বিদেশি খেজুরের বাজার চাহিদায় অবহেলা করবেন না পুষ্টিকর দেশি খেজুর

এখন দেশি খেজুরের মরশুম

দেশি খেজুর। ছবিঃ প্রসেনজিৎ দাঁ

যাঁদের জন্ম এই বাংলার কোনও না কোনও গ্রাম-মফসসলে, কখনও না কখনও গাছ থেকে খেজুর পেড়ে না হয় কুড়িয়ে খেয়েছেনই। তবে, বাজারে দেখা পাওয়া যায় না সেইসব ‘দেশি’ খেজুরের। বাজারে শুধুই নানা স্বাদের ও দামের (বেশিরভাগই সাধারণের নাগালের বাইরে) বিদেশি খেজুরের ছড়াছড়ি। তবে, বিদেশি খেজুরের বাজার চাহিদায় অবহেলা করবেন না বাংলার নিজস্ব পুষ্টিকর খেজুর। অন্যান্য মরশুমি ফলের মতোই এর বিশেষ বিশেষ খাদ্যগুণ আছে।

গ্রামের কোনও কোনও হাট-বাজারে দেখা পাওয়া গেলেও শহরের বাজারে এই দেশি খেজুর তেমন ভাবে চোখেই পড়ে না। তবে, ইদানিং বিভিন্ন মরশুমি ফলের সঙ্গে কলকাতার বাজারে দেখা মিলছে এই ফলটিরও। তাও খুবই অল্প সময়ের জন্য। রাসবিহারী কালীঘাট মেট্রো স্টেশনের বাইরে এক ফল ব্যাবসায়ী এবছর দেশি খেজুর রেখেছিলেন তাঁর দোকানে। “এই সিজনে আমাদের কাছে স্টক এলে আমরা রাখি। তবু ভালো যা রাখি সেটুকু বিক্রি হয়ে যায়, এ ছাড়া দেশি খেজুরের কোনও চাহিদা নেই বাজারে।” বলেন ফল-ব্যবসায়ী শম্ভু দাস।

স্বাধীনতার পরেও ফলটি পাওয়া যেত দেশের বহু হাটবাজারে। সৌদিসহ আরবের খেজুর আসার পর থেকে দেশি এই ফলটি বেহাল দশায় পড়ে। দেশি খেজুরকে কেউ কেউ বুনো বা জংলি খেজুর নামে ডাকেন। এর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ওয়াইল্ড ডেট পাম (Wild Date Palm)। দেশি খেজুর এ দেশেই উৎপত্তি, এ দেশেই বিস্তার। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের সিলভেসট্রিস ল্যাটিন শব্দের অর্থই হলো জংলি। এ দেশের বন জঙ্গলেই গাছটি প্রধানত জন্মে থাকে। সাধারণত পতিত অনুর্বর জমিতে, বাঁধের ধারে, পুকুর পাড়ে, জমির আইলে, বাড়ি ও বাগানের চারদিকে, পথের দুই পাশে সারি করে খেজুর গাছ লাগানো হয়। তবে তা ফলের জন্য নয়, রসের জন্য। গাছের মিষ্টি রস জ্বাল দিয়ে তা থেকে গুড়পাটালি তৈরি করা হয়। এ দেশে খেজুরকে গুড় উৎপাদনকারী ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শীতের দিনে নলেন গুড়ের স্বাদ সবার কাছেই লোভনীয়। খেজুর যেহেতু অন্যান্য ফসলের মতো ব্যাপকভাবে চাষ করা হয় না, বসতবাড়ি, মাঠ, রাস্তার ধারে জন্মে। তাই ঠিক কতটুকু জমিতে খেজুরের আবাদ হচ্ছে তার হিসাব কষা মুশকিল। বিবিএস এর ২০১৮ সালের হিসেবে এ দেশে মোট খেজুর রসের উৎপাদন ১৬৯০৫৬ টন। মোট ৫১৩২ একর জমির খেজুর গাছ থেকে তা আহরিত হয়েছিল। আর দেশি খেজুরের উৎপাদন ৩৮৯৩৯ টন। 

খেজুর গাছ অ্যারিকেসি পরিবারের ফিনিক্স গণভুক্ত। ফিনিক্সগণের ১৪টি প্রজাতির গাছ পৃথিবীতে রয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রজাতির ফসল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ফিনিক্স সেইলভিসট্রিস ও রোক্সব। রোক্সব প্রজাতি দেশি বা জংলি খেজুর ও ফনিক্স ডেকটাইলিফেরিয়া এল এল প্রজাতির গাছ আরবি খেজুর বা সৌদি খেজুর নামে পরিচিতি। প্রথমোক্ত প্রজাতির গাছ রস ও দ্বিতীয় প্রজাতির গাছ থেকে সুমিষ্ট ফল পাওয়া যায়। খেজুর গাছ একবীজপত্রী, এক লিঙ্গ বিশিষ্ট বৃক্ষ। অর্থাৎ পুরুষ ও মেয়ে গাছ আলাদা। মেয়ে গাছে ফল ধরে। শাখাহীন গাছ লম্বা হয় প্রায় ৪-১৫ মিটার। গাছের বাকল সদৃশ আবরণে পত্রবৃন্তের দাগ সব কান্ডকে জড়িয়ে থাকে। দেশি খেজুর গাছ বেশ দ্রুতবর্ধনশীল, শাখাবিহীন একটি কান্ড বিশিষ্ট গাছ। দেশি খেজুর গাছের গোড়াটা থাকে মোটা ও স্তুপের মতো শিকড় থাকে। কান্ডে পাতা ঝরে যাওয়ার পরও পত্রখোলের ভিত্তি অংশ কান্ডের সঙ্গে লেগে থাকে যা খেজুর গাছকে বাড়তি সৌন্দর্য দান করে। পাতা পক্ষল, দন্ডের দুই দিকেই হয়, অগ্রভাগ সুচাল, গোড়ায় তীক্ষ শক্ত কাঁটা। গাছের মাথায় পত্রগুচ্ছ নারিকেল-সুপারি গাছের মতো জন্মে। চৈত্র মাসে ফুল ফোটে। কাঁদিতে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ফোটে। পুরুষ ফুল সাদা ক্ষুদ্রাকার। ফল হয় গ্রীষ্মকালে। ফল প্রায় ডিম্বাকৃতি, হলুদ রঙের, লম্বায় প্রায় ২.৫ সেন্টিমিটার। ভেতরে হালকা বাদামি রঙের একটি বীজ থাকে। বীজের ওপরে পাতলা আবরণের মতো শাঁস থাকে। কাঁচা শাঁস কষটা-নোনতা। কিন্তু পাকলে তা বেশ মিষ্টি হয়। পাকা খেজুরের রঙ লালচে বাদামি থেকে খয়েরি হয়। বীজ দিয়েই খেজুরের বংশবৃদ্ধি হয়।

দেশি খেজুর গাছের বিস্তৃতি পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে হিমালয়ের পশ্চিম থেকে শুরু করে ভারতবর্ষ থেকে নেপাল ও মিয়ানমার পর্যন্ত। খেজুর গাছ বিক্ষিপ্তভাবে এ দেশের প্রায় সর্বত্রই জন্মে। এমনকি সুন্দরবন তথা উপকূলীয় অঞ্চলেও খেজুরের গাছ দেখা গেছে। তবে বেশি ও ভালো খেজুর গাছ জন্মে দুই চব্বিশ পরগণায়। দেশি খেজুরকে চিনি বা গুড় উৎপাদনকারী ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খেজুর গাছের প্রধান ব্যবহার রস ও গুড় উৎপাদন করা। দেশি খেজুরের ফলের শাঁস পাতলা, দানা বড়ো, পাকা ফলের সংরক্ষণ ক্ষমতা খুবই কম। তবু পাকা ফলের সুমিষ্ট গন্ধ ও মিষ্টি স্বাদ অনেককেই আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের। ছোট্ট এই ফলের গুণাগুণ নিয়ে পুষ্টিবিদরা বলেন, খেজুরের মধ্যে আছে ক্যালসিয়াম, সালফার, আয়রন, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, কপার, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন বি-৬, ফলিক অ্যাসিড, আমিষ, শর্করা। তাই খেজুর শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিকরও বটে৷ খেজুর ফল হৃদরোগ, জ্বর ও পেটের ব্যাথায় উপকারী। ফল বলবর্ধক। ফলে প্রচুর লৌহ জাতীয় খনিজ উপাদান আছে। শুষ্ক থেকে আর্দ্র যে কোনো স্থানে দেশি খেজুর গাছ জন্মাতে পারে। দেশি খেজুর গাছের জন্ম ও বৃদ্ধি লাভ সেখানে বেশি ভালো হয় যেখানে দিনের তাপমাত্রা ২৫-৩৫ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড থাকে। তবে তাপমাত্রা কমে গেলেও খেজুর গাছ বেঁচে থাকতে পারে। তরুণ গাছ হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খেজুর গাছের জন্য বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৪০০-৭০০ মিলিমিটার দরকার হয়। খেজুর গাছের জন্য রোদেলা জায়গা চাই। বিভিন্ন ধরনের মাটিতে খেজুরগাছ জন্মাতে পারে। তবে মাটি অবশ্যই সুনিষ্কাশিত হতে হবে। তা না হলে গাছ টিকবে না। মাটির অম্লমান বা পিএইচ ৫.৫-৭.৫ হলে ভালো। লবণাক্ত মাটিতে খেজুর গাছ ভালো হয়।

বিদেশি খেজুর

সাধারণত গাছেই কাঁদিতে দেশি খেজুরের ফল পেকে ঝরে পড়ে, সংগ্রহ করা হয় না। সব ফল একসঙ্গে পাকে না। কয়েক দিন ধরে পাকতে থাকে। ফল পাকার সময় গ্রীষ্মকাল। পাকা ফল পাখিরা খায়। ফল মাটিতে ঝরে পড়ে সেখানেই প্রাকৃতিকভাবে চারা তৈরি হয়। খাওয়ার জন্য ফলের রঙ সবুজ থেকে হলুদ হলে কাঁদির পাটি কেটে কাঁদিসহ সংগ্রহ করা হয়। ঘরে রেখে দিলে ২-৩ দিনের মধ্যে সেসব পরিপক্ব ফল পাকতে শুরু করে। পাকলে ফলের শাঁস নরম হয় ও লালচে মেরুন রঙ ধারণ করে। একটি গাছ থেকে ১০-২৫ কেজি ফল পাওয়া যায়।

স্বাধীনতার পরেও ফলটি পাওয়া যেত দেশের বহু হাটবাজারে। সৌদিসহ আরবের খেজুর আসার পর থেকে দেশি এই ফলটি বেহাল দশায় পড়ে। দেশি খেজুরকে কেউ কেউ বুনো বা জংলি খেজুর নামে ডাকেন। এর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ওয়াইল্ড ডেট পাম (Wild Date Palm)। দেশি খেজুর এ দেশেই উৎপত্তি, এ দেশেই বিস্তার।

মন্টুবাবুর সংগ্রহ করা দেশি খেজুর ও কাঁঠাল বীজ

কেন বিদেশি খেজুরের মতো বাজার তৈরি হলো না দেশি খেজুরের? দেশি ফল-সব্জির বীজ সংগ্রাহক তথা পরিবেশকর্মী মন্টু হাইত বিগত কয়েক বছরে কলকাতা শহরের চেতলায় ‘গেরিলা গার্ডেনিং’ তথা অরণ্যায়ন করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। চেতলার বাগানে তিনি যে যে দেশি ফলের গাছ রোপন করেছেন এ পর্যন্ত, তার মধ্যে আছে দেশি খেজুরও। তাঁর কথা অনুযায়ী, “আসলে দেশি খেজুরের শাঁসালো অংশটা কম, তাই বাজার পায় না। দেশি খেজুর গাছ মূলত গুড় তৈরির জন্যই, তার বাজারও আছে।” 

এ সময়ে দেশি খেজুর পাওয়া যাচ্ছে বাজারে, চোখে পড়লেই কিনে ফেলুন। তবে, যাঁদের রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি শুধু তাঁদের বেলায় খেজুর খাওয়ায় খানিকটা বিধিনিষেধ আছে। অনেকেরই ধারণা, দামি ও বিদেশি ফলের পুষ্টিগুণ বেশি। এমন ধারণা অমূলক। দেশি ও মরশুমি ফলের পুষ্টিগুণ তুলনামূলক বেশি। দামও অনেক কম। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতেও দেশি ফলের জুড়ি নেই। বিশেষত শিশুদের দেশি ফল খেতে উৎসাহিত করতে হবে।

Developed by DXDasia