
মধ্যযুগ থেকে বাংলার সঙ্গে জড়িয়ে নকশাকাটা এই সমস্ত ছাঁচ
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি বলতে কী বুঝছি? বুঝছি, সেইসমস্ত আটপৌরে যন্ত্রের বা প্রযুক্তির ব্যবহার যা সাবেক বাংলা থেকে এখনো অবধি চলে আসছে। আর সেইসব প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন মূলত বাংলার মায়েরা তথা গৃহিণীরাই। এইসব প্রযুক্তি বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-চর্যার শিকড়ে মিশে আছে ঘন হয়ে। আজ থাকল সন্দেশ, আমসত্ত্ব কিংবা পিঠেপুলির ছাঁচের কথা।
“ধন্য ছিল বাঙালি যখন সে বাজারের মেঠাই খাইত না, যখন সে শিল্পনৈপুণ্যের পরাকাষ্ঠা দেখিবার জন্য দোকানে দোকানে ঘুরিত না।”—লিখেছিলেন ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সেন। কথাগুলি পড়ে আশ্চর্য হতে হয়। তার মানে, বাঙালি-বাড়িতে একসময় কী পরিমাণ সন্দশ তৈরি হত। নইলে এমন কথা লেখা যায়! ছানায় চিনি মিশিয়ে তৈরি মিষ্টি। অবশ্য, অতীতে গুড় দিয়েও সন্দেশ তৈরি হত, এখনো হয়। বাঙালির জীবনে সন্দেশ জড়িয়ে আছে খুব সম্ভবত মধ্যযুগ থেকে। তার প্রমাণ কৃত্তিবাসী রামায়ণ। সন্দেশ জড়িয়ে ছিল বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ ও নানা উৎসবে। এককালে এই সন্দেশ তৈরি হত ঘরে ঘরে, মহিলাদের হাতে। কিন্তু তারপর গেল কোথায় সেই মায়েদের বানানো সন্দেশ?
আসলে অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছি যে। দীনেশচন্দ্র সেন এই বিষয়ে আবারও উল্লেখ করছেন, “মেয়েরা চরকা ছাড়িত না, তাহাদের সমস্ত শিল্পনৈপুণ্য দিয়া যে সন্দেশ তৈরি করিত, তাহাতে ফুল ও ফলের সমস্ত শোভা প্রর্দশিত হইত, তাহাদের সেলাই করা একখানি কাঁথা পারস্যের কার্পেটের মত হইত।… মেঠাইয়ের যে কত ছাঁচ ঘরে ঘরে ছিল, তাহা যাদুকরের মন্ত্রের ন্যায় কে কি বলিয়া উড়াইয়া দিল! সন্দেশের কয়েকখানি প্রাচীন ছাঁচের নমুনা আমরা এখানে দিতেছি। এগুলি খুব ভালো নমুনা নহে, প্রাচীন পল্লীতে ঘুরিলে ইহা হইতে অনেক উৎকৃষ্ট ছাঁচ পাওয়া যাইতে পারে।”
আরো পড়ুন
বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশের বোনা কুলো
ছাঁচ অবশ্য শুধু সন্দেশ তৈরির কাজেই ব্যবহৃত হত না, হত পিঠেপুলি বা আমসত্ত্ব তৈরির জন্যও। সেইসব ছাঁচ নিয়ে খানিক আলোচনা করা যাক।

ছাঁচের মাধ্যম: প্রথম দিকে এঁটেলমাটি দিয়ে তৈরি হত ছাঁচ। মাটি দিয়ে বানিয়ে রোদে শুকিয়ে পুড়িয়ে নেওয়া হত। পোড়ামাটির মতো লাল রঙের দেখতে হত ছাঁচ। এর মধ্যে একধরনের রঞ্জকের (বনক) মতো স্থায়ী কালো রং করে পোড়ানো হত। ঐ রঞ্জকটি পিচ্ছিল আর স্থায়ী হয়ে উঠত। এই প্রলেপ দেওয়া হত দ্রুততার সঙ্গে, যাতে অনেক সন্দেশের নকশা করা যায়। পরবর্তীকালে, নরম পাথর ও কাঠ দিয়ে ছাঁচ তৈরি হল। বলা যায়, ছাঁচের স্থায়ীকরণ ঘটল।
আরো পড়ুন
বাংলার আসনশিল্পের অন্দর কথা ২
ছাঁচের মোটিফ: সন্দেশের ছাঁচ দু’ধরনের হয়। ১. ফিগারেটিফ ২. জ্যামিতিক। ফিগারেটিফের মধ্যে শঙ্খ, পদ্মকুড়ি, মাছ, ময়ূর, পাখি ইত্যাদি। জ্যামিতিক নকশার মধ্যে চৌকো, অর্ধবৃত্তাকার, ত্রিভূজ, গোলাকার, আয়তকার ইত্যাদি। এ সমস্ত আকারের ছাঁচের মধ্যে ব্যবহৃত হয় ছন্দোবহুল লতা, জলের ফোটার মতো গর্ত, গোলাকার গর্ত, লম্বা সরু খোদাই করা রেখা ইত্যাদি নকশা। আমসত্ত্বের ছাঁচ গোলাকার বেশি হত। এছাড়া তিনকোনা, ডিম্বাকার ইত্যাদি আকারেরও হত। গোলাকার ছাঁচের মধ্যিখানে পানপদ্ম বা অষ্টাদল পদ্ম। তার পাশে শঙ্খলতা, কলালতা, দোপাটিলতা, শুশুনিলতার গোলাকার নকশা থাকত। এর পাশে মানুষ, হাঁস, ঘোড়া, হাতি, কুকুর, ময়ূর, পাখি ইত্যাদি গোলাকারভাবে খোদাই করা হত। এছাড়া, আলাদা আলাদা গন্ধময়ূর, হাতি, ঘোড়ার নকশা হত ত্রিকোনাকৃতি বা গোলাকার ছোটো ছাঁচগুলিতে। পিঠেপুলিতেও এই ধরনের ছাঁচ ব্যবহৃত হত। চন্দ্রপুলির ছাঁচ এ’বিষয়ে উল্লেখযোগ্য সাক্ষ্য বহন করে। এই সমস্ত নকশাগুলিতে আলপনা, কাঁথা, আসন বা চাঁদোয়ার নকশার অনুষঙ্গ রয়েছে।
ছাঁচ তৈরির প্রক্রিয়াকরণ ও শিল্পী: দুপুরের অলস সময়ে বাড়ির মহিলারা এই ছাঁচ তৈরি করতেন। পরবর্তীতে ছাঁচ নকল করা হতে শুরু হল। ময়রা বা মোদকদের কাছে পরিচিতি পেতেও শুরু করল ছাঁচ। বাজারে ঐ সমস্ত নকশা ছাঁচ নিয়ে এলেন ময়রা-রা। তারাও এগুলি সূত্রধর, ভাস্কর ও কুমোরদের দিয়ে তৈরি করাতে লাগলেন। অনুরূপভাবে, আমসত্ত্ব বাণিজ্যিকভাবে সফল হলেও আমসত্ত্বের ছাঁচ বাড়ির মহিলাদের হেঁশেলেই থেকে গেল। শিল্পীরা নরম কাঠ সংগ্ৰহ করে নরুন বা চিজেল, মোটা ও সরু সূচ দিয়ে বাটালির মাধ্যমে নকশা খোদাই করতেন। নকলাগুলি কিন্তু উলটো পদ্ধতিতে খোদাই করা হত।
বর্তমানে সন্দেশের ছাঁচ মিষ্টির দোকানেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। বাংলার গৃহস্থ বাড়িতে ছাঁচ আর দেখা যায় না। এককালে নারীদের অন্যতম প্রযুক্তির সাক্ষ্য ছিল এই সমস্ত ছাঁচ। আমসত্ত্বের ছাঁচ অবশ্য কিছু বাড়িতে রয়ে গেছে। যা ছিল একসময় বাড়ির অঙ্গন সংস্কৃতি তথা প্রযুক্তি, তা বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে। পিঠেপুলির ছাঁচ অবশ্য বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করতে পারেনি। বর্তমানে মেলা উৎসবে এই সমস্ত নকশাপিঠের স্টল দেখা যাচ্ছে।
__________________
তথ্যঋণ: বৃহৎ বঙ্গ, দীনেশচন্দ্র সেন, দেজ,
ভিতরের ছবিটি উক্ত গ্ৰন্থ থেকে নেওয়া, প্রচ্ছদের ছবিটি লেখকের সংগ্রহ থেকে।
