নতুন কৃষক আন্দোলন কি পদ্ম শিবিরকে ভোটে বিপদে ফেলতে পারে?

এবারের আন্দোলনকে বলা হচ্ছে কৃষক আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব

লোকসভা ভোট ২০২৪ ঘোষণার মাত্র কয়েক সপ্তাহ যখন বাকি, দাবি আদায়ের জন্য কৃষকরা ফের আওয়াজ তুলেছেন দিল্লি চলো। নরেন্দ্র মোদী জমানায় প্রথম কৃষক আন্দোলন হয়েছিল প্রায় আড়াই বছর আগে দিল্লিতে। সেবার প্রায় এক বছর টানা অবস্থান করেছিলেন কৃষকরা। বহু কৃষকের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু কৃষকরা ঘরে ফিরেছিলেন দাবি আদায় করে। এবারের আন্দোলনকে বলা হচ্ছে কৃষক আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব। বড়ো প্রশ্ন একটাই, এই যে ঠিক লোকসভা ভোটের মুখে দ্বিতীয় দফার কৃষক আন্দোলন (Indian Farmers’ Protest 2024) শুরু হল, ভোটে কি তার প্রভাব পড়তে পারে? পড়লে কতটা পড়বে? বিজেপি কি তা নিয়ে চিন্তিত?

কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে পাঁচ দফা আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। আরও আলোচনায় কেন্দ্র আগ্রহী, সে কথা সরকারি ভাবে বলাও হয়েছে। হরিয়ানা সীমান্তে কংক্রিটের স্ল্যাব, কাঁটাতার দিয়ে কৃষকদের দিল্লি অভিযান রোখার চেষ্টা হয়েছে। চলেছে রাবার বুলেট, লাঠি, দ্রোণ থেকে টিয়ার গ্যাসের সেল ফাটিয়ে কৃষকদের গতি রোধ করার। তাতে দিল্লি অভিযানের গতি কমলেও, দমানো যায়নি কৃষকদের। মৃত্যু হয়েছে ২২ বছর বয়সী এক পাঞ্জাবি কৃষকের। পুলিশের গুলিতে এই মৃত্যু বলে দাবি করা হয়েছে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে। এই মৃত্যু আন্দোলনকারী এবং কৃষকদের মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটা।

২০২০-২১-এ কৃষকদের যে আন্দোলন ছিল তার মূল দাবি ছিল তিন বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিল করতে হবে। উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে সেই তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেছিলেন। তবে এবার সেরকম এই মুহূর্তের দাবি নেই কৃষকদের। বরং বলা যায়, তাঁরা তাঁদের পুরোনো দাবি, ২৩টি ফসলের এমএসপি-র (ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের) আইনি গ্যারান্টি দাবি করছেন। এটা ঠিক, আড়াই বছর আগে যে টানা এক বছর ধরে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছিলেন, তার প্রভাব উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটে পড়েছিল খুবই কম। ‘লোকনীতি-সিএসডিএস’-এর সমীক্ষাতেও এই তথ্য উঠে এসেছে। সেই ভোটে উত্তরপ্রদেশে বিরাট জয় হয়েছিল বিজেপির। এর কারণ সম্ভবত, উত্তরপ্রদেশের ভোটে হিন্দুত্ব বিষয়টিকে মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক বিষয়ের থেকে অনেক বড়ো করে নির্বাচনে ব্যবহার করতে সফল হয়েছিল বিজেপি। যদিও উত্তরপ্রদেশের সঙ্গেই ভোট হওয়া শিখপ্রধান পাঞ্জাবে, হিন্দুত্ব ইস্যুকে উত্তরপ্রদেশের মতো করে ব্যবহার করতে পারেনি বিজেপি। যেমন দক্ষিণ পাঞ্জাবের মালোয়া অঞ্চল। টানা এক বছর ধরে মালোয়া ছিল কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আপ কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিল। মালোয়া অঞ্চলে ৬৯টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৬৬টি জিতেছিল আপ। পাঞ্জাবে ক্ষমতাতেও আসে আপ।

এবারের কৃষক আন্দোলনে এমন অনেক মুখ আর দেখা যাচ্ছে না যাঁরা প্রথম আন্দোলনে ছিলেন প্রথম সারিতে। যেমন রাজেশ টিকায়েত, যোগেন্দ্র যাদব, গুরনাম সিং চুড়ানির নাম এই ক্ষেত্রে করা যেতে পারে। তবে আন্দোলনরত কৃষকদের একজনের মৃত্যু পুরোনো নেতাদের আবার পথে নামায় কিনা সেটা অবশ্য আগামী দিনগুলোয় বোঝা যাবে।

এবারের কৃষক আন্দোলনে এমন অনেক মুখ আর দেখা যাচ্ছে না যাঁরা প্রথম আন্দোলনে ছিলেন প্রথম সারিতে। যেমন রাজেশ টিকায়েত, যোগেন্দ্র যাদব, গুরনাম সিং চুড়ানির নাম এই ক্ষেত্রে করা যেতে পারে। তবে আন্দোলনরত কৃষকদের একজনের মৃত্যু পুরোনো নেতাদের আবার পথে নামায় কিনা সেটা অবশ্য আগামী দিনগুলোয় বোঝা যাবে। এবারের কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে মূলত যে দুই কৃষকনেতা, তাঁরা হলেন, কিসান মজদুর মোর্চা (কেএমএম) এবং কিসান মজদুর সংঘর্ষ কমিটি (কেএমএসসি)-র কোঅর্ডিনেটর সারওয়ান সিং পান্ধের এবং সংযুক্ত কিসান মোর্চা (নন পলিটিকাল)-এর কনভেনর জগজিৎ সিং ডাল্লেওয়াল।  

এই ‘কেএমএম’ এবং ‘এসকেএম (নন পলিটিকাল)’, দুটি সংগঠনই আসলে ছাতার মতো ধরে আছে আরও বহু ছোটো বড়ো কৃষক সংগঠনকে। এবারের দিল্লি চলো অভিযানের বৈশিষ্ট্য এই যে এবারের আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন মূলত পাঞ্জাবের কৃষকরা। হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের উপস্থিতি খুবই কম।

এবারের কৃষক আন্দোলন নিয়ে বিজেপি এখনও হয়তো ততটা চিন্তিত নয়। তারা মনে করছে রাম মন্দিরের হাওয়া সব বিপরীতমুখী স্রোতকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেবে।

কৃষকরা যে ফসলের এমএসপি-র আইনি গ্যারেন্টি চাইছে, সেই দাবি কিন্তু নতুন নয়। ২০০৪ থেকে ২০০৬, দুই বছরে মনমোহন সিং সরকারের আমলে গঠিত এমএস স্বামীনাথন কমিটি মোট ৫টি রিপোর্ট ইউপিএ সরকারকে দিয়েছিল। সেই অনুযায়ী ফসলের এমএসপি হওয়ার কথা ফসলের উৎপাদন খরচের ৫০ শতাংশ বেশি। এই নিশ্চয়তার আইনি স্বীকৃতি চাইছেন কৃষকরা। তাঁদের দাবি মোট ২৩টি ফসলের এমএসপির আইনি স্বীকৃতি চাই। যদিও সেই সময় মনমোহন সরকার এই রিপোর্ট মানতে রাজি হয়নি, নানান আর্থিক যুক্তি দেখিয়ে। কিন্তু মনমোহন সরকার রিপোর্টের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখতে চারজন মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে একটি কমিটি করেছিলেন। সেই কমিটির শীর্ষে ছিলেন তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই রিপোর্টে নরেন্দ্র মোদী ফসলের উৎপাদন খরচের ৫০ শতাংশ বেশি দাম কৃষককে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এই প্রতিশ্রুতি নরেন্দ্র মোদী ২০১৪-র নির্বাচনী বক্তৃতায় যেমন বারবার বলেছেন, তেমনই এই প্রতিশ্রুতির উল্লেখ রয়েছে বিজেপির ২০১৪ লোকসভা ভোটের ম্যানিফেস্টোর ২৮ নম্বর পৃষ্ঠায়। কংগ্রেস প্রথমে সরাসরি এই দাবি সমর্থন না করে ২০১৯-এ বলেছিল তারা ক্ষমতায় এলে একটি ‘প্যানেল’ তৈরি করবে এমএসপি স্থির করার জন্য। কিন্তু গত বছর রায়পুরে এইআইসিসি-র অধিবেশনে কংগ্রেস সিদ্ধান্ত বদল করে ঘোষণা করে তারা এমএসপি-র আইনি গ্যারেন্টির পক্ষে। কৃষক আন্দোলন চলাকালীন ভোটের মুখে কংগ্রেস নতুন করে ঘোষণা করেছে, ইন্ডিয়া জোট ক্ষমতায় এলে কৃষকদের এমএসপি-কে আইনি গ্যারেন্টি দেওয়া হবে। কিন্তু বক্তৃতায় নরেন্দ্র মোদী প্রতিশ্রুতি দিলেও এবং নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে ঘোষণা করেও বিজেপি এখন আইনি গ্যারেন্টি থেকে পিছিয়ে আসতে চাইছে নানা আর্থিক যুক্তি দেখিয়ে।

বাস্তব ঘটনা হল এই যে এবারের কৃষক আন্দোলন নিয়ে বিজেপি এখনও হয়তো ততটা চিন্তিত নয়। তারা মনে করছে রাম মন্দিরের হাওয়া সব বিপরীতমুখী স্রোতকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেবে। তাছাড়া পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাঠ কৃষকদের নেতা জয়ন্ত চৌধারীর দল আরএলডি (রাষ্ট্রীয় লোকদল) ইন্ডিয়া জোট ছেড়ে সম্প্রতি যোগ দিয়েছে এনডিএ-তে। গত কৃষক আন্দোলনে আরএলডি-র কারণেও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বিরাট সংখ্যক কৃষক আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তাছাড়া মোদী সরকার ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন ঘোষণা করেছে উত্তরপ্রদেশের জাঠ কৃষকনেতা চৌধারী চরণ সিং-কে। রাম মন্দির, আরএলডির এনডিএ-তে যোগদান, এবং চরণ সিংকে ভারতরত্ন, মূলত এই তিন কারণে বিজেপি মনে করছে এই আন্দোলনের প্রভাব হিন্দি বলয়ে মোটেই তেমন ভাবে পড়বে না। তবে একটা কথা ঠিক, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে প্রথম থেকে এই আন্দোলনের প্রতি নরম মনোভাব দেখিয়েছেন, তার সুবিধা সম্ভবত আপ পাঞ্জাবের লোকসভা আসনে পাবে।

বিজেপি চাইছে দ্রুত কৃষক আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটাতে। যদিও সেই কাজে এখনও খুব একটা সাফল্য আসেনি। সম্প্রতি জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে ‘মুড অফ দ্য নেশন’ নামের এক সমীক্ষায় বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে এনডিএ-র তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরার কথা বলা হয়েছে; তেমনই ওই একই সমীক্ষায় যাদের জমি আছে দেশের এমন কৃষকদের মাত্র ৩৩.৪ শতাংশ বলেছেন, মোদীশাসনে তাদের আর্থিক উন্নতি হয়েছে কিন্তু বাকি ৬৬.৬ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ বলছেন তাদের আর্থিক অবস্থার কোনওই উন্নতি হয়নি, বাকিদের মত, আর্থিক অবস্থা আগের থেকে খারাপ হয়েছে। ওই সমীক্ষায় আরও দেখা যাচ্ছে, জমির মালিক এমন কৃষকদের ৫০ শতাংশের বেশি বলছেন, মোদী সরকারের নীতিতে ‘বিগ বিজনেস’ বেশি উপকৃত হয়েছে।

এইখানেই সম্ভবত বিজেপির চিন্তা, তাহলে কি মোদী সরকারের কৃষক বিরোধী একটা ছবি তৈরি হচ্ছে তলায় তলায়। সেই কারণেই বিজেপি চাইছে, দ্রুত এই আন্দোলন আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে। তবে কাজটা কঠিন। একজন কৃষকের মৃত্যুর পর সেটা আরও কঠিন হয়েছে।

*কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব।

Developed by DXDasia