
তৃণমূলের জনগর্জন সভার রিপোর্ট কার্ড
ব্রিগেডের সভা (তৃণমূলের জনগর্জন সভা) থেকে তৃণমূলে লোকসভা ভোটের ৪২ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে ভোট-প্রচারের চমক এবং ঔজ্জ্বল্যে বিজেপির থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে খানিকটা এগিয়েই রাখলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রবিবারের ব্রিগেড মঞ্চ (TMC Brigade 2024) থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিলেন, বিরোধীদের তোলা দুর্নীতি ইস্যুকে তিনি ‘বাংলার প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনা’ এবং ‘বহিরাগত’ — এই দুটি বিষয়ে ঘুরিয়ে দিতে চান প্রচারের জোরে। ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে সহজ ভাষায় মমতা আওয়াজ তুলেছেন, কেন্দ্র কাজ করিয়ে গরিব মানুষের টাকা মেরে দিয়েছে। বাস্তব ঘটনা হল, দুর্নীতি যদি হয়েও থাকে, তাকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু যে গরিব মানুষ ১০০ দিনের প্রকল্পে কাজ করেছেন, তাদের টাকা না দিয়ে বিজেপি খুব একটা রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছে এমন কথা বলা যাবে না। আর এই ইস্যু ঘুরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে মমতার যে পরিমাণ দক্ষতা, বিরোধীরা তার ধারে কাছেও নেই।

লোকসভা ভোটের প্রার্থীদের নিয়ে র্যাম্পে হাঁটছেন মুখ্যমন্ত্রী
দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য যেখানে ভোট হয় না, ভোট করাতে হয়। আর তা করাতে গেলে সংগঠন প্রয়োজন। এই জায়গায় বিজেপি এখনও অনেকটাই পিছিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে। প্রায় দু’সপ্তাহ সময়ের মধ্যে একটা ব্রিগেড ডেকে এবং তা সফল করে, রবিবার তৃণমূল কংগ্রেস এটাও বুঝিয়ে দিল, ধাক্কা খেলেও জেলায় জেলায় তাদের সংগঠনে এখনও জং ধরেনি।
রবিবারের ব্রিগেড মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিলেন, বিরোধীদের তোলা দুর্নীতি ইস্যুকে তিনি ‘বাংলার প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনা’ এবং ‘বহিরাগত’ — এই দুটি বিষয়ে ঘুরিয়ে দিতে চান প্রচারের জোরে। ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে সহজ ভাষায় মমতা আওয়াজ তুলেছেন, কেন্দ্র কাজ করিয়ে গরিব মানুষের টাকা মেরে দিয়েছে।
পার্থ, মানিক, জ্যোতিপ্রিয়র মতো নেতাদের কারাবাস এবং সন্দেশখালির ধাক্কায় তৃণমূল কংগ্রেসের শরীরে যে রাজনৈতিক দারিদ্র প্রকট হয়ে উঠেছিল, রবিবারের ব্রিগেড তার অনেকটাই ঢেকে দিয়ে দলকে এক ধাক্কায় ফার্স্ট গিয়ার থেকে ফোর্থ গিয়ারে নিয়ে চলে গেলেন মমতা। এখন আগামী দু’মাস এই গতি ধরে রাখাটাই হবে মমতার রাজনীতি। কতটা পারবেন, সময় বলবে। পশ্চিমবঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর প্রস্তাবিত ৩৫টি সভা করার প্রস্তুতিই বলে দিচ্ছে বিজেপি তার ৩৭০ আসনের টার্গেট পূরণ করতে কতটা সক্রিয় হবে এই বঙ্গে। সম্ভবত এবারের এই অষ্টাদশ লোকসভা ভোটেই জীবনের সব থেকে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে চলেছেন মমতা।

লোকসভা ২০২৪-এ তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা
নরেন্দ্র মোদী যেমন টানা তিন বছর প্রধানমন্ত্রী। দেশের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এরও এটা থার্ড টার্ম চলছে পশ্চিমবঙ্গে। আর দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে অ্যান্টি ইনকামবেন্সি বা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা অবধারিত। ২০১১-তে ক্ষমতায় আসার পর, নারদা দিয়ে শুরু করে ২০১৬ থেকেই বিজেপি সহ অন্য বিরোধী দলগুলি তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একের পর এক আর্থিক দুর্নীতিকে ইস্যু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সফল হয়নি। সিবিআই, ইডি, এসএফআইও, এনআইএ, ইনকাম ট্যাক্স এক জন মহিলা পরিচালিত এই রাজ্য-দলটাকে কার্যত ঘিরে ফেলেছে গত ১৩ বছরে। আর এই সমস্ত বিরোধিতাকে মমতা একাই প্রায় বাঁ হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছেন, পার হয়েছেন একের পর এক নির্বাচন।
একটু ভিন্ন ভাবে হলেও, এই কথা নরেন্দ্র মোদীর ক্ষেত্রেও সত্যি। তাঁর দল বেশ কয়েকটি রাজ্যেও ক্ষমতায়। চূড়ান্ত ব্যর্থ ডিমনিটাইজেশন থেকে শুরু করে অসাংবিধানিক ইলেক্টোরাল বন্ড কি কোনও অসুবিধায় ফেলতে পেরেছে বিজেপির এই বিশ্বগুরুকে? মোটেই না। নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর দলের বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা বিরোধীদের হাতে হাতে। কখনও মণিপুরের নারী নির্যাতন, কখনও ব্রিজভূষণ শরণ সিং-এর কালি, কখনও হাথরস, কখনও ধর্ষণকারীদের মুক্তি দিয়ে তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়া — এমন দৃষ্টান্তের শেষ নেই। কিন্তু প্রচারের দক্ষতায় এবং বিরোধীদের দুর্বলতায় এই সব ঘটনা বিজেপির ভোটকে সেভাবে প্রভাবিত করতে পারছে না। বিজেপি এখন এর নাম দিয়েছে ‘প্রো-ইনকামবেন্সি’।
তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও কিন্তু বিরোধীদের চার্জশিট খুবই দীর্ঘ। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে গরু-কয়লা, কী নেই সেই তালিকায়! কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক দক্ষতায় পঞ্চায়েত, বিধানসভা, লোকসভার একের পর এক ভোটে জিতে নির্বাচন কমিশনের থেকে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে চলেছেন। বিপুল অর্থ ভাণ্ডার সহ মোদী-শাহের যৌথ প্রয়াসও ২০২১-এ টলাতে পারেনি মমতার সিংহাসন। দুর্নীতির আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘কোরাপশন ইনডেক্স’-এ ভারতের স্থান বরাবরই তলানিতে ছিল, নরেন্দ্র মোদীর আমলে তা আরও তলানিতে পৌঁছে গিয়েছে। তবে এটা ঠিক, কাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে কাদের বিরুদ্ধে হবে না, সেই সিদ্ধান্ত এখন মোদী যুগে একশো ভাগ রাজনৈতিক হয়ে গিয়েছে। যে কারণে ওয়াশিং মেশিন এখন একটি রাজনৈতিক শব্দে পরিণত। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে ভোটে জেতে হচ্ছে তৃণমূলকে। নরেন্দ্র মোদী জনসভা থেকে ডাক দিয়েছেন ৪২-এ ৪২-এর। মমতা যদি বিজেপির আসন ১৮ থেকে একটি কমিয়ে ১৭ তে-ও নামাতে পারেন, সেটা তৃণমূল কংগ্রেসের মনোবল যতটা না বাড়াবে তার থেকে অনেক বেশি অস্বস্তিতে ফেলবে নরেন্দ্র মোদীকে। আর যদি বিজেপির আসন ১৮ থেকে বেশ খানিকটা বেড়ে যায়, তখন কিন্তু অন্য খেলা শুরু হয়ে যাবে। যে খেলা মহারাষ্ট্রে, মধ্যপ্রদেশে, কর্নাটকে সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গিয়েছে।

এই প্রথম ব্রিগেডের জনসভায় এমন ভাবে মঞ্চ নির্মিত হল
৪২ জনের মধ্যে ১২ জন অর্থাৎ ২৬ শতাংশ মহিলা প্রার্থী দিয়ে তৃণমূল এই ক্ষেত্রে এবারও একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করল। মনে রাখতে হবে ২০১৯-এ পশ্চিমবঙ্গে যত ভোটার ভোট দিয়েছেন তার মধ্যে পুরুষদের থেকে মহিলা ভোটার ছিলেন বেশি। পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯-এর সপ্তদশ লোকসভা ভোটে ৮১.৩৫ শতাংশ পুরুষ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। মহিলা ভোটার যারা ভোট দিয়েছিলেন সেই অঙ্কটা ছিল মোট মহিলা ভোটারের ৮১.৭৯ শতাংশ।
তৃণমূল কংগ্রেস এখনও ইন্ডিয়া জোটে আছে কিনা তা অস্পষ্ট। কিন্তু রবিবার ব্রিগেডের সভা থেকে ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের সম্পর্কে মমতা কার্যত নীরবই ছিলেন। তাতে যে রাজনৈতিক ইঙ্গিত রয়েছে তা আগামী কয়েক সপ্তাহে অর্থবহ হয়ে ওঠে কিনা তা অবশ্য এখনই বলা কঠিন।
_____
শুভাশিস মৈত্র একজন ফ্রিল্যান্স সিনিয়র জার্নালিস্ট। লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে বঙ্গদর্শন.কম সম্পাদকীয় দপ্তরের মতামতের কোনও সম্পর্ক নেই। ছবি সৌজন্যে: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফেসবুক পেজ।
