নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়ামে প্রদর্শনী চলবে ৭ সেপ্টেম্বর অবধি
সত্তরের দশক। ধুতি পাঞ্জাবি পরা একটা লোক বসে আছেন তাঁর গাড়িতে। গাড়ি ঘিরে উত্তাল জনতা। সকলেই একটিবারের জন্য ‘ভুবন ভোলানো’ হাসির মালিককে দেখতে চায়। সোশ্যাল মিডিয়া, ফ্যান-ফলোয়ার্স এই সব শব্দের সঙ্গে বাঙালির তখনও পরিচয় ঘটেনি৷ তবু আপামর বাঙালি মেতেছিল তখন ‘উত্তম’ প্রেমে। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতার আহিরিটোলায় জন্মেছিলেন উত্তমকুমার। নিরানব্বই বছর পর, ২০২৫ সালে তাই তাঁর জন্মশতবর্ষের প্রাক উদযাপন শুরু হয়েছে বাংলা জুড়ে। এই উৎসবে সামিল হতে ‘কলকাতা কথকতা’ আয়োজন করেছে ‘শুধুই উত্তম’ নামক প্রদর্শনীর। নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের সহায়তায় মিউজিয়ামের নিচের তলায় আয়োজিত এই প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর, চলবে ৭ সেপ্টেম্বর অবধি। প্রবেশ বিনামূল্য। (কলকাতা কথকতা আয়োজন করেছে শুধুই উত্তম প্রদর্শনী)

এই প্রদর্শনীতে দেখা যাবে সব্যসাচী, ওরা থাকে ওধারে, উত্তর ফাল্গুনী হারানো সুর, গৃহদাহ, অবাক পৃথিবী, সপ্তপদী, জীবন মৃত্যু, কমললতা, রাজা সাজা, আনন্দমেলা-সহ প্রায় দুশো থেকে আড়াইশোটি মহানায়ক অভিনীত সিনেমার লবিকার্ড।
কলকাতা কথকতা গোষ্ঠীর ত্রিশ জন সংগ্রাহকের মধ্যে গোষ্ঠী সম্পাদক চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, সহ-সম্পাদক ফাল্গুনী দত্ত রায় এবং উজ্জ্বল সরদার, জয়ন্তকুমার ঘোষ, জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য, মলয় সরকার, অরিন্দম রাউত, শীর্ষেন্দু মুখার্জি, সৌভিক মুখোপাধ্যায় – এই নয় স্বনামধন্য সংগ্রাহকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ রয়েছে প্রদর্শনীতে। ৩ সেপ্টেম্বর প্রদর্শনীর উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা কথকতার সভাপতি, অভিনেতা চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী। ছিলেন উত্তমকুমারের সহ-অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী অলকানন্দা রায়, উত্তমকুমারের সহ-অভিনেতা শ্যামল ঘোষালের কন্যা অভিনেত্রী চৈতী ঘোষাল, অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা পৌলমী চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলার বিখ্যাত কালি প্রস্তুতকারী সংস্থা সুলেখা, মহানায়কের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি করেছে ‘মহানায়ক’ কালি, এদিন প্রদর্শনীতে তারও উদ্বোধন হল।

উত্তমকুমারের জন্মকুণ্ডলী, বাংলায় তাঁর ভার্টিক্যাল স্বাক্ষর, সাড়ে চুয়াত্তর-সহ কয়েকটি সিনেমার বর্তমানে অবলুপ্ত ভিডিও টেপ এবং ক্যাসেট, তাঁর নিজের হাতে লেখা চিঠি, তাঁর প্যাডে সুপ্রিয়াদেবীর লেখা চিঠি, মহানায়কের সহশিল্পীদের অটোগ্রাফের সংগ্রহ, তাঁর ব্যবহৃত কাপপ্লেট, নায়ক চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত কোট, এই সবই প্রদর্শনীকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়।
প্রদর্শনীতে রয়েছে মরুতীর্থ হিংলাজ, অবাক পৃথিবী, ঝিন্দের বন্দি, সপ্তপদী, চাওয়া পাওয়া, হার মানা হার, স্ত্রী-সহ প্রায় চল্লিশটির কাছাকাছি মহানায়কের অভিনীত সিনেমার ওরিজিনাল পোস্টার। এমনকি সুখেন দাস পরিচালিত ১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সুনয়নী’ সিনেমাটির হাতে আঁকা পোস্টারও এখানে দর্শকরা দেখতে পাবেন। এছাড়া রয়েছে উত্তমকুমারের সিনেমার লবিকার্ড। এই লবিকার্ডে থাকতো কোনো নির্দিষ্ট সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের ছবি, যা দেখিয়ে সেই সিনেমার প্রতি দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করা হত। বর্তমানে লবিকার্ড বিলুপ্ত। এই প্রদর্শনীতে দেখা যাবে সব্যসাচী, ওরা থাকে ওধারে, উত্তর ফাল্গুনী হারানো সুর, গৃহদাহ, অবাক পৃথিবী, সপ্তপদী, জীবন মৃত্যু, কমললতা, রাজা সাজা, আনন্দমেলা-সহ প্রায় দুশো থেকে আড়াইশোটি মহানায়ক অভিনীত সিনেমার লবিকার্ড। ১৯৬৯ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে উত্তমকুমারকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র কিংবা ১৯৬৩ সালের ফিল্ম ডায়েরিতে মহানায়কের ফোন নম্বর, উত্তমকুমার সভাপতি থাকাকালীন শিল্পী সংসদের আমন্ত্রণপত্র-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ নথিও এই প্রদর্শনীতে শোভা পাচ্ছে। এছাড়া চন্দ্রনাথ, নিশি পদ্ম, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, বসু পরিবার, কাল তুমি আলেয়া, হার মানা হার, দুই পুরুষ, আনন্দ আশ্রম প্রভৃতি সিনেমার অজস্র বুকলেটের পাশাপাশি দর্শকরা দেখবেন অন্তত দেড়শোর উপর মহানায়কের অভিনীত ছবির বিজ্ঞাপন। রয়েছে উত্তমকুমার ও রাজকাপুর অভিনীত মুক্তি না পাওয়া আনন্দসংবাদ চলচ্চিত্রের দুষ্প্রাপ্য বিজ্ঞাপন।

উত্তমকুমারের জন্মকুণ্ডলী, বাংলায় তাঁর ভার্টিক্যাল স্বাক্ষর, তাঁর অভিনীত-সুরারোপিত-গীত গানের রেকর্ড, ধর্মরাজ তামাং, সাড়ে চুয়াত্তর সহ কয়েকটি সিনেমার বর্তমানে অবলুপ্ত ভিডিও টেপ এবং ক্যাসেট, তাঁর নিজের হাতে লেখা চিঠি, তাঁর প্যাডে সুপ্রিয়াদেবীর লেখা চিঠি, মহানায়কের সহশিল্পীদের অটোগ্রাফের সংগ্রহ, তাঁর ব্যবহৃত কাপপ্লেট, নায়ক চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত কোট, এই সবই প্রদর্শনীকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়। রয়েছে উত্তমের নায়িকা ভারতীদেবী, মাধবী, তনুজা ও শর্মিলা স্বাক্ষরিত ডাকটিকিটের ফার্স্ট ডে কাভার এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে মহানায়ককে নিয়ে প্রকাশিত নানা খবর, তাঁর ছবির বিজ্ঞাপন, যুগান্তর, আনন্দবাজার-সহ অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রয়াণের খবরের সংগ্রহ।

উদ্বোধনের দিন প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়-সহ অন্যান্য সংগ্রাহকরা। দর্শকের প্রদর্শনী সংক্রান্ত অজস্র প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন তাঁরা হাসিমুখে। সহ-সম্পাদক ফাল্গুনী দত্ত রায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “বাঙালির আবেগ হল ‘উত্তম’, আমাদের প্রজন্ম, পূর্ববতী প্রজন্ম এমনকি পরবর্তী প্রজন্ম, সকলেই উত্তমকে ভালোবাসে। সেই ভালোবাসা যাতে আরও বাড়ে তাই কলকাতা কথকতার তরফ থেকে এই আয়োজন।”
তবে প্রবীণের নস্ট্যালজিয়া বাড়লেও জেনারেশন জেড কতটা আপন করে নিচ্ছে উত্তমকে এবং তাঁকে কেন্দ্র করে হওয়া এই প্রদর্শনীকে, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।
____________
ছবি: প্রতিবেদক