দেনাদার যখন রবীন্দ্রনাথ আর পাওনাদার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ঋণের কথা শুনলে একটু বিস্ময় জাগে বৈকি

তাঁর কাছে বাঙালির ঋণের শেষ নেই। সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির এমন কোনও দিক নেই যেখানে তিনি তাঁর অমর সৃষ্টি রেখে যাননি। তিনি আমাদের প্রাণের আরাম— রবীন্দ্রনাথ। এ হেন রবীন্দ্রনাথের কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই একথা যতখানি সত্যি, ততখানিই সত্যি যে তিনিও জীবনে কখনও কখনও কারও কাছে ঋণী ছিলেন। অবশ্য এখানে আর্থিক ঋণের কথা বলছি। কন্যাদের বিয়ে দিতে গিয়ে বা শান্তিনিকেতনে স্কুলের প্রয়োজনে কবিকে বেশ কয়েকবার ঋণ করতে হয়েছিল, একথা কবির জীবনী পাঠেই জানা যায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ঋণের কথা শুনলে একটু বিস্ময় জাগে বৈকি। বর্তমান নিবন্ধের বিষয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে রবীন্দ্রনাথের আর্থিক ঋণগ্রস্ততার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুবিধ কর্মকান্ডের সঙ্গে কবির নিবিড় সম্পর্কের কথা জানা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নথিপত্র ঘাঁটলে। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, অতিথি অধ্যাপক হিসেবে ক্লাস নেওয়া, বিশেষ বিশেষ বক্তৃতাদান, কবিকে ডি.লিট. উপাধি প্রদান, সমাবর্তনে কবির দীক্ষান্ত ভাষণ – এসব তো ছিলই। এসবের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কবির উত্তমর্ণ – অধমর্ণ সম্পর্কও ছিল কিছুকালের জন্য (১৯১২ থেকে ১৯১৭ সাল)।

দেন মেটাতে কবিকে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা ধার করতে হবে। এত টাকা পাবেন কোথায়?

সেটা ১৮৯৫ সাল। বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর কুষ্টিয়ায় ‘ঠাকুর কোম্পানি’ নামে একটি ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু সুরেন্দ্রনাথ অন্য বিষয়কর্মে আত্মনিয়োগ করায় এই কারবারে বেশিদিন মনোনিবেশ করতে পারলেন না। একা বলেন্দ্রনাথই দেখাশোনা করতেন সবকিছু। এই বলেন্দ্রনাথ মানুষটির আবার ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে তেমন উৎসাহ ছিল না। তিনি ছিলেন আদর্শবাদী, সরলমনা সাহিত্যিক এবং মনুষ্যচরিত্র সম্বন্ধে নিতান্তই অনভিজ্ঞ। জনৈক কর্মচারী তাঁর এই সরলতার সুযোগ নিয়ে একদিন বহু টাকা আত্নসাৎ করে চম্পট দিল। এর ফলে ব্যবসার ভরাডুবি হতে সময় লাগল না। তার কয়েক বছর পর ১৮৯৯ সালে বলেন্দ্রনাথের অকালমৃত্যুতে ‘ঠাকুর কোম্পানি’-র সমস্ত দায়ভার এসে পড়ল রবীন্দ্রনাথের উপর। প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কবি অবিলম্বে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ব্যবসা তো গুটিয়ে নেওয়া হল, এদিকে ততদিনে পাওনাদারের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। তাদের দেন মেটাতে কবিকে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা ধার করতে হবে। এত টাকা পাবেন কোথায়? বন্ধু লোকেন পালিতের পিতা স্যার তারকনাথ পালিতের শরনাপন্ন হলেন রবীন্দ্রনাথ এবং মাসিক সুদের চুক্তিতে পেয়েও গেলেন প্রয়োজনীয় টাকা।

সেই টাকা শোধ হওয়ার আগে ১৯১২ সালে স্যার তারকনাথ পালিত তাঁর বিশাল সম্পত্তি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে দিলেন। সেই সম্পত্তির মধ্যে বাড়ি, জমি আর নগদ ১৪ লক্ষ টাকা ছাড়াও ছিল তাঁর দেনাদার বিভিন্ন ব্যক্তিদের কাছে পাওনা টাকা। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ তারকনাথ পালিতের স্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে গেলেন তখন থেকে। ঋণ শোধের মেয়াদ ছিল ১৯১৭ সালের মধ্যে।

১৯১৬ সালের ১১ অক্টোবর লস এঞ্জেলস থেকে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লেখা কবির চিঠির অংশবিশেষ পড়ে দেখা যাক—

“তারকবাবুর যে টাকাটা ধারি এখন সে দেনাটা কলকাতা য়ুনিভার্সিটির হাতে গিয়ে পৌঁছেছে ; ১৯১৭ খ্রীস্টাব্দে তার মেয়াদ ফুরোবে – অতএব আগামী বৎসরেই এ টাকাটা শোধ করে মাসিক সুদের হাত থেকে নিষ্কৃতি নিস।” কবি আরও জানিয়েছিলেন যে ত্রিশ হাজার টাকার ব্যবস্থা হলেই তিনি তা পাঠিয়ে দেবেন পুত্রের মারফৎ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯১৭ সালের নথিপত্র অনুসন্ধান করলে দেখা যায় কবির অনুরোধে ওই বছরের জুন মাস পর্যন্ত ঋণশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯১৭ সালের নথিপত্র অনুসন্ধান করলে দেখা যায় কবির অনুরোধে ওই বছরের জুন মাস পর্যন্ত ঋণশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। একটু উদ্ধৃতি দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে :

Read a letter from Sir Rabindranath Tagore, Kt. D.Litt, requesting he may be allowed to pay in June next, the sum of Rs. 30,000 which he borrowed from the late Sir T.N. Palit.

Resolve —- That time be allowed to Sir Rabindranath Tagore, till the 30th June 1917 to pay the sum of Rs.30,000 borrowed from the late Sir T.N. Palit. (Syndicate 11.5.1917)

বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি আরও জানাচ্ছে যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কবি তাঁর দেনা শোধ করে নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন –

The Registrar reported that Sir Rabindranath Tagore, one of the debtors of late Sir T.N. Palit had paid in full the principal and interest for May, 1917. (Syndicate, 8.6.1917)

বিড়ম্বিত ব্যক্তিজীবনে কবিকে এরকম অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সৃজনশীলতা কখনও থেমে থাকেনি। এজন্যই তিনি অনন্য, তিনি রবীন্দ্রনাথ।

তথ্যসূত্রঃ

১। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার কার্যবিবরণী (Minute Book) থেকে উদ্ধৃত অংশের সূত্র (Syndicate, 11 5.1917) এবং (Syndicate, 8.6.1917)

২। ড. দীনেশচন্দ্র সিংহ রচিত 'প্রসঙ্গ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়' গ্রন্থ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত)
 

Post Tags
Developed by DXDasia