আজকের তারিখেই ৬১ বছর আগে ইংলিশ চ্যানেল জয় করেন আরতি সাহা

এশিয়ার প্রথম মহিলা সাঁতারু হিসেবে বিশ্বরেকর্ড গড়েন

আড়াই বছর বয়স তখন সেই মেয়েটির… মাতৃহারা হল সে। সবাই বলল অভাগিনী… কিন্তু না– দুর্ভাগ্যের ছায়া তাকে ছুঁতে পারেনি কখনোই। প্রয়াতা মায়ের আশীর্বাদ সারাজীবন ছিল তার সঙ্গে। আরেকটি ভাই ও আরেক বোন ছিল তার। বাবা উপায়ান্তর না দেখে তাদেরকে মামাবাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু আড়াই বছর বয়সী সেই শিশুকন্যা রয়ে গেল তার ঠাকুরমার কাছে। নাম তার আরতি। 

বাবা পাঁচুগোপাল সাহা চাকরি করতেন সেনা বিভাগে। চার বছর বয়স থেকেই কাকা বিশ্বনাথ সাহার সঙ্গে প্রতিদিন চাঁপাতলা ঘাটে স্নান করতে যেত সে। জলের সঙ্গে তখন থেকেই ভালোবাসা সেই খুদে মেয়ের। সাঁতারের প্রতি টান দেখে বাবা ভর্তি করে দিলেন হাটখোলা সুইমিং ক্লাবে। সেখানে তার সাঁতারের কোচ ছিলেন তখনকার বিখ্যাত সাঁতারু শচীন নাগ। ১৯৪৬-এ যখন তার যখন ছ’বছর বয়স, তখনই ‘শৈলেন্দ্র মেমোরিয়াল’ সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একশো মিটার ফ্রি স্টাইলে প্রথম হয়ে সোনার মেডেল জেতে। ছ’বছরের ছোট্ট আরতি গুরুর কোলে চেপে পুরস্কার আনতে গেছিল। মাত্র আট বছর বয়সেই জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করে এবং পদক জেতে। ১৯৫১তে ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে আরতি যে রেকর্ড করেছিল, এক দশকেরও বেশি সময় সেই রেকর্ড অটুট ছিল। ১৯৫২তে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে সামার অলিম্পিকে ভারতের সর্বকনিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করে আরতি সাহা। তখন তার বয়স মোটে বারো। এতো অল্প বয়সে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ! চমকে উঠেছিলো সারা বিশ্বের ক্রীড়ামহল। তখনই সারা বিশ্বে খেলাধুলার জগতে নাম ছড়িয়ে পড়ে তার।

১৯৫৬তে বেঙ্গালুরুতে (আগেকার ব্যাঙ্গালোর) ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে এবং রিলেতে সোনার পদক জয় করলেন আরতি।

১৯৫৮ সাল। আরতি তখন সাঁতারু হিসেবে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। ক্রীড়া জগতে তখনই তিনি ‘জলের প্রজাপতি’ নামে খ্যাত। তখনকার ইংলিশ চ্যানেল জয়ী সাঁতারু ব্রজেন দাসকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে ইংলিশ চ্যানেল পার হবার জন্য তিনি ভারতের মহিলা সাঁতারু হিসেবে কাকে উপযুক্ত বলে মনে করেন, তখন তিনি আরতি সাহার নাম বলেন। 

শুরু হল আরতির ইংলিশ চ্যানেল জয়ের প্রস্তুতি। প্রতিদিন টানা আটঘণ্টা করে কঠোর অনুশীলন শুরু করলেন। ইংলিশ চ্যানেল জয়ী সাঁতারু মিহির সেন এবং ব্রজেন দাস তাকে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত করেছিলেন। কিন্তু ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়া, যাওয়া আসার খরচ আর অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় কুড়ি হাজার টাকা লাগবে। সেই টাকা তিনি কোথা থেকে পাবেন? সেই সময় তিনি রেলে চাকরি করতেন এবং মাইনা পেতেন একশো বেয়াল্লিশ টাকা। আর্থিক সাহায্যের জন্য গেলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের কাছে। বিধান রায় আরতির কথা শুনে বললেন “ইংলিশ চ্যানেল চোখে দেখেছ পার হবে যে বলছ?” পরে অবশ্য হাসিমুখে বলেন “কোনো চিন্তা করো না, টাকা কাল সকালে তোমার বাড়িতে পৌঁছে যাবে”… তিনি বাড়িয়ে দিলেন সাহায্যের হাত। সাহায্য করেছিলেন মিহির সেন, অতুল্য ঘোষ এবং স্বয়ং জওহরলাল নেহেরুও।

আরতি সাহার সম্মানে প্রকাশিত ডাকটিকিট (ছবি সৌজন্যে – ভারতীয় ডাক বিভাগ)

তারপর সেই দিনটি এলো…২৭ আগস্ট ১৯৫৯.. ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার লক্ষ্যে সাঁতার শুরু করলেন আরতি। কিন্তু প্রথমবার সফল হননি তিনি। তাতে কি! ভেঙে পড়ার মানুষ তো তিনি নন। দ্বিতীয়বার আবার জলে নামলেন। টানা ১৬ ঘন্টা ২০ মিনিট সাঁতার কেটে অতিক্রম করলেন ৬৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলপথ। জয় করলেন ইংলিশ চ্যানেল। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম উঠে গেলো তাঁর… প্রথম এশিয়ান ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী মহিলা সাঁতারু আরতি সাহা। ১৯৫৯-এর আজকের দিনে অর্থাৎ ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী হয়েছিলেন। ভারতীয় খেলাধুলার ইতিহাসে সোনার অক্ষরে চিরদিন লেখা থাকবে যেই দিনটির কথা।

আজকের যুগে আমরা ইন্টারনেটের সাহায্যে প্রতিমুহূর্তে জানতে পারি সমুদ্রের ঢেউয়ের গতি, জলের তাপমাত্রা…. কিন্তু আরতি সাহা যখন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন তখন কিন্তু তিনি এই প্রযুক্তির কোন সুবিধাই পাননি। তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়েছিলেন এইভাবে…. “সাঁতার কাটতে কাটতে চোখে পড়ল, পাশ দিয়ে একটা কচ্ছপ ভেসে যাচ্ছে। একবার মনে হচ্ছিল ওর পিঠে চেপে বাকিটা চলে যাই। ঠান্ডায় হাত পা কেটে কেটে যাচ্ছিলো। দশটা জ্বলন্ত উনুন পেটের কাছে ধরলে ভালো হয়”…..

১৯৬০ সালে প্রথম মহিলা ক্রীড়াবিদ হিসেবে পদ্মশ্রী সম্মান লাভ করেছিলেন তিনি। ১৯৯৪-তে মাত্র চুয়ান্ন বছর বয়সে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর কৃতিত্বকে সম্মান জানিয়ে ভারতের ডাকবিভাগ একটা স্ট্যাম্প প্রকাশ করে, যার উপরে ছিল তাঁর ছবি। 

আরতি সাহা জন্মেছিলেন ১৯৪০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। সেই সেপ্টেম্বরেই ২৯ তারিখে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন। যেই সময়ে তিনি এই বিশ্ব রেকর্ড করেছিলেন, সেই সময় শুধু বাংলা কেন পুরো ভারতবর্ষেও মেয়েদের খেলাধুলাটা খুব ভালো চোখে দেখা হতো না। সেই সামাজিক ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে ভারতীয় রক্ষনশীলতার বেড়া ডিঙিয়ে আরতি সাহা যে নজিরবিহীন কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন তার কোনো তুলনাই হয় না। 

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার আর্কাইভ 

Post Tags
Developed by DXDasia