জার্মানির চিঠিঃ স্তব্ধতার গান এবং করোনাক্লান্ত এক সুপারমুন

দেশের সঙ্গে সময়ের ব্যবধান এখন সাড়ে তিন ঘণ্টা, অর্থাৎ বসন্ত এসে গেছে

করোনার করিশ্মা এমনই যে মার্চ মাসের শেষ রবিবার ঘড়ির কাঁটা কখন এক ঘণ্টা এগিয়ে গেল, তা ঠাহর করলাম অনেক পরে। দেশের সঙ্গে সময়ের ব্যবধান এখন সাড়ে তিন ঘণ্টা, অর্থাৎ বসন্ত এসে গেছে। তবে শীতকালের ব্যাটিং এমনই হতাশার যে বরফ খুঁজতে বেরনো আর কলকাতায় পেঙ্গুইন দর্শন সমার্থকপ্রায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই শীতকালকে এবছর অনায়াসেই ফলোঅন করানো যেত। অতএব করোনামুখর বসন্তের আবির্ভাব ম্যাড়ম্যাড়ে খবর। লম্বা লম্বা দিনের ঝলমলে রোদ্দুর, পরিষ্কার নীল আকাশ, সূর্যাস্তের লালিমা আর চন্দ্রিমার বিকিরণ কি আর ব্যাজার খবরগুলো ঢাকতে পারে!

ব্যাজার খবর বলতে দেশ আর বিদেশের পরিস্থিতি গোগ্রাসে গেলা। টোকিও অলিম্পিক বন্ধ, কিন্তু প্রতিদিন সকালে যেন সোনা-রুপোর মেডেললিস্টের সম্ভার। ট্রাম্পেট বাজিয়ে একা নিউইয়র্ক পাল্লা দিচ্ছে তাবড় তাবড় দেশের সঙ্গে। এন্টোনি ফাউচি, টেড্রস আধানম, ইয়েন্স স্পাহ্ন থেকে লভকুমার – সপ্তাহ চারেক আগে যাদের নাম শুনলে গুগল করতে হত, তারাই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এনড্রোয়েড বক্স। প্রিন্স চার্লস কি কণিকাকে সংক্রমিত করলেন নাকি উল্টোটা, এই রহস্য সমাধান করার আগেই বরিস-মার্কেল পড়লেন মেডিকেল খপ্পরে। বংগাই-এর চা-কাকু থেকে হরিবাড়ের জামাতফেরত মৌলবি, সবাই এখন শিরোনামে। শরৎচন্দ্র লকডাউনে থাকলে নির্ঘাত শ্রীকান্ত আরও একটি খণ্ড হয়ে বেরতো এইভাবেই। দৈনন্দিন রুটিনের এই ভোলবদলে বসার ঘরের কাউচের সব চেয়ে বেশি রমরমা। স্কুল নেই, অফিসকাছারি নেই, ভোরের ট্যাক্সি ডাকা নেই, শনিবারের আসর নেই – ঘরের চারটি দেওয়াল আছে, ফ্রিজঠাসা স্টক আছে, অনর্গল ফোন আছে আর করোনার ভয় আছে।

তারই মাঝে আমার সাধের নীল আকাশটা বদলে গেছে। ওটা বেয়ে সাদা ধোঁওয়া লাইন চিরে দিত সারা দিন জুড়ে। একের পর এক। আর ফ্লাইটরাডার অ্যাপটা জানান দিত কে আসছে কোথা থেকে। বলোনিয়া, মিলান, জাগ্রেভ, কায়রো থেকে আকাশের ওই আঁকিবুঁকি এখন বন্ধ। লুফৎহান্সার সাতশো প্লেন স্তব্ধতার গান শুনছে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে, ফ্রান্স জোসেফ স্ট্রাউস এয়ারপোর্টে। আর পয়লা এপ্রিল, ছাঁটাই বাঁচাতে সাতাশি হাজার কর্মীকে আনা হল সরকারি প্রকল্পের আওতায়। গত দশকের আর্থিক মন্দার মরশুমে চালু এই সরকারি বদান্যতায় জমা পড়েছে আরও পাঁচ লাখেরও বেশি নাম এবং আগামীদিনে এই সংখ্যা যে ২০০৯-কে বহুগুণে ছাপিয়ে যাবে সে সন্দেহ কারো নেই।  

দু’সপ্তাহ হল জার্মান এক সহকর্মী অসুস্থ। জ্বর, গলা-ব্যথা নিয়ে অব্যর্থ সিম্পটম। দুদিন পর থেকে মেসেজের জবাব বন্ধ। প্রাইভেসি-সুরক্ষার চক্করে এ মুলুকে অতি উৎসাহ এবং সহৃদয়তা প্রকাশও অবাঞ্ছনীয়। অতএব চিন্তার প্রহর গোনা আর খবরের অপেক্ষা। একদিন আগে জানা গেল, প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে তার সোয়াবটেস্ট স্যাম্পেল জমা পড়েছে অবশেষে। রিপোর্ট নেগেটিভ। আট কোটির দেশে সপ্তাহে তিন লাখ পরীক্ষা সম্ভব, তবু এই লম্বা অপেক্ষা। কারণ, পরীক্ষার প্রাধান্য নিয়ন্ত্রিতভাবে নির্ধারিত। পর্যায়ক্রমে আরও দেড়-দুবছর এই প্যান্ডেমিক লড়াই বাকি, এই পরিকল্পনা নিয়েই জার্মানি পরিকাঠামো সাশ্রয় করে এগোচ্ছে।

আর নিজেদের জন্য নয়, বিশ্বের জন্যও এগোচ্ছে। পেনয্‌বার্গ থেকে। মিউনিখের দক্ষিণে যে স্টারনবার্গে ইউরোপের প্রথম করোনা হাজির হয় জানুয়ারিতে, তার কুড়ি কিলোমিটার আরও দক্ষিণে, পেনয্‌বার্গ। করোনার রোষনিরাময়ে অক্লান্ত চলছে রোশ ফার্মা-র এই কারখানা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তৈরি হয়েছে করোনা সনাক্তকরণের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি। চব্বিশ ঘণ্টায় সর্বাধিক চার হাজার পরীক্ষা ক্ষমতাসম্পন্ন রোশের মেশিন ট্রাম্পের ততধিক তৎপরতায় অনুমোদন করেছে এফডিএ। আর, প্লাসেবো ট্রিটমেন্ট মারফত টসিলিজুমাব নামক এক ফর্মুলাও রোশ-এর অন্য করোনা হাতিয়ার।

রবার্ট কখ বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁকেই অন্তর্বর্তী চ্যান্সেলর করা হত। দেশটি আদতে চলছে তাঁরই নামাঙ্কিত ইন্সটিটিউটের তত্ত্বাবোধনে, লকডাউনের আগে থেকেই। একদম বেকেনবাউয়ারের বিশ্বকাপ জয়ী দলটার মতো। স্কিলের চটক নয়, সুনির্ধারিত চালই যেখানে শেষ কথা। একলক্ষ তিরিশ হাজার সংক্রমণ নিয়েও যেখানে লোথার মাথিয়াস এখনো পেনাল্টি বক্সের দোরগোড়া থেকেই বল ক্লিয়ার করে যাচ্ছে। তাই জার্মান মৃত্যুহার কম বলে সারা বিশ্বে যতই হইচই হোক না কেন, এত বিশাল সংক্রমণেও পঞ্চাশ শতাংশকে সুস্থ করে ফেলার সিক্রেট সসটি কি সেটি বেশি আলোচ্য বিষয় হওয়া প্রয়োজন! মাত্র ২৫,০০০ হাজার ক্রিটিকালকেয়ার বেডের রিসার্ভবেঞ্চ নিয়েও যেখানে পাঠাতে হয়েছে স্রেফ ১১,০০০ জনকে। মানে একের পর এক আছড়ে পড়া করোনা আক্রমণেও জার্মান ডিফেন্স এখনও অটুট।

আত্মতুষ্টির জায়গা নেই, বিলক্ষণ জানে সবাই। সকালের বাজারে তাই ভিড় নেই, নিস্তব্ধ সুপারমার্কেটে টুংটাং আওয়াজ কেবল ট্রলির। সবজিদ্রব্য এখনও ইটালি থেকেই আসছে, ফলমূল বেশিরভাগ স্পেন কিংবা ল্যাটিন আমেরিকা থেকে। সকাল সাতটা থেকেই যে অটোবানে গাড়ির মিছিল ওয়েস্টপার্কের পাস দিয়ে শহরে ঢুকত সেখানে নামমাত্র গতিবিধি। তাও বেশিরভাগই এই পণ্যবাহী ট্রাক। এখন কবে আবার সেই গাড়ির ভিড় আউডি, মের্ক আর বিএমওয়ের বন্ধ গেটগুলি পেরিয়ে ঢুকবে তারই অপেক্ষা সবার।

কথা আছে ঈস্টারের ছুটি অবধি সব বন্ধ। আগামী সপ্তাহ থেকে কী হওয়া উচিত তাই নিয়ে তোড়জোড় শুরু। জনতার সুরক্ষা নাকি অর্থনৈতিক ক্ষতি, সেই নিয়ে যখন সরকার জেরবার, তারই মাঝে জনতার শৃঙ্খলা যেন শিথিল হতে শুরু করেছে। ঈস্টার উইকেন্ডে সামার আবহাওয়ায় সাইকেলওয়ালাদের প্রচুর আনাগোনা যেন তারই প্রতিফলন।   

এসবের মাঝেই সুপারমুন পেরিয়ে গেল। থালার মতো বড়ো চাঁদটা রুমান্ডির জঙ্গল ছেড়ে ওয়েস্টপার্কের ফাঁক দিয়ে উঠল। ঠিক রাত আটটা চুয়াল্লিশে। উল্টো আকাশে তখন দিনের শেষ আলো। এরপর তরতর করে গাছপালা বেয়ে তার লাল রং খসে অকলঙ্ক সাদা হবে। বুদ্ধদেব গুহর বিবরণ মিলবে কিনা প্রত্যক্ষের অপেক্ষায় একাকি আমি, আর অটোবানের একটিমাত্র গাড়ি।

আকাশে চাঁদ ছিল। আজই বোধহয় পূর্ণিমা। একটা হলুদ থালার মতো চাঁদ পাহাড়ের মাথা বেয়ে পত্রবিরল শালবনের পটভূমিতে গ্রীষ্মসন্ধ্যায় ধীরে ধীরে আকাশ বেয়ে উঠতে লাগল। নীল, নীল, নীল আকাশে। আর সেই ঘন নীলে তার হলুদ রং ঝরে গিয়ে অকলঙ্ক সাদা হল। সমস্ত জঙ্গল পাহাড় হাসতে লাগল। সেই হাসিতে একটি খেয়ালি হাওয়া ঝুরু ঝুরু করে শুকনো পাতা উড়িয়ে নিয়ে নাচতে লাগল। চাঁদনী রাতে জঙ্গল পাহাড় সুহাগী নদী, প্রত্যেকে এমন এক মোহময়ী রূপ নিল যে, মনে হল এরা সেই দিনের আলোর জঙ্গল পাহাড় কি নদী নয়। এরা অন্য কেউ। 

করোনাক্লান্ত এই সুপারমুন কিন্তু এবার অনেকটাই ম্লান।

Developed by DXDasia