মীরজাফরের পদচিহ্নের খোঁজে
মুর্শিদাবাদ হাউস
সৈয়দ মির মুহম্মদ জাফর আলি খান বাহাদুর – এই নামের সঙ্গে অত পরিচিতি নেই আপামর বাঙালির, কিন্তু মীরজাফর – এই নামটিকে চেনে না এমন বাঙালি বিরল – নামটি বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে সমার্থক হয়ে গেছে। মীরজাফরের কর্মভূমি মূলত মুর্শিদাবাদ, কিন্তু তাঁর স্মৃতিচিহ্ন আজও বহন করে চলেছে কলকাতা। আমরা চোখ রাখি বরং ইতিহাসের সেই পাতায়। (কলকাতায় মীরজাফর)
মীরজাফর (ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, লন্ডনের সৌজন্যে)
মীরজাফর নবাব হওয়ার পর প্রথম যখন কলকাতায় পা দেন তখন কোম্পানি তৈরি করে এই নবাব ঘাটটি- তবে পরবর্তীকালে ঘাট রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দিতেন মুর্শিদাবাদের নবাবরা। নৌবহরের জন্য তৈরি হয়েছিল আরেকটি ঘাট, যেটি নবাবের ঘাটের ঠিক পাশে – নাম? মীরবহর ঘাট।
কলকাতায় জমা আছে এমন অনেক রাস্তাঘাট কিংবা প্রাসাদের গল্প যাদের কোনো পার্থিব অস্তিত্ব নেই আজ – রয়ে গেছে শুধু ইতিহাসের পাতায়। সেরকমই একটি বিল্ডিং হল কলকাতার জিপিও-র পাশে পুরোনো কেল্লায় ১৭৫৭ সালে প্রথম যে মিন্ট ওরফে টাঁকশাল স্থাপিত হয় সেটি। এই প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ছে, সিরাজদৌল্লা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির থেকে কলকাতা দখল করেন ১৭৫৬ সালের জুন মাসে এবং তাঁর মাতামহের নামে কলকাতার নাম রাখেন আলিনগর। এই খবর পৌঁছায় মাদ্রাজের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হর্তা কর্তাদের কাছে। তাঁরা তৎক্ষণাৎ রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ৯০০ জন ইউরোপীয় ও ১৫০০ জন ভারতীয় সৈন্যকে পাঠান স্থলবাহিনী হিসাবে। অপরদিকে নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দেন ওয়াটসন। তাঁরা ডিসেম্বরের ২৯ তারিখে বজবজ দুর্গ এবং ২ জানুয়ারি, ১৭৫৭-তে কলকাতা পুনর্দখল করেন। তখন একটি সনদ স্বাক্ষরিত হয় দু-পক্ষের মধ্যে যাঁর অন্যতম শর্ত ছিল কলকাতায় টাঁকশাল স্থাপন করতে দিতে হবে। সেই সময়েই এই টাঁকশাল স্থাপিত হয়। কলকাতায় পুরোনো টাঁকশালের পাশের যে গলি, সেটার নাম নবাব লেন আর এর ঠিক নীচের গঙ্গাতীরে ছিল একটি ঘাট যার নাম নবাব ঘাট – সম্ভবত নবাব মীরজাফরকে উপলক্ষ্য করে এই ঘাট তৈরি করা হয়। (কলকাতায় মীরজাফর)
নবাব লেন (বাঁদিকে) মীরবহর ঘাট স্ট্রিট (ডানদিকে)
১৭৫৭-এর জুন মাসে সিরাজ-উদ-দৌল্লা ও তাঁর বিপুল বাহিনীকে পলাশীর প্রান্তরে হারিয়ে দেয় রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী। যদিও সংখ্যায় নবাবের ফৌজ ছিল অনেক বেশি, কিন্তু মীরজাফরের কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাতের কারণে, তাঁর নেতৃত্বাধীন এক বিশাল সংখ্যক সৈন্য এই যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থাকে। সিরাজ-উদ-দৌল্লা পরাজিত হন, গোপনে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করেন কিন্তু পরে ধরা পড়েন। নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় তাঁকে। এরপর ক্ষমতাহীন দায়িত্বের নবাব হিসেবে, বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার পেয়ে বাংলার মসনদ পান মীরজাফর। মীরজাফর নবাব হওয়ার পর প্রথম যখন কলকাতায় পা দেন তখন কোম্পানি তৈরি করে এই নবাব ঘাটটি- তবে পরবর্তীকালে এই ঘাট রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দিতেন মুর্শিদাবাদের নবাবরা। নবাব তো কলকাতায় পা দিলেন – আর তাঁর লোকলস্কর, নৌবহর? সে তো নেহাত কম হবে না। তারা তো নবাবের ঘাটে নামতেও পারবে না, বজরাও বাঁধতে পারবে না। সেই নৌবহরের জন্য তৈরি হয়েছিল আরেকটি ঘাট, যেটি নবাবের ঘাটের ঠিক পাশে – নাম? মীরবহর ঘাট। এই নামে পাশে একটি রাস্তাও আছে – মীরবহর ঘাট স্ট্রিট। (কলকাতায় মীরজাফর)
এই মীরজাফরের বংশধরদের একটি প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আজও রয়ে গেছে কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্র পার্কস্ট্রিটে। পার্কস্ট্রিট মেট্রো থেকে রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে গেলে আমরা পাই ৩০, পার্ক স্ট্রিট – যেখানে এক সময়ে ছিল কলকাতার প্রথম ইউরোপিয়ান থিয়েটার সঁ-সু-জি থিয়েটার আর এখন কলকাতার অন্যতম সেরা কলেজ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। যদি সেই কলেজের ঠিক উল্টোদিকে যাই, পার্ক স্ট্রিট ও রফি আহমেদ কিদওয়াই স্ট্রিটের সংযোগস্থলে আমরা দেখতে পাব একটি উঁচু প্রাচীর, ৮৫ নম্বর পার্ক স্ট্রিট বাড়িটি। তার দুটি কাঠের ফটক প্রায় ভেঙে পড়েছে, সামনে উন্মুক্ত বিশাল লন আর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এক ভগ্নপ্রায় অট্টালিকা। এটি ছিল মীরজাফরের পরিবার বর্গের একদা বাসভবন – বর্তমান নাম মুর্শিদাবাদ হাউস। ক্ষমতাহীন দায়িত্বের নবাব হিসেবে, বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার পেয়ে বাংলার মসনদ পাওয়া মীরজাফরের বংশধরদেরই বাসস্থান ছিল এই প্রাসাদ। কোনো প্রামাণ্য তথ্য না থাকলেও এর গঠনশৈলী দেখে অনুমান করা হয় সম্ভবত ১৮৫০ দশকের শেষ দিকে এই প্রাসাদটি তৈরি। মীরজাফর মারা গেছেন ১৭৬৫ সালে, তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে এক এক করে নবাব হন তাঁর বংশধরেরা। ইতিমধ্যে ১৮৮০ সালে ‘বাংলার নবাব’ সরিয়ে ‘মুর্শিদাবাদের নবাব’ খেতাব চালু হয়। এইসব উত্তরাধিকারের জটিল তালিকা পেরিয়ে আমরা পাই সৈয়দ ওয়াসিফ আলি মির্জাকে, যিনি ১৯০৬ সালে এই নবাবী খেতাব পান এবং ১৯৫৯ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ১৯৩১ সালে উনিশ লক্ষ টাকার ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি আর তাই সরকার তাঁর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে। প্রাসাদটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।

মুর্শিদাবাদ হাউসের এখনকার অবস্থা
১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাপে মুর্শিদাবাদে সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন মীরজাফর এবং কাশিম খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এরপর তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং আলিপুরে বসবাস শুরু করেন। মনে করা হয়, তখনই তিনি কলকাতায় বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করেন, তার মধ্যে একটি বেলভেডিয়ার হাউস যেটি তিনি ওয়ারেন হেস্টিংসকে উপহার দেন।
এখানে এখন অধিগ্রহণকারীরাই মূলত বসবাস করেন। ঠিক এরকমই আরেকটি বাড়ির কথা আমরা জানতে পারি যা শুধুমাত্র যে মীরজাফরের স্মৃতি বিজড়িত তা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওয়ারেন হেস্টিংসেরও নাম। আলিপুরে চিড়িয়াখানার বিপরীতে অবস্থিত বেলভেডিয়ার হাউস। বেলভেডিয়ার হাউস একসময় ভারতের ভাইসরয়ের প্রাসাদ ছিল এবং পরবর্তীকালে বঙ্গের গভর্নরের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৪৮ সাল থেকে এখানে অবস্থিত National Library of India। ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাপে মুর্শিদাবাদে সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন মীরজাফর এবং কাশিম খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এরপর তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং আলিপুরে বসবাস শুরু করেন। মনে করা হয়, তখনই তিনি কলকাতায় বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করেন, তার মধ্যে একটি এই বেলভেডিয়ার হাউস যেটি তিনি ওয়ারেন হেস্টিংসকে উপহার দেন। এই বাড়িটি ঘিরে যত না মীরজাফরের স্মৃতি তার থেকে অনেক বেশি স্মৃতি হেস্টিংসের। শোনা যায় ১৭ অগাস্ট ১৭৮০-তে এখানে ডুয়েল হয়েছিলো ওয়ারেন হেস্টিংস আর ফিলিপ ফ্রান্সিসের। ন্যাশনাল লাইব্রেরির ইতিহাস ঘাঁটলে এই ডুয়েলের পিছনে পাওয়া যায় দুশো বছরের পুরোনো এক পরকীয়ার গল্প। ক্যাথরিন ছিলেন চন্দননগরের ফরাসি ধনকুবেরের সুন্দরী ষোড়শী কন্যা। কলকাতার তাবড় তাবড় ইংরেজদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন এই সুন্দরী। ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে তাঁর বন্ধু ফিলিপ ফ্রান্সিস কেউ বাদ ছিলেন না অনুরাগীদের তালিকায়। তবে পদমর্যাদা বজায় রাখতে গিয়ে হেস্টিংসকে যে শোভনতাটুকু মানতে হতো সেটুকুর সুবিধে নিয়ে ক্যাথরিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেন ফিলিপ ফ্রান্সিস। তিনি তখন ক্ষমতায় হেস্টিংসের ঠিক পরেই। কিন্তু এসবের মধ্যে হঠাৎই এক পার্টিতে ক্যাথরিনের সঙ্গে আলাপ হল মিঃ গ্র্যান্ডের। পছন্দও হয়ে গেলো দুজনের দুজনকে আর ক্যাথরিন হলেন মিসেস গ্র্যান্ড। তবে ধৈর্য্য হারাননি ফ্রান্সিস। তাঁর আয়োজিত এক বলপার্টিতে আবার ফ্রান্সিসের জন্য পুরোনো দুর্বলতা জেগে উঠলো ক্যাথরিনের থুড়ি মিসেস গ্র্যান্ডের। বিবাহ বহির্ভূত এই প্রেম ভালোই চলছিলো মিঃ গ্র্যান্ডের অজান্তে।
এর মধ্যে একদিন মিঃ বারওয়েলের বাড়িতে ছিলো নৈশভোজের আমন্ত্রণ কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাথরিন রয়ে গেলেন বাড়িতে। নটা নাগাদ মিঃ গ্র্যান্ড বেরোতেই পাঁচিল টপকে রাতের অন্ধকারে প্রেমিকার বাড়ি ঢুকতে গেলেন ফ্রান্সিস। কিন্তু দারোয়ানের হাতে ধরা পড়ে গেলেন তিনি। সাহেবকে আটকে রেখে গ্র্যান্ডের কাছে খবর দিতে গেলো দারোয়ান। পার্টির মাঝে খবরটা পেয়ে বাড়ি ছুটে এলেন গ্র্যান্ড কিন্তু ততক্ষণে ফ্রান্সিস পালিয়েছেন অকুস্থল থেকে। অগত্যা গ্র্যান্ড ক্যাথরিনকে কিছু মাসোহারার ব্যবস্থা করে পাঠিয়ে দিলেন চন্দননগর। ইতিমধ্যে খবর পেলেন হেস্টিংস। তিনি ফ্রান্সিসকে পাঠালেন চিঠি- বিষয় তাঁর সাথে ডুয়েলের আহ্বান। যদিও ফ্রান্সিস পটু নন বন্দুক চালানোয় তবু ডুয়েলের আহ্বান অস্বীকার করা কাপুরুষতা। স্থান ঠিক হলো বেলভেডের রোডের বাগান। ১৭৮০ সালের ১৭ অগাস্ট ভোর সাড়ে ছটায় হাজির হেস্টিংস আর ফিলিপ। হেস্টিংসের পক্ষে কর্নেল পিয়ার্স। ফ্রান্সিসের সঙ্গী কর্ণেল ওয়াটসন। দুটো পিস্তল এক সঙ্গে গর্জে উঠল। ফ্রান্সিসের গুলি হেস্টিংসের গায়েও লাগল না। কিন্তু হেস্টিংসের ছোড়া গুলি বিঁধল ফ্রান্সিসের শরীরে। সাহেব আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ফ্রান্সিস কি মারা গিয়েছিলেন? অশরীরি হয়ে ঘুরে বেড়ান তিনি আজও? জনশ্রুতি… একবার কোন এক কর্মচারী নাকি দেখেছিল রক্তে ভেজা শরীরের এক সাহেবকে পালকিতে নিয়ে ভিতরে ঢুকছে পালকি বাহকরা। পালকির পিছন ঘোড়া নিয়ে আসছে এক সাহেব। কাছে আসতেই বেমালুম হাওয়ায় মিলিয়ে গেল তাঁরা। সেই স্মৃতি থেকেই নাকি ন্যাশনাল লাইব্রেরি চত্বরে আজও রাতের বেলা ভুতুড়ে কলকাতার প্রথম সারিতে। তবে, এ তো গল্পকথা।
বেলভেডিয়ার হাউস অথবা ন্যাশনাল লাইব্রেরি
মীরজাফরকে ইংরেজরা সংক্ষেপে আলি খান বলতেন, আর তাই তিনি যখন বর্তমান আলিপুর অঞ্চলে তাঁর কলকাতার বাসস্থান তৈরি করেন, কোম্পানির নথিতে ওই অঞ্চলকে আলিখানের জমি বলে উল্লেখ করা হয় এবং নাম হয় আলিপুর। অতীতবিলাসী কলকাতা কত ইতিহাসের চিরকুট জমিয়ে রেখেছে তার হিসাব মেলা ভার। এভাবেই অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র স্থাপিত হতে থাকে ইতিহাস আর কল্পনাকে ভর করে। হারিয়ে যাওয়া নামেরাও বেঁচে থাকে ইতিহাস, কল্পনা আর মিথকে সঙ্গী করে।
_________
তথ্যসূত্র: রাধারমণ মিত্র/ কলকাতা দর্পণ, শ্রীপান্থ/ কলকাতা