জার্মানি থেকে লিখছেন শৈবাল গিরি, আজ দ্বিতীয় পর্ব
খোলা ইউরোপের বন্ধ সীমান্ত
৮৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশ জার্মানি। এই সংখ্যা ইউরোপের অন্য দেশগুলোর থেকে বেশি তো বটেই, মহামারির প্রকোপে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইতালি, স্পেন এবং ফ্রান্সের জনঘনত্বকেও তা ছাড়িয়ে গিয়েছে। আরও ভয়াবহ তথ্য, এখানে জনসংখ্যার ২১ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের ওপরে। এঁদের রক্ষা করার চ্যালেঞ্জও জার্মানির বেশি। যদি পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা যায়, জার্মানির থেকে এই রাজ্যে জনসংখ্যার আধিক্য ৪০ শতাংশ। তবে, ৬৫-ঊর্দ্ধ মানুষ পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৮ মিলিয়নের কাছাকাছি, অন্যদিকে প্রায় ১৮ মিলিয়ন জার্মানিতে। এমন পরিসংখ্যানই সেই দেশকে করোনা সংক্রমণের অনুকূল করে তুলেছে।
রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট যখন অ্যাঞ্জেলা মার্কেলকে ভয়াবহতার আভাস দিয়েছিল, তিনি আগেভাগেই খারাপ খবরটা সবাইকে দিয়ে দেন – জার্মানির ৭০ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। একমাত্র উপায় সেই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আটকানো এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ভরসা রাখা। সপ্তাহখানেক পর টিভিতে তাঁর জাতীয় সম্প্রচার অনুষ্ঠানে বললেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে এমন সংকট কখনও আসেনি”। টিভিতে এভাবে তাঁকে খুব বেশি দেখা যায় না। মার্কেল বেড়ে উঠেছেন পূর্ব জার্মানির পাঁচিলের মধ্যে। ২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের মোকাবিলা করেছেন। সমালোচনার পরোয়া না করে সামলেছেন শরনার্থী সমস্যা। তিনি এই কথা বলার অর্থ, এবারে শত্রু আকারে অনেক ছোটো। কিন্তু তাকে পরাজিত করা অনেকটা ১৯৮৭ সালের ছবিতে পিডেটরদের পিছনে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের ধাওয়া করার মতোই।
ইতালিতে লকডাউন হওয়ার পরে আমি করোনায় আক্রান্তদের সংখ্যা আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে থাকি। ততদিনে চিন দেশে লকডাউনের ৫ সপ্তাহ পেরিয়ে গিয়েছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তখনও করোনাকে বিশ্ব মহামারি ঘোষণা করেনি। ইউরোপের বাকি অংশ শান্ত, তবে, মার্চের প্রথম সপ্তাহে ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েকশো ছুঁয়েছে। ভারত কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই হোলিতে মাতল। এমনকি সেই উৎসবে সামিল হয়েছিল এমন সব দেশে বাস করা ভারতীয়রা, যেখানে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। তার ঠিক দু’সপ্তাহ পরেই জার্মানি লক ডাউনের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। ভারতে শুরু হল ২১ দিনের সম্পূর্ণ লকডাউন। পরিসংখ্যান মানুষকে বোকা বানালো আবারও। শুরুর দিকে বাস্তবতাকে যতটা আঁচ করা যায়, পরের ধাপের সংক্রমণে পরিসংখ্যান আর সেরকম থাকে না। কারণ, সংক্রমণ ওই সময়ে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়, পাটিগণিতের হারে নয়। ইতালি, ইরান এবং ফ্রান্সের ক্ষেত্রেও একই ভুল হয়েছিল।

সামাজিক দূরত্ব
ইতালির দিকে তাকানো যাক। সেখানে একান্নবর্তী পরিবার দেখা যায় এখনও। তিন প্রজন্ম কাটিয়ে দেয় একই ছাদের তলায়। ভারতের সঙ্গে খানিকটা তুলনা হতে পারে। তবে মারিও পুজোর উপন্যাসে যেমন দেখি, ভিতো করলিওন একটা লম্বা টেবিলের সামনে বসে পরিবারের সঙ্গে নৈশভোজ করছেন, সেটা ভারতে এখন নেই। আমার এক সহকর্মী প্রত্যেক সপ্তাহের শেষে অসুস্থ বাবাকে দেখতে সুইজারল্যান্ডের তিসিনো থেকে ইতালির বারি শহরে যায়। এরকম নিবিড় সামাজিক বন্ধন এবং শুরুর দিকে করোনার প্রতি অবহেলা – এই দু’টো কারণে ইতালি এখন মহামারির শিকার।
অন্যদিকে জার্মানিতে নবীন এবং প্রবীণরা আলাদা থাকতেই ভালোবাসেন। এদেশের প্রাণচ্ছলতা এবং সরকারি স্বাস্থ্যবিধি প্রবীণদের আত্মনির্ভর করে তুলেছে। আমার পাশের বাড়ির ৭৮ বছরের বৃদ্ধ প্রতিবেশী এখনও বাগান এবং ঘর গোছানোর কাছে অনেকটা সময় কাটান, যা আমাদের বাড়ির দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের থেকে বেশিই। অন্য যে কোনো জায়গার থেকে সামাজিক দূরত্ব এখানে গভীরতর। গণপরিবহনে ফাঁকা সিট এখানে কেউ দখল করে না, বয়স্কদের আরও স্পেস দেওয়ার জন্য। জার্মানিতে প্রবীণদের এরকমই সম্মান।

সবার জন্য প্রার্থনা
এটা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, জার্মানিতে কেন ৩২ হাজারেরও বেশি করোনা আক্রান্ত মানুষের বয়স ৪৬-এর আশেপাশে। এখনও সেভাবে প্রবীণদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ায়নি। সংকটাপন্ন অবস্থা এখন পর্যন্ত ২৩ জনের। মৃত্যুর সংখ্যা ৩ অংকের নিচের দিকেই।
জার্মানি দাবি করে যে তারা প্রতি সপ্তাহে ১ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করতে সক্ষম। এর ফলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়েছে। জলদি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য। সরকারি হিসেব অনুযায়ী মাত্র ২৫ হাজার আইসিইউ রয়েছে সারা দেশে। আক্রান্তের সংখ্যা তার বেশি। প্রাথমিক স্তরে ভাইরাসের গতি রোধ করাই এখন লক্ষ্য। আইসিইউ-র প্রয়োজন এই মুহূর্তে সেরকম নেই। এটাই আপাতত সফল স্ট্র্যাটেজি। তবে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।

সবার জন্য প্রার্থনা
আধুনিক অণুজীববিদ্যার অন্যতম দিশারীর নামাংকিত প্রতিষ্ঠান রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট জার্মানির মানুষদের সুস্থ রাখতে অনবরত পরিশ্রম করে চলেছে। এই দেশ যদিও সুস্থায়ী কাজের অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস রাখে, তবে কখের মূলনীতিগুলোর একটি সফলভাবে কার্যকরী হচ্ছে এখানে – ‘অর্জিত অনাক্রমণতা’।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে এমন সংকট হয়তো কখনও আসেনি। কিন্তু এবার জার্মানি নিজেকে কোনোভাবেই সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হতে দেবে না।