বাংলার প্রাচীনতম লোকপ্রযুক্তির অন্যতম জাঁতা, তালঘষার মইয়ের ইতিহাসও প্রাচীন
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি বলতে কী বুঝছি? বুঝছি, সেইসমস্ত আটপৌরে যন্ত্রের বা প্রযুক্তির ব্যবহার যা সাবেক বাংলা থেকে এখনো অবধি চলে আসছে। আর সেইসব প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন মূলত বাংলার মায়েরা তথা গৃহিণীরাই। এইসব প্রযুক্তি বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-চর্যার শিকড়ে মিশে আছে ঘন হয়ে। আজ থাকল জাঁতা ও তালঘষার মইয়ের কথা।
বাংলার জাঁতা
‘আজ্ঞা পেয়ে কামার করাতে কাটে গিয়া।
তিন জাতি পরিসর উভে পাঁচ পোয়া।।
যাঁতাটাতে মণ্ডল ভাগিনা সহচরি।
অঙ্গারে আগুন জলে দপ দপ করি।।’
‘চন্ডীমঙ্গলে’ এভাবেই এসেছে জাঁতার প্রসঙ্গ। বাংলার লোকপ্রযুক্তির একটি অন্যতম উদাহরণ হল জাঁতা। সিন্ধুসভ্যতা থেকে জাঁতার ব্যবহার চলে আসছে। জাঁতাকে বলা যায় লোকশিল্প ও প্রযুক্তির সমাহার। অভিধান বলছে- ‘চাকার মতো গোলাকৃতি পাথরের পেষণযন্ত্র’। বাংলার প্রাচীনতম প্রযুক্তির নির্দশন হয়তো এটিই। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, বাংলায় পাথর দিয়ে তৈরি যন্ত্রপাতি, শিল্পের ইতিহাস নেই। চন্ডীমঙ্গলের এই পঙ্ক্তি কিন্তু অন্য কথা বলে- ‘ইন্দ্রনীল পাষাণে রচিত কৈল পোতা’।
কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের ‘চন্ডীমঙ্গল’ কাব্যে ‘ইন্দ্রনীল’ বলে একরকম পাথরের উল্লেখ রয়েছে। আশুতোষ ভট্টাচার্য মুকুন্দরাম রচিত চন্ডীমঙ্গলের রচনাকাল উল্লেখ করছেন ১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দ। তাই যদি হয়, তাহলে বাংলায় জাঁতা ব্যবহারের ইতিহাস প্রায় ২০৯২ বছরের প্রাচীন।
বাংলায় উৎপাদিত নানা ডালজাতীয় খাদ্যশস্যাদি, যেমন- মুসরডাল ,মুগ, গম, কলাই, ছোলা, তিল ইত্যাদির খোলা ছাড়ানো বা ভাঙার জন্য ব্যবহৃত হয় এই জাঁতা। বাংলার দশবিধ সংস্কারেও জাঁতার উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে বিবাহ অনুষ্ঠানে। জাঁতার দুটি পাটি থাকে। দুটি পাটির মাঝে গোলাকার দুটি গর্ত। গর্তের মধ্যে একটা কাঠি দেওয়া হয় জুড়ে থাকার জন্য। দুটি পাটির মাঝে একটি লোহার খাড়ু রাখা থাকে। ডাল জাতীয় শস্যাদি যাতে বেশি গুড়িয়ে না যায় এবং দ্রুত লয়ে ঘুরতে পারে, তার জন্যই এই ব্যবস্থা। উপরের একটি পাটির উপর ইংরাজি D অক্ষরের মতো গর্ত থাকে। তার মধ্যে দিয়ে শস্য ঢেলে দেওয়া হয়। উপরের পাটির একদম প্রান্তভাগে একটি ছোট্ট গর্ত করা হয় লাঠি দিয়ে ঘোরানোর প্রয়োজনে। চালানোর সময় ঘর্ ঘর্ ঘর্ ঘর্ আওয়াজ হয়। আমার দিদিমার কাছে শুনেছিলাম, জাঁতা চালানোর সময় গানও করা হত। এখন অবশ্য সেই রেওয়াজ আর নেই।
আমাদের এদেশীয় বিয়েতে ‘আটপুকুর কাটা’ বলে একটি অনুষ্ঠান রয়েছে। একটি গর্ত করে তার উপর কলাপাতা, কলাপাতার উপর জাঁতা বসানো থাকে। একেই বলে আটপুকুর। ছেলের ও মেয়ে উভয়েরই বাড়িতে এই অনুষ্ঠান হয়। ছেলের বাড়িতে বিয়ের দিন দুপুর বেলায় অনুষ্ঠিত হয় আটপুকুর। গর্তটা কাটে খুড়তুতো, মাসতুতো, জেঠতুতো জামাই। জামাই যখন গর্ত কাটে তখন তার গায়ে হলুদ, ফ্যান ও আলতা মাখানো হয়। বৌদি বা শালিরা সেইসব মাখিয়ে আনন্দ করে। মেয়ের বাড়িতে আটপুকুরের পাশে বাঁশের বেড়া শুইয়ে দেওয়া হয়। তারপর বরণ করা হয়। বরণ করার পর চারকোণে চারটে ছোটো ছোটো সরার মধ্যে হলুদ, খই, কড়ি, কলা, পয়সা। চারকোণে চারটে ছোটো আর সামনে একটা বড়ো সরা। শেষে সব একত্র করে বড়ো সরার তলায় রেখে পায়ের গোড়ালি দিয়ে ভেঙে ঘরে চলে যেতে হবে। ঐ সরা ভেঙেই আটপুকুরের কাজ সম্পন্ন হয়।
বিয়ের সময় জাঁতা-তে আলপনা দেওয়ার রীতি রয়েছে। পৌষপার্বণের সময় বাউনিও বাঁধা হয়। সন্ধের সময় ছেলেকে জাঁতার উপর, মেয়েকে বেড়ার উপর দাঁড় করিয়ে বরণ করা হয়। কাজেই বাঙালির সংস্কারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে এই জাঁতা। পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায়, পশ্চিম মেদিনীপুরে, বাঁকুড়া জেলায় এখনো জায়গায় জাঁতার সন্ধান মেলে।
আরো পড়ুন
বাংলার আসনের অন্দরের কথা ১
তালঘষার মই
‘জষ্ঠি মাসে আম কাঁঠাল
আষাঢ় মাসে ইলিশ।
ভাদ্দর মাসে তালের তত্ত্ব
পুজোয় কুটুম পালিশ।।’
(সিধু ঘটকের ছড়া: থোড় বড়ি খাড়া, কল্যাণী দত্ত)
তালনবমী ব্রতের কথা মনে পড়ে? কিংবা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘তালনবমী’ গল্পটির কথা? বাঙালির ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তালের জুরি নেই। বিশেষ করে তালনবমী ব্রত, ঝুলন, চাপেটি ষষ্ঠী ও জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানে তালের পিঠা বা ফুলুড়ি নিবেদন করা হয়। ফুলুরি মানে তাল ও ডাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার। নীহারঞ্জন রায় উল্লেখ করছেন প্রাচীন বাংলায়- ‘ফলের মধ্যে কলা, তাল, আম, কাঁঠাল, নারিকেল ও ইক্ষুর উল্লেখ পাইতেছি বারবার।’
তালের ফুলুরি বা পিঠা করতে গেলে লাগে তাল। আর তাল ঘষার জন্য গ্ৰামের মহিলারা ব্যবহার করেন ‘তাল-চাঁচুনি’ বা ‘তালঘষার মই’ নামের যন্ত্রটি। ভাবলে অবাক হতে হয় যে এই যন্ত্রটির উদ্ভাবক একজন গ্রাম্য মহিলা। ভাদ্রমাসে বাঙালি রসুই ঘরে তাল অবশ্যই থাকবে। এই প্রসঙ্গে কল্যাণী দত্ত বলছেন- ‘ভাদ্র মাসে তালের বড়া, লুচি, পিঠে, ফুলুড়ি, তালক্ষীর আর বেয়াই বেয়ান লেখি দুটো কালো হেঁড়েল তাল।’ ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে বাংলার সধবা মহিলারা ‘তালনবমী ব্রত’ পালন করেন। নৈবেদ্য হিসাবে অন্যান্য ফলমূলের সঙ্গে তালের বানানো লুচি, পিঠে, ফুলুড়ি ইত্যাদিও নিবেদন করা হয়।
খুবই সহজ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় ‘তাল-চাঁচুনি’ বা ‘তালঘষার মই’ নামের যন্ত্রটি। ত্রিভূজাকৃতি এই যন্ত্রের দুটি বাহু ২ ×২ ইঞ্চি পুরু, লম্বায় ৩০ ইঞ্চি থেকে ৪৫ ইঞ্চি মাপের। ঐ দুটি কাঠের বাহুকে একটি দিকে পেরেক দিয়ে জুড়ে নিতে হবে। দেখতে হবে তিনকোণা মানে ইংরাজী V আকৃতির মতো। যন্ত্রের মাথার দিকে শক্ত লোহার পাত ব্যবহার করা হয়। V আকৃতির মাঝের জায়গাগুলিতে লোহার বা অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি সামান্য মোটা ৮ থেকে ১০ টা পাত অর্ধচন্দ্রাকৃতি করে ১ ইঞ্চি বরাবর জোড়া থাকে। শেষে একটু শক্ত রড দেওয়া থাকে টানা দেওয়ার জন্য। এবার তাল চাঁচার পালা। যন্ত্রটি নিয়ে গামলার উপর রেখে তাল চাঁচা হয়। তারপর শুরু হয় হেঁশেলে তালের বড়া বানানোর ধুম।
তথ্যঋণ: চন্ডীমঙ্গল, কবিকঙ্কণ মুকুন্দ বিরচিত, সুকুমার সেন সম্পাদিত; বাঙ্গালীর ইতিহাস, নীহাররঞ্জন রায়; হিন্দুদের আচার-অনুষ্ঠান, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী; সতেরো শতকের রাঢ়-বাংলার সমাজ ও সাহিত্য, অণিমা মুখোপাধ্যায়; থোড় বড়ি খাড়া, কল্যাণী দত্ত।
জাঁতা চালাচ্ছেন: তুলসী দাস।
জাঁতা চালানোর পদ্ধতি সংগ্ৰহ: উমা দাস।
জাঁতার ছবি সৌজন্যে: রাহুল দাস।
তালঘষার মই-এর ছবি: লেখকের সংগৃহীত।