
পিঠের স্বাদ যেন চিরন্তন
বাঙালির শীতকালের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে পিঠেপুলির নাম। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা পিঠেপুলির জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। মূল উপাদান বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রায় এক থাকলেও, প্রস্তুতের নানান ধরন ও তারতম্যের জন্য জন্ম নিয়েছে পুলিপিঠে, দুধপুলি, ভাজাপুলি, ভাপাপিঠে, চিতৈপিঠে, ক্ষীরপুলি ইত্যাদি। পিঠের অনন্য স্বাদ তাকে বাংলার অন্য সব মিষ্টির থেকে আলাদা করে তোলে। আগেকার দিনে শীতকালে পিঠে তৈরি যেন নিয়মই হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাংলার ঘরে ঘরে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পিঠে তৈরির শিল্প হারিয়ে গিয়েছে অনেকখানি। বাড়িতে পিঠে তৈরি করবার মতো সময় প্রায় কারুর হাতেই নেই। আজকাল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিঠে তৈরি হয় মিষ্টির দোকানে। বাড়িতে পিঠে তৈরির পদ্ধতি চাক্ষুষ করবার সুযোগ আর ঘটে না বর্তমান প্রজন্মের। নতুন প্রজন্মের কয়েকজনকে আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, পিঠে তৈরির সঙ্গে তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জড়িয়ে রয়েছে কিনা। তাঁদেরই কিছু উত্তর তুলে ধরা হল এখানে।
মূল উপাদান বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রায় এক থাকলেও, প্রস্তুতের নানান ধরন ও তারতম্যের জন্য জন্ম নিয়েছে পুলিপিঠে, দুধপুলি, ভাজাপুলি, ভাপাপিঠে, চিতৈপিঠে, ক্ষীরপুলি ইত্যাদি।

সৌভিক দাস (হেরিটেজ ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি, বয়স – ২১, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পাঠরত) : আমাদের বাড়িতে সকলেই পিঠে খেতে ভীষণ ভালোবাসে। ঠাকুমা অসাধারণ পিঠে তৈরি করেন। ওঁর অনুপ্রেরণায় আমি নিজেও পিঠে তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। সত্যি বলতে তা যথেষ্ট সুস্বাদু হয়েছিল। বাড়িতে যখন পিঠে তৈরি হয়, বাড়ির সকলেই কোনো না কোনো ভাবে তাতে হাত লাগায়। বলা ভালো, এই উপলক্ষ্যে আমরা একসঙ্গে সময় কাটাবার খানিক অবসর পেয়ে যাই। আমার ব্যক্তিগত পছন্দ হল পুলিপিঠে। ঠাকুমা পুলিপিঠে বানাতেন, বানাতেন দুধপুলি, ভাজাপুলি। এসবের বেশিরভাগই তৈরি হল চালের গুঁড়ি আর গুড় দিয়ে। এখন অবশ্য বয়সের কারণে ঠাকুমা সেভাবে বানিয়ে উঠতে পারেন না।
আরও পড়ুন: শনিবারের কড়চা ২১ – বাংলার ‘পৌষ পার্বণ’

আদিত্য ব্যানার্জি (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পাঠরত, বয়স – ২১) : নারকেল বা ক্ষীরের পুড় দেওয়া পিঠে খেতে আমি, বাবা, মা সকলেই ভালোবাসি। কখনও আবার গুড়ে ডুবিয়ে সাধারণ সেদ্ধ পিঠে খেতেও ভীষণ ভালো লাগে। সারাদিনের ক্লান্তির পর বাড়ি ফিরে ‘পিঠে পেটপুজো’র সুযোগ পেলে যেন হৃদয় জুড়িয়ে যায়। যদিও সময়ের অভাবে বাড়িতে সেভাবে পিঠে তৈরি হয় না আগের মতো। আমরা মিষ্টির দোকান থেকেই পিঠে আনিয়ে নিই। আমার মনে হয়, অন্যান্যদের কাছে পিঠেকে স্রেফ মিষ্টি মনে হলেও, বাঙালির কাছে আজও এ এক আবেগের নাম।

পীযূষ পাঠক (স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) : আমি বাংলায় বেড়ে ওঠা এক মারাঠি। জন্ম থেকেই বাংলার খাবারের প্রতি এক অদম্য টান অনুভব করি। প্রথমবার এক ‘পিঠে উৎসব’-এ পিঠেপুলি খাওয়ার সুযোগ হয় আমার। আর প্রথম কামড়েই তা মন জয় করে নেয়। প্রায়ই শীতকালে মিষ্টির দোকান থেকে পিঠে কিনে আনি আমি। এমনকি বাড়ির সবাইকে পিঠে খেতে উৎসাহিত করি। যদিও আমার মা ছাড়া অন্যরা খুব একটা পছন্দ করে না। তবে বন্ধুদের সঙ্গে শীতকালে বাইরে গেলে, প্রতিবারই পিঠে খাওয়ার সুযোগ হয়ে যায় আমার।
বাড়িতে পিঠে তৈরি করবার মতো সময় প্রায় কারুর হাতেই নেই। আজকাল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিঠে তৈরি হয় মিষ্টির দোকানে। বাড়িতে পিঠে তৈরির পদ্ধতি চাক্ষুষ করবার সুযোগ আর ঘটে না বর্তমান প্রজন্মের।

রিনি সরকার (স্নাতকোত্তর ছাত্রী) : উৎসব অনুষ্ঠানে পিঠে তৈরি হয় বাড়িতে। আমার বাবা-মা দুজনেই চাকুরিরত হওয়ায় বাড়িতে পিঠে তৈরির সময় তেমন ভাবে কেউই পান না। তবুও শীতকাল এলে প্রতি রবিবারই পিঠে বানানোর চেষ্টা করি আমরা। আমার সবথেকে ভালো লাগে পুলিপিঠে। চালগুঁড়ি, ক্ষীর, দুধ, নারকেল কুঁচি আর গুড় এ সময় আনাই থাকে বাড়িতে। আমি নিজেও পিঠে তৈরিতে হাত লাগাই মাঝে সাঝে। অনেক সময় বেশি করে বানিয়ে, বন্ধুদের জন্য পিঠে নিয়ে যাই আমি।

সুরঞ্জনা মিত্র (স্নাতকোত্তর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) : আমার ছোটো পিসি রান্না করতে ভীষণ ভালোবাসেন। তাঁকে ‘ফুডি’ই বলা চলে। প্রত্যেক শীতে অসাধারণ স্বাদের পিঠে তৈরি করেন তিনি। পুলিপিঠে হোক, দুধপুলি কিংবা সেদ্ধ পিঠে, প্রত্যেকটিই অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তৈরি করেন। আমি আর বড়ো পিসিও হাত লাগাই মাঝে মাঝে। পিঠে তৈরির এই ঐতিহ্যকে ছোটো পিসিই ধরে রেখেছে আমাদের বাড়িতে। হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের শখকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে পিসি। নকশি পিঠে কিংবা আশকেপিঠের মতো বহু ঐতিহ্যবাহী পিঠে হারিয়ে আমরা ফেলেছি। আমাদের উচিত দায়িত্ব নিয়ে সেসব পুনরুজ্জীবিত করে তোলা।
বাড়িতে তৈরি হোক বা না হোক, বাংলার আত্মার সঙ্গে পিঠে শিল্প জড়িয়ে রয়েছে অঙ্গাঙ্গীভাবে। এমনকি অবাঙালিদের মধ্যেও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করছে ক্রমশ।
