঠের জিপগাড়ি দেখা যায়। 

 

গোপাল দত্তের কথায় রথযাত্রার সময় কাঠের রথও তৈরি করেন। এর পাশাপাশি কাঠের খেলনা লড়ি, বাড়ি, ড্রেসিং টেবিল ইত্যাদি নানা রকম খেলনা-সামগ্রী তিনি শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে এই প্রতিভার কদর কমে আসছে। স্মৃতির অতল হাতড়ে তিনি বলে চলেন, একটা সময় ছিল যখন তাঁর থেকেও ভালো মানের কাঠের খেলনা তৈরি করতেন উত্তর ২৪ পরগনা—পলতার মোহন আচার্য। তাঁর তৈরি কাঠের খেলনা শিশুমনকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করত। গোপাল দত্তের কথা শুনে মনে পড়লো, হুগলির উত্তরপাড়া ভদ্রকালী রামসীতা ঘাটে ঐতিহ্যবাহী দোলের মেলায় নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে আমার শৈশবে দেখেছিলাম কাঠের খেলনা ট্রেন। শৈশবে দেখা সেই কাঠের খেলনা ট্রেন পরে কৈশোর ও যৌবনে আমি আর কোথাও দেখিনি। গোপাল দত্তের মুখে কথাটা শুনে বছর ৭০-এর মোহন আচার্যর সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু হতাশ হই এটা জেনে যে, তিনি কাঠের খেলনা আর তৈরি করেন না।

শ্যামনগরে একটি দোকানের ঠিকানা দিয়ে তিনি বলেন যে সেখানে গেলে হয়তো তাঁর তৈরি দু-একটি খেলনা ভঙ্গুর অবস্থায় এখনো পাওয়া যাবে। তাঁর কথা মতো, সেই দোকানে গিয়ে ভঙ্গুর কাঠের ট্রেন ও একটি দমকলের গাড়ি খুঁজে পাই। পুরোনো হয়েও দমকলের গাড়ির বাস্তবধর্মী নান্দনিকতা আজও মনমুগ্ধকর। দমকলের গাড়িটির মধ্যে ল্যাডার ও তার সঙ্গে দুই দমকল কর্মীর কাঠের অবয়ব শিল্পীর মেধার পরিচয় বহন করে চলে। মলিন ট্রেনের গায়ে আজও হাওড়া-শিয়ালদহ কথাটি অক্ষত।

আগে পাইকারীরা এসে তার থেকে খেলনা নিয়ে যেতেন। চাহিদা এমন পর্যায়ে উঠে গিয়েছিল যে সেই সময় আটজন সহযোগী নিয়োগ করতে হয়েছিল। এখন সে সবই অতীত। প্রায় বছর দশেক আগেই বিক্রি না হওয়া বেশ কিছু কাঠের খেলনা তিনি আস্তাকুড়ে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মোহনবাবুর ভালো নাম শিবনাথ আচার্য। কিন্তু তিনি মোহন নামেই বেশি পরিচিত। বাংলার বঞ্চিত লোকশিল্পীদের তালিকা কোনওদিন তৈরি হলে মোহন আচার্যের নামটা সবার আগে থাকবে। তাঁর কথায়, কাঠের খেলনা তৈরি শুরু করেছিলেন ১৯৬৯ সাল থেকে। বাবা অনিল কুমার আচার্যের কাছে কাঠের খেলনা তৈরির হাতেখড়ি। শহর কলকাতার নাগরিক পরিবহন পরিষেবাই হয়ে উঠেছিল তার কাঠের খেলনা গাড়ির বানানো মূল অনুপ্রেরণা। কলকাতা শহরের বুকে চলা ডবলডেকার বাস, সাদা নীল রঙা বৈদ্যুতিক ট্রেন, স্টিম ইঞ্জিনের ট্রেন, ব্যারাকপুর থেকে ধর্মতলা রুটের এল২০ বাস তার কাঠের খেলনা জগতকে আলো করে থাকতো। তার পাশাপশি নিজের ভাবনাকে বিকশিত করে বিমান, জাহাজ, ঘোড়ার গাড়ি, পালকি, ময়ূরপঙ্খী নৌকো তৈরি করতেন। মোহনবাবুর কথায় নিজের তৈরি চাকা লাগানো জাহাজটির নাম রেখেছিলেন ‘যমুনা’। আর ময়ূরপঙ্খী নৌকোর নাম দিয়েছিলেন ‘মধুকর’। প্রতিটা খেলনায় তিনি অয়েল পেইন্ট করা করতেন। ফর্মা তৈরি করে তার মধ্যে কাঠের প্লাইউড দিয়ে খেলনার রূপ নির্মাণ করা হতো। তাঁর তৈরি প্রতিটি খেলনার নৈপুণ্যতা পাল্লা দিত সেই সময়ের যে কোনো প্লাস্টিকের খেলনাকে। কিন্তু গত প্রায় কুড়ি বছর ধরে কাঠের খেলনা তৈরি একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন শুধুমাত্র ক্যারম বোর্ড এবং রথযাত্রার সময় বাচ্চাদের জন্য রথ তৈরি করেন। তাঁর কথায় আটের দশকের প্রথম দিকে শিয়ালদহের প্রাচী সিনেমার কাছে রথের মেলায় তার তৈরি খেলনা রমরমিয়ে বিক্রি হতো। ২৮ থেকে ৩৫ ডজন খেলনা রথযাত্রার সময় তৈরি হতো। আগে পাইকারীরা এসে তার থেকে খেলনা নিয়ে যেতেন। চাহিদা এমন পর্যায়ে উঠে গিয়েছিল যে সেই সময় আটজন সহযোগী নিয়োগ করতে হয়েছিল। এখন সে সবই অতীত। প্রায় বছর দশেক আগেই বিক্রি না হওয়া বেশ কিছু কাঠের খেলনা তিনি আস্তাকুড়ে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

অনুরূপ একই আক্ষেপ শোনা গেল দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলার নিকটে অবস্থিত শুকদেবপুর গ্রামের কাঠের খেলনা তৈরির শিল্পী শ্রবণ দাস ও তার সহধর্মিনী ভারতী দাসের কণ্ঠে। প্লাস্টিকের বস্তা ভর্তি অবিক্রিত কাঠের ট্রেন, ময়ূরপঙ্খী গাড়ি, জিপগাড়ি সহ অন্যান্য খেলনা একটার পর একটা বের করতে গিয়ে হতাশা মেশানো গলায় শ্রবণ দাস বলেন যে গত পাঁচ বছর ধরে নতুন করে কাঠের খেলনা তৈরির কাজ পুরোপুরি বন্ধ। চাহিদা তলানিতে চলে গিয়েছে অন্যদিকে কাঠের খেলনা তৈরি করার জন্য যে সকল উপাদানের প্রয়োজন হয় যেমন নরম কাঠ, রং এগুলোর দাম বেড়ে গিয়েছে। ফলে গোটা ব্যাপারটাই লোকশানে চলে গিয়েছিল। ১৯৯৫ সালে প্রথম কাঠের খেলনা তৈরির কাজ শুরু করেন শ্রবণ। সহধর্মিনী ভারতী দাসের যোগ্য সহযোগিতায় আগে সারা বছরই কাঠের খেলনা তৈরি করতেন শুকদেবপুরের দাস পরিবার। শিশুদের মনে আনন্দ দিত শ্রবণ দাসের তৈরি চাকা লাগানো বিমান, ঘোড়ার গাড়ি, জাহাজ, পণ্যবাহী ট্রাক সহ দশ রকমের কাঠের তৈরি চাকা লাগানো জন্তুদের সেট। শ্রবণ দাসের কাঠের খেলনায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো তার তৈরি ট্রেন। ট্রেনের মাথায় লোকজ শৈলীতে আলপনা করা। ইঞ্জিনের সঙ্গেই কাঠের তৈরি ট্রেনের কামরা। ইঞ্জিনের মুখটিকে শ্রবণবাবু নিজের ভাবনা অনুসারে নির্মাণ করেছেন। সেটা দেখতে অনেকটা ডিজেল ইঞ্জিনের মতো। একটা সময় এগুলোর মধ্যেই শিশুরা নিজেদের আনন্দকে খুঁজে পেত। স্থানীয় চড়ক, রথ ও পয়লা মাঘের মেলাগুলো আলো করে থাকত শ্রবণ দাসের তৈরি খেলনায়। তাঁর সহধর্মিনী ভারতী দাসের কথায় কোভিড এসে শেষ ধাক্কাটা দিয়ে যায়। সেই সময় তৈরি হওয়া বেশিরভাগ খেলনা অবিক্রিত থেকে যায়। বাধ্য হয়ে সংসার চালানোর জন্য লোকের বাড়ির রান্নার কাজও করতে হয়েছে ভারতী দেবীকে।
 
হতাশার মাঝেও শিল্পের প্রতি গভীর আনুগত্য থেকে যায়। আর তার থেকেই জন্ম নেয় "নেশা"। চাহিদা তলানিতে, শরীরও আর সহায় হয় না। কিন্তু তবুও চড়ক এলেই কাঠের খেলনা তৈরি করেন কলকাতার মানিকতলার বছর ৬৮-র দিলীপ সাধুখাঁ। পিতা মানিকলাল সাধুখাঁর কাছে কাঠের খেলনা তৈরির হাতেখড়ি। খান্না সিনেমার মোড়ের কাছেই তাঁর দোকান। সেখানে বসে স্মৃতি রোমন্থনে ডুব দিলেন তিনি। আজও মহরমে রাজাবাজারে এবং চড়কের  সময় হেদুয়ার ছাতুবাবুর বাজারে নিজের তৈরি কাঠের খেলনা নিয়ে বসেন। কিন্তু আগে যেখানে একটি মরশুমে প্রায় ২০০ মতো কাঠের চাকা লাগানো গাড়ি তৈরি হতো। এখন তা অনেকটাই কমে গিয়েছে। অন্যান্য শিল্পীদের মতো তিনি নিজেও জাহাজ, চাকা লাগানো নৌকো, ঘোড়ার গাড়ি, ট্রেন, ট্রেকার তৈরি করতেন। কিন্তু আগের মতো শরীর আর দেয় না। পাইকারি বিক্রেতাদের আসাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই অমোঘ নেশা নিয়েই ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাঠের খেলনা তৈরি করে যান কলকাতার বুকে দিলীপ সাধুখাঁ।
 
কলকাতার মতোই বাঙালির অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হচ্ছে নবদ্বীপ। আর সেখানেই কাঠের খেলনা নির্মাণকে নান্দনিকতার অনিন্দ্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন সুভাষ দেবনাথ। নবদ্বীপের সরকার পাড়ার ভাটার পাড়ে অ্যাডভেস্টারের অপ্রশস্ত ঘরে বসে রঙিন নকশা করা টোটো, সাইকেল রিকশা, স্কুল ভ্যান গাড়ি, মাছ ধরার ট্রলার সহ শ্রমজীবী নাগরিক জীবনের বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যম নিজের কাঠের তৈরি খেলনার মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। প্রায় ৩৪ বছর ধরে কাঠের খেলনা তৈরি করে চলেছেন। আজও তার তৈরি কাঠের খেলনা বিক্রি হয় গোপীনাথের মেলা, জামালপুরের ধর্মরাজের মেলা, নবদ্বীপ পোড়ামাতলা রথযাত্রার মেলায়। সরকারি হস্তশিল্প মেলায় তিনি ডাক পাননি কখনও। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সুভাষবাবু বলেন একবার মনের ভাবনা দিয়ে কাঠের তৈরি চাকা লাগানো টাইটানিক জাহাজ তৈরি করেছিলেন। নবদ্বীপ ঘুরতে আসা ইউরোপীয় পর্যটকেরা সেই জাহাজ কিনে নিয়ে চলে যায়। রং ছাড়াই সেই জাহাজটি ইউরোপীয় পর্যটকদের চোখে এমন অতুলনীয় লেগেছিল যে তারা তৎক্ষণাৎ সেটি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। আকাশ পথের হেলিকপ্টার ও বিমান থেকে শুরু করে জলপথের জাহাজ ও স্থলপথের চার ধরনের ট্রাক তিনি তৈরি করে থাকেন। সমসাময়িক পরিস্থিতিতে নাগরিক পরিবহনে টোটো জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেটিও খেলনার মাধ্যমে তিনি প্রস্ফুটিত করেছেন। তার প্রতিটি খেলনার পটভূমি রঙ বা ব্যাকগ্রাউন্ড কালার হচ্ছে নীল। তার ওপরেই তুলির টানে বিভিন্ন নকশা করেন তিনি। সম্প্রতি বাইক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার দরুন আগের মতো আর কাজ করতে পারেন না। তবুও মনের জোরে এই শিল্পধারাকে নবদ্বীপের বুকে টিকিয়ে রেখেছেন তিনি।
 
কাঠের খেলনা তৈরির জন্য আগামীর প্রজন্মের এগিয়ে আসাটা একান্ত জরুরি। বাঁকুড়ার সোনামুখীর রতন গঞ্জের ধর্মেন্দ্র সূত্রধর নিজের স্বর্গত পিতা, নিমাই সূত্রধরের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আক্ষেপের সুরে বলেন, যে তাঁর বাবা যখন জীবিত ছিলেন তখন চাকা লাগানোর ডানাওয়ালা ঘোড়া থেকে শুরু করে ট্রাক, নাগরদোলা, হেলিকপ্টার সবই তৈরি হতো। খেলনা তৈরিতে ব্যবহার করা হতো আম, চাকলদা কাঠ। কিন্তু আজ সে সব অতীত। চাহিদা কম থাকায় এবং কাঠের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নতুন প্রজন্ম কাঠের খেলনা তৈরি শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যদিও তিনি নিজে রথের মেলার সময় কয়েকটি কাঠের খেলনা আজও তৈরি করে থাকেন। বেশিরভাগ সূত্রধর পরিবারগুলি কাঠ ছেড়ে কাঠামোর মাটির প্রতিমা তৈরিতে বেশি মনোনিবেশ করেছে। সোনামুখীর কুম্ভকার পাড়ার মৃৎশিল্পী সুকুমার খায়ের জানিয়েছেন, বর্তমানে সোনামুখীতে সত্যপীরতলা, বুড়োশিবতলা, দেওয়ানবাজার, রতনগঞ্জে কাঠের খেলনা তৈরির ঐতিহ্য ক্ষীণধারায় বহমান।

অন্যদিকে, বাঁকুড়ার বিকনার সেন্টু সূত্রধরের মতে আগামী দিনে কাঠের খেলনা তৈরি ঐতিহ্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে। এর বড়ো কারণ হচ্ছে চাহিদার অভাব। সেন্টু সূত্রধর নিজেও ইন্টেরিয়র ডেকোরেটরের কাজ করেন। তার মতে একটা সময় ছিল চৈত্র-বৈশাখ মাসে ঘরে ঘরে কাঠের খেলনা গাড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়ে যেত। অশ্বথ, পলাশ, বট, হারু কাঠ ব্যবহার করা হতো কাঠের খেলনা তৈরির জন্যে। তাঁদের তৈরি কাঠের খেলনা চওড়ায় হতো চার ইঞ্চি আর প্রস্থে বারো ইঞ্চি। বর্তমানে এক্তেশ্বর ধামের গাজনের মেলা, জুনবেদিয়া হোরাপুর ও তিলাবেদিয়ার স্থানীয় মেলায় কাঠের খেলনা দেখতে পাওয়া যায়।
 
পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা মায়তার মৃণাল দে দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে স্থানীয় মেলার জন্য কাঠের খেলনা তৈরি করে থাকেন। মূলত শিমুল, আমড়া কাঠ দিয়ে এই সকল খেলনা তৈরি হয়ে থাকে। খেলনাগুলোর গায়ে অনিন্দ্য সুন্দর ফুল, লতাপাতা অঙ্কিত হয়। পটভূমির রং গোলাপী। তার ওপরেই এই অনিন্দ্য সুন্দর লোকজ আঙ্গিক শিল্পীরা ফুটিয়ে তোলে। পালকি, বাস, লরি, জিপ, ট্রেকার, ট্রাক্টর, ফিরফির গাড়ি মধ্যে এই সরলতা মাখা তুলির টান শিশুমনকে আকৃষ্ট করে যায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের পাশাপাশি বাঁকুড়াতেও একই শৈলীর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

এত কিছুর পরেও বাঙালির এই একান্ত আপন স্মৃতির প্রতি তাচ্ছিল্য খেলা করে যায়। আর সেই তাচ্ছিল্যের জন্যই হয়তো প্রতিবছর উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের রাসের মেলায় নিজের তৈরি কাঠের চাকা লাগানো খেলনা নিয়ে অনাহুতের বসে থাকেন সুদীপ দাস। তার তৈরি ঘোড়ায় টানা ময়ূরপঙ্খী রথ যতই নান্দনিক হোক না কেন আধুনিকতার পরাকাষ্ঠায় সে যেন ক্রমাগত পিছিয়ে চলেছে। একই অবস্থা হাওড়া জেলার সিংটির মথুর পাঁজা। তার ছয় চাকার ট্রাক ও বড়ো ট্রেকার বঞ্চিত হয়ে পড়ে থাকে। সে যেন ক্রমাগত স্মৃতি হয়ে যাওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এই এগিয়ে চলতে গিয়ে সে একদিন হারিয়ে যাবে। আর তখনই বাঙালি স্মৃতির খাতায় আরো একটি শিল্প সম্ভার সংযোজিত হবে। এই শিল্প সম্ভার যাতে স্মৃতি হয়ে না যায় তার জন্য সমাজের সদর্থক এগিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। সর্বভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাঙালির কাঠের খেলনার বিপণন একান্তভাবে প্রয়োজন। সেটি না হলে তা স্মৃতির মলিনতায় পরিণত হয়ে যাবে কাঠের খেলনাগুলো।

Developed by DXDasia