
তাঁদের সেবার উদ্যোগকে বিন্দুমাত্র ছোটো না করেও এই প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে
গতবছর রাজ্যজুড়ে যখন করোনার তাণ্ডব চলছে সেই সময়ে সিপিআইএম প্রভাবিত ছাত্র-যুব সংগঠন বিশেষ জনসেবার উদ্যোগ নিয়েছিল। ভ্যাকসিনের বা অক্সিজেনের আকালের সময়েও তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে সাধারণ মানুষকে কিছুটা নিরাপত্তা দেবার। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে খাবার দাবারের ব্যবস্থাও তারা করেছিল।
সেই কাজ করার সময়ে তারা কোনো রাজনৈতিক পরিচিতিকে প্রাধান্য দেয়নি। এমনকী একজন বিজেপি বিধায়ককে তারা চিকিৎসার জন্য যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। এই ধরনের সেবাকর্ম অবশ্যই বিশেষ প্রসংশার দাবি রাখে। পাশাপশি তারা ইদানিং সরকারি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের আবেদনপত্র পূরণ করে দিয়েও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। সুখের কথা এইসব কাজের বিনিময়ে তারা কোনো পারিশ্রমিক দাবি করেনি। সংবাদপত্রের পাতায় এবং টিভি চ্যানেলগুলিতেও এইসব বিষয়ে কিছু প্রতিবেদন অনেকের চোখেই ধরা পড়েছে।
কিন্তু কথা হলো, এই রাজ্যে যে ২৯৬টি বিধানসভা কেন্দ্র আছে, যে ১৩ কোটি মানুষ সেইসব কেন্দ্রে বসবাস করে তাঁদের কতজনের কাছে তাঁরা পৌঁছতে পেরেছেন? ১৩ কোটি মানুষই যে এই সরকারি উদ্যোগের সেবাপ্রার্থী তা হয়তো নয়। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য আছে তাঁরা সেবা সহজেই আদায় করতে পারেন। বিকল্প সেবা মূলত অসহায় মানুষের দরজায় পৌঁছনো দরকার। সেইরকম কোনো মানচিত্র তৈরি করে তাঁরা কি এইসব কাজে নেমেছিলেন?
আরও পড়ুন: বাংলার ভোটে বাঙালির ঐতিহাসিক ভূমিকা
তাঁরা কি পরিষ্কার পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাতে পেরেছেন যে কত মানুষের দরজায় তাঁরা হাজির হয়েছেন? মিডিয়ায় ছবি বেরোনো কোনো অসঙ্গত কাজ নয়। কিন্তু তাতে কোনো প্রকৃত ভাবমূর্তি তৈরি হয় না।
তাঁদের সেবার উদ্যোগকে বিন্দুমাত্র ছোটো না করেও এই প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে। কারণ রাজ্যের ২৯৪টি কেন্দ্রে বাম-কংগ্রেস-সিদ্দিকী জোট বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছিল। প্রায় ২৯৩টি আসনে তাঁরা পরাজিত হয়েছেন এবং অন্তত ২৫০ আসনে তাঁদের জমানত জব্দ হয়েছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও কিছু আসনে এই জোট বন্ধুত্বপূর্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বোধ উদ্যোগ নিয়েছিল।
এমন ভরাডুবির পরেও যেসব তরুণ-তরুণীরা বামপন্থায় আস্থা রেখেছেন, তাঁদের সাধুবাদ জানিয়েও কিছু অপ্রিয় প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে। দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে এই রাজ্যের যে রাজনৈতিক ইতিহাস তাতে বামপন্থীরা কোনোদিনই এমন রিক্তহস্ত হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেছেন বামেরা শূন্য হয়ে যাক, সেটা তিনিও চাননি। আজ যাঁরা ভরাডুবির পরেও ওই পন্থায় আস্থা রেখেছেন বিষয়গুলি তাঁদেরই বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত।
সারা রাজ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যাঁরা সক্রিয় কর্মী তাঁদের থেকে বহুগুণ বেশি হলেন দলবহির্ভূত মানুষেরা। তাঁদের আস্থা অর্জন করাটাই এই সময়ে সবচেয়ে বড়ো কাজ। সেই কারণেই ভলেন্টিয়ারের আগে ‘রেড’ শব্দটি বসানো তাঁদের দিক থেকে সুবিবেচনার কাজ হয়নি। হয়তো দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশেই তাঁরা এমন কাজ করেছেন। কিন্তু অতীতের ইতিহাস সেই কথায় সায় দেয় না। চল্লিশের দশকে বাংলায় মন্বন্তর বা দাঙ্গার দিনগুলিতে দুটি সংগঠন- পিপলস রিলিফ কমিটি এবং মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি সেবামূলক কাজে গৌরবজনক ভূমিকা নিয়েছিল। রিলিফ কমিটির মঞ্চে চিকিৎসক হিসেবে বিধান রায়ও আসতেন। সেই কমিটির উদ্যোগেই রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের প্রথম সংক্ষিপ্ত প্রযোজনা মঞ্চস্থ হয়। সেখানে নন্দিনীর ভূমিকায় ছিলেন কণিকা মজুমদার, বিশু পাগল- দেবব্রত বিশ্বাস এবং রাজা- শম্ভু মিত্র।
দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে একটাই শ্রমিক সংগঠন ছিল ‘এআইটিইউসি’। কংগ্রেস নেতা পিভি গিরি এবং কমিউনিস্ট নেতা এস এ দাঙ্গে একইসঙ্গে সেই সংগঠন গড়েছিলেন। কৃষকসভায় ছিলেন সহজানন্দ সরস্বতী। প্রগতি লেখক সংঘে মুন্সি প্রেমচাঁদ। সারা দেশে ছাত্রদেরও একটাই সংগঠন ছিল এআইএসএফ। সারা দেশে একছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে কংগ্রেস দল এই গণসংগঠনগুলিকে ভাঙতে শুরু করে। অল্প দিনের মধ্যেই সেই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় বাম দলগুলিও। তখন বামেরাও চাইলো আগে দলীয় পরিচিতি এবং পরে গণসংগঠন। তার ফলে বিগত ৭৫ বছরে শ্রমিক কৃষক ছাত্রদের এইসব সংগঠন বিবৃতি সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সেই তালিকায় একদিন চলে এলো আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতিও (এবিটিএ)।
এই পর্ব যখন শেষ হলো তখনই দেখা দিল ব্যাধির দ্বিতীয় উপসর্গ, যার নাম দলের মধ্যে গোষ্ঠী আনুগত্য। কিন্তু সংগঠনে যখন বৃত্তের মধ্যে ক্ষুদ্রতর বৃত্ত তৈরি হতে থাকে, তখনই দল মানুষ থেকে বিছিন্ন হয়। বর্তমানে দেশে এমন একটিও রাজনৈতিক সংগঠন নেই, যেখানে গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের রমরমা অনুপস্থিত। কিন্তু বামপন্থায় যাঁরা বিশ্বাসী তাঁদের স্বপ্নময় আদর্শ অনেক দূর প্রসারী। সময়ের সঙ্গে তাল মেলানোর নামে উলটো হাওয়ায় সামিল হওয়া তাঁদের সাজে না।
বামপন্থার তাত্ত্বিক আশ্রয় মার্কসবাদে। বিশ শতকে তাঁর বাস্তব প্রয়োগের সূচনা রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। শতাব্দির শেষে সেই দেশ থেকে লাল পতাকা নেমে গেছে। কিন্তু তাতে মার্কসবাদ বাতিল হয়ে যায়নি। বিশ শতকে মার্কসবাদের অনেক ‘মেড ইজি’ বেরিয়েছে যার আরেক নাম ‘খণ্ডিত মার্কসবাদ’। মার্কস রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে বলেছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতাকে উচ্ছেদ করার জন্য। কিন্তু তথাকথিত সমাজতন্ত্রী দেশগুলিতে সেই কাঠামো ক্রমাগত শক্তিমান হয়েছে এবং আজও হচ্ছে।
লেলিনের জীবদ্দশাতেই স্তালিন-ট্রটস্কি-বুখারিনরা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেছিলেন। বাম জমানায় এই রাজ্যের জেলায় জেলায় তেমন দ্বন্দ্বমুখর নেতাদের খুঁজে পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
স্তালিন মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই প্রিয় পাত্র ক্রুশ্চেভ-বুলগারিন ক্ষমতায় এসে তাঁর মুণ্ডপাত করেছিলেন। কিন্তু স্তালিন যেসব নিন্দনীয় আইন এসে বলবৎ করেছিলেন তার একটিও তাঁরা প্রত্যাহার করেননি। আজও নাম বদলিয়ে সেইসব আইন জারি রেখেছে পুতিন। এই রাজ্যেও ২০০৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে বামেদের যে পিছু হটা শুরু হয়, সেই পতনের মুখে দাঁড়িয়ে কোনো বামদল সরাসরি একথা বলতে পারেনি যে তাঁরা কতগুলি ভালো কাজ করেছেন এবং কোথায় কোথায় তাঁদের গুরুতর ভুল ছিল। এই দুই তালিকা সমান মর্যাদায় তুলে ধরতে পারলেই পরিস্থিতি অন্যখাতে বইতে শুরু করতো।
এই অবস্থায় যে তরুণ সমাজ আজও বামপন্থায় আস্থা রাখছেন, তাঁদের সামনে পর্বত প্রমাণ দায় এবং প্রবল প্রতিবন্ধকতা অপেক্ষা করছে। সেখানে একমাত্র ভরসা হল জনশক্তি। সেটা নির্বাচন হোক বা ভিন্নতর বিপ্লব ভাবনা হোক, মানুষকে বাদ দিয়ে কোনো যজ্ঞই সফল হওয়ার নয়।
তার জন্য প্রথম কাজ হলো, গণসংগঠনের মধ্যে বহুমতকে ঠাঁই দেওয়া। কেবল শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুবর বাঁধা গত নয়। তার বাইরে অনেকরকমের মানুষ আছে। বিজ্ঞান চেতনা, পরিবেশ চেতনার পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির দরজায়ও আবেদন রাখা দরকার। কারণ বর্তমানে ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্ম আর জাতপাতই হলো সবচেয়ে বড়ো পুঁজি।
বাম জমানাতেই ঐতিহ্যমণ্ডিত পিপলস রিলিফ কমিটি হীনবল হতে শুরু করে। অনেকে হয়তো মনে করতেন সরকারই সব কাজ করে দেবে। বাম জমানায় রাজ্য জুড়ে মহিলাদের যেসব সয়ম্বভর গোষ্ঠী তৈরি হয়, বামেরা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেগুলিও বিলীন হয়ে গেল। ষাট-সত্তরের দশকে পল্লব সেনগুপ্তরা (সিপিআই) সাক্ষরতা প্রকাশনা শুরু করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘দিনের আলো দেখেছিল’। কিন্তু সেই সংগঠন এখন অস্তিত্বহীন। বিমান বসুর নেতৃত্বে সাক্ষরতার নতুন অভিযান এবং বিদ্যাসাগর মেলা শুরু হয়। কিন্তু বাম সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিগত এক দশকে তাঁদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিজ্ঞানমঞ্চ সারা রাজ্য জুড়ে অনেক নিবিড় অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু দাভোলকর, গোবিন্দ পানেসর বা গৌরি লঙ্কেশ শহীদ হওয়ার পর, যে চ্যালেঞ্জ তাদের গ্রহণ করা উচিত ছিল সেটা তাঁরা নিতে পারেননি।
আসলে এইসব সেবামূলক সংগঠন যদি কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের পরিচিতিকে অবিভাজ্য করে তোলে, তাহলে ভোটের হাওয়া উলটে গেলে তাদের অস্তিত্ব রক্ষাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃতপক্ষে এই জাতীয় সংগঠনগুলির প্রয়োজনীয়তা অনেক সুদূরপ্রসারী। সাময়িক লাভালাভের সঙ্গে তাদের জড়ানো উচিত নয়।
একটি দেশে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এক এক ধরনের সংগঠনের প্রয়োজন হয়। মানব শরীরের মতোই একদিন সেই সংগঠন জ্বরাগ্রস্থ হয়। তখন আবার নতুন আয়োজন দরকার। কার্ল মার্কস কোনোদিন শেষ কথার দাবিদার হননি। তিনি বলেছেন, চলমান সময়ের মধ্যেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সেই দ্বন্দ্বই নতুন বিকাশের রাস্তা তৈরি করে ইতিবাচক পরিণতির দিকে।
এই রাজ্যের কথায় ফিরে আসা যাক। বিগত ৭৫ বছরের রাজ্য রাজনীতির ইতিহাস বলছে যে ক্ষমতাসীন দল এখানে একবার ভোটে হেরে যায়, তারা আর একই চেহারায় ক্ষমতায় ফিরে আসে না। নতুন দলের নেতৃত্ব, দলীয় প্রতীক এবং পতাকা সবই বদলাতে হয়। তরুণ কমরেডরা সেই পাহাড় ডিঙোতে পারলে অনেকেই খুশি হবে।
*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজের।
