কলকাতা বইমেলায় উত্তমকুমার এবং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস

বইমেলার ২ নম্বর গেট পেরোলেই পৌঁছানো যাচ্ছে সিনেমার সেটে

২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভিড় করছেন সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্কে। শহরে শীত-শেষের আমেজ, মেলায় হাজারের বেশি বইবিপণি, মাঝেমধ্যে অল্প খাওয়াদাওয়া — বইপ্রেমী বাঙালির আর কী চাই!

তবে এবছর বইমেলার ২ নম্বর গেট পেরিয়ে সামান্য এগোলেই নাকি পৌঁছানো যাচ্ছে সিনেমার সেটে! খবর পেয়ে বঙ্গদর্শন.কম পৌঁছে দেখল সে এক এলাহি আয়োজন। ২০২৬ সালে মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে মূলত তাঁকে কেন্দ্র করে এক প্রদর্শনী চলছে মেলা প্রাঙ্গণে। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের সহায়তায় আর্ট অলিন্দ আর্কাইভ আয়োজন করেছে এই প্রদর্শনীর। বিশিষ্ট শিল্প সংগ্রাহক জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্যের তৈরি আর্ট অলিন্দ আর্কাইভ বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও ইতিহাসের নানা উপাদান সংগ্রহ এবং সেগুলিকে সযত্নে সংরক্ষণ করে চলেছে। সঙ্গে রয়েছেন ‘কলকাতা কথকতা’র তরফ থেকে সম্পাদক চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।

প্রদর্শনী কক্ষে ঢুকে দর্শক প্রথমেই দেখতে পাবেন একটি ‘কার্ডবোর্ড কাটআউট’৷ এই কাউটআউটে রয়েছে উত্তমকুমারের শঙ্খবেলা সিনেমার ফ্লোরে তোলা একটি দুষ্প্রাপ্য স্টিল ছবি। ব্রোমাইড নেগেটিভ কালেকশনটি ডেভেলপ করে এখানে রাখা হয়েছে। তার সঙ্গে মিলিয়ে প্রদর্শনী কক্ষ সাজানো হয়েছে সিনেমার সেটের মতো করে।

আজ বাংলা চলচ্চিত্র রয়েছে বলেই বাঙালি পেয়েছে তাদের মহানায়ককে। অরুণকুমারকে উত্তমকুমার করে তুলেছে বাংলা সিনেমা। এ কথা মাথায় রেখে প্রদর্শনীকক্ষে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং দ্য রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হীরালাল সেন, জে এফ মাদান এবং তাঁর এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস থেকে শুরু করে ১৯৩১ সালে বাংলার শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত নির্বাক টকি  ‘জামাই ষষ্ঠী’, নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’, রায়-ঘটক-সেন ও তাঁদের কালজয়ী ছবি পেরিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ প্রমুখ পরিচালিত একাধিক বাংলা চলচ্চিত্রের নাম এবং সেই সংক্রান্ত নানান ছবি রয়েছে প্রদর্শনী কক্ষের দেওয়ালে।

কেন্দ্রবিন্দুতে যেহেতু উত্তমকুমার, তাই প্রদর্শনী কক্ষে ঢুকে দর্শক প্রথমেই দেখতে পাবেন একটি ‘কার্ডবোর্ড কাটআউট’৷ এই কাউটআউটে রয়েছে উত্তমকুমারের শঙ্খবেলা সিনেমার ফ্লোরে তোলা একটি দুষ্প্রাপ্য স্টিল ছবি। ব্রোমাইড নেগেটিভ কালেকশনটি ডেভেলপ করে এখানে রাখা হয়েছে। তার সঙ্গে মিলিয়ে প্রদর্শনী কক্ষ সাজানো হয়েছে সিনেমার সেটের মতো করে। রয়েছে নায়ক সিনেমায় ব্যবহৃত উত্তমকুমারের পোশাক, গৌরীদেবীকে তাঁর লেখা চিঠি।

শুধু উত্তমকুমার নন, সবাক বাংলা সিনেমার বেশ কিছু লবিকার্ড, বুকলেট, এন্ট্রিটিকিটও রাখা হয়েছে প্রদর্শনীতে। এমনকি ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দেবকীকুমার বসুর নির্বাক ছবি ‘অপরাধী’র বুকলেটও দর্শক দেখতে পাবেন এখানে। রয়েছে ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় ‘আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’ গানে ব্যবহৃত দোতারা, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ সিনেমায় ব্যবহৃত পানের ডাবর, মৃণাল সেনের খারিজ সিনেমার ‘প্রেসলেটার’, ১৯৩৭ সালের ইন্দিরা সিনেমার আমন্ত্রণপত্র, মধু বসুর লিখিত চিঠি-সহ আরও নানা দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ।

এছাড়া প্রদর্শনীতে রয়েছে আর্ট অলিন্দ আর্কাইভের কিছু নিজস্ব সংগ্রহ। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রীর ছবি, জানকীনাথ বসুর শ্রাদ্ধের পরে তোলা সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি দর্শকরা এখানে দেখতে পাবেন। রয়েছে প্রাচীন তালপাতার পুঁথি, একসময়ে বাংলার অতিপ্রিয় পোর্সেলিনের পুতুলও। 

তবে প্রদর্শনী ঘুরে, ছবি তুলে মানুষ কি খালি হাতে ফিরে আসবে? একেবারেই না। একপ্রান্তে আছে কাউন্টার, যেখান থেকে কেনা যেতেই পারে বাংলা সিনেমা সংক্রান্ত একাধিক বই। মহানায়কের ছবি দেওয়া চাবির রিং, তাঁর সিনেমার পোস্টার কিংবা ছবি দিয়ে বানানো তাস, সোনার কেল্লা মিনি বুক এইসব লোভনীয় জিনিসও সংগ্রহ করা যেতে পারে এখান থেকে।

এতো গেল প্রদর্শনী কক্ষের ভিতরের কথা। বাইরেও দর্শকের আমোদের জন্য রয়েছে বায়োস্কোপের ব্যবস্থা। মাত্র ষাট টাকার বিনিময়ে এইট এম এম প্রোজেক্টরে দর্শক উপভোগ করতে পারবেন বায়োস্কোপ শো আর একশো টাকার বিনিময়ে রোলেক্স ক্যামেরাতে ছবি তুলে পাবেন তার আকর্ষণীয় প্রিন্টআউট।

বইমেলা শুধু বইপ্রেমী বাঙালির জন্য না, বাংলা ও বাংলার সংস্কৃতির প্রতি যাঁরা শ্রদ্ধাশীল বইমেলা তাঁদের প্রত্যেকের জন্য। জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্যের স্ত্রী দেবলীনা ভট্টাচার্য জানালেন, একথা মাথায় রেখেই আর্ট অলিন্দ আর্কাইভ এই প্রদর্শনীতে মহানায়কের পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে বহু দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। প্রদর্শনী খোলা থাকবে বইমেলার শেষ দিন অর্থাৎ ৩ ফেব্রুয়ারি, বেলা ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
 

Post Tags
Developed by DXDasia