মাস্টারশেফে বাংলার মেয়ে প্রিয়াঙ্কা কুণ্ডু বিশ্বাস পেলেন ‛ডেজার্টের রানি’ শিরোপা

নিজের রান্না দিয়ে মন জয় করলেন গোটা ভারতের

প্রিয়াঙ্কা কুণ্ডু বিশ্বাস (Priyanka Kundu Biswas)। গত কয়েকদিনে এই নামটি ঢুকে পড়েছে বাংলা তথা গোটা ভারতের হেঁশেলে। সম্প্রতি তিনি মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতার সপ্তম সিজনে (MasterChef India Season 7) সেলেব্রিটি শেফ এবং প্রতিযোগিতার অন‍্যতম বিচারক বিকাশ খান্নার (Vikas Khanna) কাছ থেকে পেয়েছেন ‛ডেজার্টের রানি’(Queen of Desserts) তকমা। ‛মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া’-র সেমিফাইনালিস্ট প্রিয়াঙ্কা কুণ্ডু বিশ্বাসের (MasterChef India Semi-finalist Priyanka Kundu Biswas) অসামান‍্য রন্ধনশৈলী নজর টেনেছে সব বিচারকেরই। ৩২ বছর বয়সী, দমদম-নিবাসী প্রিয়াঙ্কা গত ৫ বছর ধরে একটি বহুজাতিক সংস্থাতে কর্মরতা ছিলেন। তিনি উচ্চশিক্ষিতা এবং ছোটোবেলা থেকেই পড়াশুনাতে তাঁর বুৎপত্তি ছিলো অসাধারণ। মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতায় (MasterChef Contest) তিনি ৬৫০ জন প্রতিযোগীর মধ‍্যে প্রথম ১৪ জন প্রতিযোগীর তালিকায় নির্বাচিত হন, যা শেষপর্যন্ত তাঁকে এই খেতাবটি এনে দিয়েছে।

দুর্দান্ত ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও এবং চাকরিক্ষেত্রে অনেককিছু অর্জন করা সত্ত্বেও তিনি নিজের পেশা বদলানোর সাহস দেখিয়েছেন। তাঁর নিজের বয়ান অনুযায়ী- “আমি অফিসে থাকাকালীন ফাঁকা সময়ে রান্না করতাম। তাই দেখে আমার সহকর্মীরা আমাকে মাস্টারশেফ বলে ডাকতো। তখন থেকেই আমি ভাবতে শুরু করি যে, আমি গত ৫ বছর ধরে অন্যের জন্য কাজ করছি, এবার নিজের জন্য ২ বছর দিয়ে দেখা যাক। যদি এই দুবছরে সফল না হই তাহলে একটা এক্সিকিউটিভ এম.বি.এ (Executive MBA) করে আবার চাকরিতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিলো। সেই পরিকল্পনা অনুসারে আমার চাকরি জীবনের ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার তিন-চার দিনের মধ‍্যে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। মা-বাবাকে চাকরি ছাড়ার কথা বলিনি, কারণ তাঁরা আমার সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতেন না। তাঁদের শুধু জানিয়েছিলাম যে আমি চাকরি থেকে কিছুদিনের বিরতি নিচ্ছি। এই দুবছরের মধ‍্যে কিছু না করতে পারলে আমি আবার চাকরিক্ষেত্রে ফিরে আসবো। কিন্তু সেই দু বছরের মধ‍্যে আমার নাম একটা আন্তর্জাতিক ম‍্যাগাজিনে বেরিয়ে যায়, ফলে আমাকে আর অন‍্যকিছু ভাবতে হয়নি।”

প্রিয়াঙ্কার মা-বাবা এখন বুঝতে পেরেছেন যে, তাঁদের মেয়ের রোজগার হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু সে তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে অনেক বেশি খুশি, কারণ সে এখন নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করছে। প্রিয়াঙ্কা জন্মসূত্রে বাঙালি এবং নিজের এই পরিচয় নিয়ে গর্বিত। ঘরোয়া রান্না থেকে শুরু করে রেঁস্তোরা-ধাঁচের রান্না, সবেতেই তিনি সমান পারদর্শী। যদিও তিনি প্রতিযোগিতার জন‍্য বেকিংকেই নির্বাচন করেছিলেন, তার একটা কারণ এই যে মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতার চতুর্থ সিজনের বিজয়ী ছিলেন একজন বেকার (Baker)। প্রিয়াঙ্কা বলেছেন- “আমি তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আমি বেশ তাড়াতাড়ি কেক বানাতে পারি। প্রচুর রান্নার বই পড়া আর রান্না-সংক্রান্ত ভিডিও দেখা আমার অনেকদিনের অভ‍্যাস। বেকিং সম্পর্কে আমার প্রথমদিকে খুব একটা ধারণা ছিলো না। কেক সাজানো আসলে খাদ‍্য ও শিল্পের সংমিশ্রণ। আমার শিল্পী-পরিবারে জন্ম। আমার বাবা আর ভাই দুজনেই জাতীয় পর্যায়ের শিল্পী। আমি কমার্সের ছাত্রী, তাই এটা সহজেই বুঝতে পেরেছিলাম যে, কেক সাজানো, উপার্জনেরও একটা ভালো রাস্তা হতে পারে। তাই কেক সাজানোকে আমি নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিই আর সঙ্গে সঙ্গে বেকিং নিয়ে পড়াশোনাও চালিয়ে গিয়েছিলাম। আমি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বেকিং (Baking) শিখিনি। এটা একটা ভুল ধারণা যে, কোনো কিছু শিখতে হলে সবসময় কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়েই কোনো কোর্স করতে হবে। এখন সারা বিশ্বে প্রযুক্তির যা উন্নতি হয়েছে আর কোভিডের কারণেও, আমরা এখন এমন অনেক কোর্স বাড়িতে বসে বিনামূল‍্যে করতে পারি, যেগুলো করতে গেলে আগে কয়েক লাখ টাকা খরচা করতে হতো। আমি বাড়িতে বসে এমন অনেক কোর্স করেছি, যা আমাকে খুবই সাহায‍্য করেছে।” 

এইসব ভিডিওতে আর বইতে বলা রান্নার পদ্ধতিগুলিকে প্রিয়াঙ্কা নিঁখুতভাবে করায়ত্ত করেছিলেন। তাঁর সংগ্রহে থাকা সমস্তধরণের রান্নার বইয়ের মধ‍্যে ৮০ টিই বেকিং-সংক্রান্ত। তিনি আরও বলেছেন-“আমি কখনও চেষ্টা করা ছাড়িনি, আর সেটাই আমার সফলতার অন‍্যতম প্রধান কারণ। আমি যখন বুঝতে পারতাম যে আমি কিছু ভুল করছি, তখন সেটাই আমাকে ঠিক পদ্ধতি শেখার রাস্তায় নিয়ে যেতো। আমার কাছে সমস্ত ব‍্যাপারটাই এতটাই আকর্ষণীয় ছিলো যে আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গিয়েছিলাম। আমার এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অভ‍্যাসের কারণে আমার বাড়ির লোক আর প্রতিবেশীদের প্রায় রোজই প্রচুর কেক খেতে হতো। আমি প্রথম দেড় বছর একটাও কেক বিক্রি করিনি। কারণ আমার সবসময় লক্ষ‍্য থাকে যে আমি যে কাজটা করছি, তাতে আমাকে নিঁখুত হতে হবে। নয়তো আমি সেই কাজটা করবো না।”

প্রিয়াঙ্কার কাছে এই মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতা, তাতে অংশগ্রহণ ও সফল হওয়া, পুরোটাই ছিলো এক স্বপ্নের যাত্রা। তিনি প্রথমদিকে পুরো ঘটনাটা বিশ্বাসই করে উঠতে পারেননি। তিনি বলেন-“আমার কাছে পুরোটাই ছিলো একটা রূপকথা। আমি যে প্রতিযোগিতাটা টেলিভিশনে দেখতাম, সেখানেই আমি একজন প্রতিযোগী, এটাই আমার কাছে অবিশ্বাস্য ছিলো। সবকিছুই খুব তাড়াতাড়ি ঘটে গিয়েছিলো। গোয়া থেকে ফিরে আসার পরেও আমি অনেকদিন ঘোরের মধ‍্যে ছিলাম।”

তিনি বহুদিন ধরে মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতার জন‍্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং এইবার ছিলো তাঁর তৃতীয় প্রচেষ্টা। তাঁর কথায়-“আগের বছরের প্রতিযোগী আর বিজয়ীরা কি এবং কতটা অর্জন করেছিলেন সে সম্পর্কে আমাকে সবসময় খোঁজ রাখতে হতো, কারণ পরের সিজনে সেগুলি একেবারেই প্রাথমিক গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়।” 

প্রিয়াঙ্কার কাছে এই মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতা, তাতে অংশগ্রহণ ও সফল হওয়া, পুরোটাই ছিলো এক স্বপ্নের যাত্রা। তিনি প্রথমদিকে পুরো ঘটনাটা বিশ্বাসই করে উঠতে পারেননি। তিনি বলেন-“আমার কাছে পুরোটাই ছিলো একটা রূপকথা। আমি যে প্রতিযোগিতাটা টেলিভিশনে দেখতাম, সেখানেই আমি একজন প্রতিযোগী, এটাই আমার কাছে অবিশ্বাস্য ছিলো। সবকিছুই খুব তাড়াতাড়ি ঘটে গিয়েছিলো। গোয়া থেকে ফিরে আসার পরেও আমি অনেকদিন ঘোরের মধ‍্যে ছিলাম।” প্রথমে তাঁকে কলকাতায় একদিনে দু-রাউন্ড অডিশন দিতে হয়েছিলো। পরের দিন ছিলো বিরতি। তারপর তাঁকে দু'বার মুম্বাই যেতে হয়েছিলো, প্রথম রাউন্ড আর দ্বিতীয় রাউন্ডের সিলেকশনের জন‍্য। দ্বিতীয়বার সব প্রতিযোগী অন্তত ২৫ জোড়া জামাকাপড় নিয়ে গিয়েছিলেন। যদি কেউ প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত না হন, তাঁকে সমস্ত জিনিসপত্র সমেত বাড়ি ফিরে আসতে হবে। আর যাঁরা নির্বাচিত হবেন, তাঁদেরকে বাদ পড়া পর্যন্ত সেখানেই থাকতে হবে। প্রিয়াঙ্কা আরও বলেছেন-“এই প্রতিযোগিতার গোটা যাত্রাটা জুড়েই আমার মধ‍্যে মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিলো, কারণ আমি একইসাথে উত্তেজিত আর বিচলিত ছিলাম। নির্বাচিত হওয়ার পরেও আমার বেশ কিছুক্ষণ বিশ্বাস হয়নি।”

প্রতিযোগিতা চলাকালীন চার মাস ধরে তিনি শুধু খাবার আর তাদের রন্ধনপ্রণালী নিয়েই মগ্ন ছিলেন। প্রতিযোগিতায় সবধরণের চ‍্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হতো প্রতিযোগীদের। প্রথম দশজনের মধ‍্যে পৌঁছানোর পরেই প্রতিযোগীরা বিচারকদের সাথে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রিয়াঙ্কা পুরো অভিজ্ঞতাটা নিয়েই দারুণ অভিভূত ছিলেন। প্রিয়াঙ্কার মতে, দূর থেকে প্রতিযোগীদের নিয়ে মতামত জানানো খুবই সহজ, কিন্তু সব প্রতিযোগীই নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং প্রত‍্যেকজনই যোগ‍্য। প্রিয়াঙ্কার অন‍্যতম পছন্দের পদ হলো ফ্রেঞ্চ পেস্ট্রি পেটিসেরি। তাঁর বক্তব্য-"এই পদটি শিখতে যদি আমাকে কোনো প্রতিষ্ঠানে যেতে হতো, তাহলে আমাকে ১০ লাখ টাকা খরচা করতে হতো। কিন্তু আমি ভিডিও আর রান্নার বইগুলির সাহায্যে ঘরে বসে বিনামূল্যে এটি শিখেছিলাম।”

 

এখন তিনি বিভিন্ন ধরণের রুটি তৈরি করার অভ‍্যেস করছেন। তিনি জানালেন-“রুটি তৈরির প্রাথমিক উপাদানগুলি সবধরণের রুটির ক্ষেত্রেই এক, যেমন- জল, নুন বা চিনি, ময়দা, খামির। কিন্তু শুধুমাত্র হাইড্রেশন পদ্ধতিতে বদল ঘটিয়ে বা তাপমাত্রার তারতম‍্য ঘটিয়ে এই উপাদানগুলি দিয়েই বিভিন্ন ধরনের রুটি বানানো যায়। এই ব‍্যাপারটা আমাকে খুবই আকর্ষণ করেছে।” 

প্রিয়াঙ্কা নিজের বাড়িতে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের শেখান। প্রাথমিক স্তরের ক্ষেত্রে, প্রতিদিন ৩ ঘন্টা করে, ৫ দিনের ওয়ার্কশপের জন‍্য মোট ৬০০০ টাকা নেন তিনি। তাঁর লক্ষ‍্য হলো বেকিংকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার রূপ দেওয়া, যাতে সবাই পেশাদার বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে বেকিং শিখতে পারে। তাঁর শিক্ষার্থীরা যাতে সরকারের কাছ থেকে শংসাপত্র পায়, তিনি সেই ব‍্যবস্থাও করেছেন। গত এক মাস ধরে প্রিয়াঙ্কা প্রতিদিন ভোর ৫ টায় ওঠেন আর মাঝরাতে ঘুমোতে যান। এটা রুটিন খুব ক্লান্তিকর হলেও তিনি এই ব‍্যাপারটা দারুণ উপভোগ করছেন। প্রতিদিন তিনি ৫ থেকে ১০ টা কেক তৈরির অর্ডার পেয়ে থাকেন এবং সমস্ত কাজের মধ‍্যে তাঁকে নিয়মিত ক্লাসও নিতে হয়। তাঁর সমস্ত স্লটই ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত পুরোপুরি ভর্তি। 

প্রিয়াঙ্কা বর্তমানে সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশকে সাহায্য করার উদ‍্যোগও নিয়েছেন। তিনি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করেছেন, যাতে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদেরকে অনলাইনে বেকিং শেখানো যায়। তাঁর ইচ্ছা ভবিষ‍্যতে একটা ক‍্যাফেটেরিয়া খোলার। তিনি বলছিলেন-“আমি এইধরণের প্রচুর প্রস্তাব পেয়েছি যাঁরা আমার ক‍্যাফেতে বিনিয়োগ করতে চান, কিন্তু আমি ওটা নিজেই করতে চাই।” তিনি এখনই কোনো বেকারির প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না, কারণ তাঁর মতে তিনি এখনও শিখছেন।

তাঁর মতে, শিক্ষা কখনও নষ্ট হয় না। তাঁর সমস্ত কেক-এর দামই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ‍্যে। সর্বোৎকৃষ্ট উপাদান ব‍্যবহার করার পরেও নিজের বানানো আনারসের কেক-এর দাম প্রতি পাউন্ডে ৫০০ টাকা, আর চকোলেট কেক-এর দাম প্রতি পাউন্ডে ৭০০ টাকা রেখেছেন তিনি। এই বিনয়ী অথচ পারফেকশনিস্ট রন্ধনশিল্পী স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করেন, যা তাঁকে নতুন নতুন সফলতার দিকে যাচ্ছে। তাঁর জ্ঞানের খিদে তাঁকে নতুন ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আর অনুসন্ধানে প্রেরিত করে। যারা নিজের কাজ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, তাঁদের সবার জন‍্য ‛মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া’-র সপ্তম সিজনের ‛ডেজার্টের রানি’ প্রিয়াঙ্কা কুণ্ডু বিশ্বাস এক ঊজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।

Written by
Developed by DXDasia