
চিৎপুরের সংস্কৃতি ও স্থান-মাহাত্ম্য
চিৎপুরে প্রাচীন এক মন্দিরের চূড়া
গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে চিৎপুর (Chitpur), তার সংস্কৃতি ও স্থান-মাহাত্ম্য বহুদিন ধরেই এক ঐতিহাসিক পটভূমি করে তুলেছে। চিত্রপুর থেকে চিৎপুর। কথিত আছে, বাংলার অন্যতম আদি চিরপ্রসিদ্ধ দেবী চিত্তেশ্বরী দুর্গার নামেই এই নাম। আবার লোকমুখে বহুকাল আগে দুর্ধর্ষ চিত্তেশ্বর বা চিতে ডাকাতের নামে চিৎপুর হয়েছে।
অজস্র কাহিনির সমাহার এই চিৎপুর। একের পর এক উন্মোচিত হলে তাকে ঠেলে দেবে ইতিহাসের সন্ধানে। বলা হয়, এখানকার নবাব ছিলেন মহম্মদ রেজা খাঁ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর সুবা বাংলার নায়েব নাজিম হন। বাংলার রাজস্ব আদায়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা পেয়েছিলেন। রেজা ছিলেন এক ভয়ংকর অর্থপিশাচ নায়েব। ক্লাইভের সঙ্গে তাঁর সখ্যতার সূচনা হয়।
চিৎপুরে গঙ্গা পাড়ে রেজা খাঁ-র একটি সুবিশাল বাড়ি ছিল। সেই বাগিচা সহ বাড়িটি নবাবের সঙ্গে জড়িয়ে। সে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে, তবে বাড়িটি আজ সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। আজ যেখানে রাজভবন, ওই জমিটিও এককালে নবাব রেজা খাঁ-র ছিল। ব্রিটিশরা প্রথম নবাবের থেকেই জমিটি নিয়েছিলেন।
আজ যেখানে রাজভবন, ওই জমিটিও এককালে নবাব রেজা খাঁ-র ছিল। ব্রিটিশরা প্রথম নবাবের থেকেই জমিটি নিয়েছিলেন।

পুরোনো ফলক
অত্যাচারী রেজা খাঁ-র আমলে শোষণ চরমে ওঠে। বাংলার মানুষের জীবন চরম দুর্দশায় পরিণত হয়। শাসন ও শোষণে তিনি যেন রাতারাতি ‘সরফরাজ’ হয়ে উঠলেন। দেশে দুর্ভিক্ষ এলো। খিদের জ্বালায় অনাহারে মানুষ মরতে লাগলো। রেজা খাঁ-র জন্যে দেশ ছারখার হলো। নদীতে তখন শবদেহ ভেসে ওঠে। বাইরে থেকে এলো সন্ন্যাসী-ফকিরের দল। গ্রামকে গ্রাম শ্মশান হলো।
১৭৭০ সালে অর্থাৎ ১১৭৬ বঙ্গাব্দতে হলো ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। দুর্ভিক্ষপীড়িতদের কাছে রেজা খাঁ আর কোম্পানির কর্মকর্তা রেসিডেন্ট রিচার্ড বীচার চড়া দামে আবার চাল ব্যবসার মতলব করলেন। আরেক দিকে রেজা খাঁ চাপালেন ‘নাজাই কর’। শতকরা দশ টাকা রাজস্ব বাড়িয়ে দিলেন। সমাজ সচেতক সাধক কবি রামপ্রসাদ বললেন, “অন্ন ত্রাণে প্রাণে মরি, নানাবিধ কৃষি করি/ আমার কৃষি সকল নিল জলে”। সাধক কবি গঙ্গা পথে নৌকায় চিৎপুর হয়ে এলেন কলকাতা। দেশে তখন ভয়াবহ অবস্থা। রামপ্রসাদ গাইলেন, “অন্ন দে গো অন্নদা। জানি মায়ে দেয় ক্ষুধায় অন্ন”। শোনা যায়, কবিরঞ্জনের গান শোনার জন্য চিৎপুরের মা সর্বমঙ্গলা দক্ষিণ থেকে পশ্চিমমুখী হয়ে দেখা দিয়েছিলেন।
সাধক কবি গঙ্গা পথে নৌকায় চিৎপুর হয়ে এলেন কলকাতা। দেশে তখন ভয়াবহ অবস্থা। রামপ্রসাদ গাইলেন, “অন্ন দে গো অন্নদা। জানি মায়ে দেয় ক্ষুধায় অন্ন”।

গঙ্গা পাড়ে
দানশীল চূড়ামণি দত্ত, শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব, মহারাজ নন্দকুমার সমাজের গণ্যমান্যরা তখন দেশের মানুষের জন্য অর্থ দান করতে প্রস্তুত কিন্তু তা থেকে কোনও লাভ নেই। প্রয়োজন শুধু খাদ্যশস্যের উৎপাদন। যার অভাব। আনন্দমঠ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখলেন, “লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিতে লাগিল, তারপরে কে ভিক্ষা দেয়! – উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তারপর রোগগ্রস্ত হইতে লাগিল।”
মুর্শিদাবাদ শৈলীতে নির্মিত কলকাতার চিৎপুরের কাছেই বসরী শাহ মসজিদ নির্মাণে রেজা খাঁ-র সংযোগ রয়েছে জানা যায়। সময়ের সঙ্গে বহু কিছু হারিয়ে গেলেও এই অঞ্চল বহু ইতিহাসের প্রমাণ দেয়। আমাদের শহরকে জানতে সাহায্য করে, যাকে আমরা চিনি, অথচ সবটা চেনা এখনও বাকি আছে – যার স্মৃতি বিস্মৃতিতে।

