শাস্ত্রীয় সংগীতকে সর্বসাধারণের করে তুলেছিলেন উস্তাদ রাশিদ খান

প্রয়াত রামপুর-সাসওয়ান ঘরানার শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী উস্তাদ রাশিদ খান

গত বছরের পরিসমাপ্তি ঘটেছিলো প্রখ্যাত পাখোয়াজশিল্পী পণ্ডিত ভবানী শঙ্করের প্রয়াণে। আর এই বছরের একদম শুরুতেই ভারতীয় মার্গ সংগীতের আকাশে ফের নক্ষত্রপতন হলো— চলে গেলেন উস্তাদ রাশিদ খান (Ustad Rashid Khan)। উস্তাদজি এমন একজন শিল্পী, যিনি শাস্ত্রীয় সংগীতে তাঁর অবস্থানকে যেমন অক্ষুণ্ণ রেখেছেন, তেমনই অন্যান্য সংগীতের ধারাতেও বিচরণ করেছেন অনায়াসে। শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে তাঁর যোগ, ললিত বা মালকোষ যেমন শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে, তেমনই বলিউডের জনপ্রিয় ‘যব উই মেট’ ছবিতে তাঁর ‘আওগে যব তুম ও সাজনা’ হোক, বাংলা ছবি ‘তিন কন্যা’-তে শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’ হোক, বা একাধিক মর্মস্পর্শী গজ়ল হোক, সবেতেই তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। গেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গানও। ফলস্বরূপ পেয়েছেন আপামর ভারতবাসীর ভালোবাসা। বহুক্ষেত্রেই যখন দেখা যায় যে, উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পীরা একটি বিশেষ গণ্ডির বাইরে বেরোতে প্রবৃত্ত হন না, উস্তাদ রশিদ খান সেখানেই হয়ে উঠেছিলেন একটি ঘরোয়া নাম, যা ভারতবর্ষের মতো দেশে মোটেই সহজসাধ্য নয়।

তাঁর সাঙ্গীতিক পরিবারের প্রভাবেই হোক, বা প্রবাদপ্রতিম সংগীতচার্য উস্তাদ নিশার হুসেন খান সাহেবের শিক্ষা ও সান্নিধ্যের কারণেই হোক, রাশিদ হয়ে উঠেছিলেন একজন আদ্যপান্ত স্বয়ং সম্পূর্ণ শিল্পী। তাঁর হাঁটা-চলা-কথা বলা বা মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি, সবকিছুর মধ্যেই ছিলো একজন শিল্পীসুলভ রাজকীয়তা। উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে বেমানান গজ়ল গাইবার অনুরোধ এলে যেমন ঠিকই বিরক্ত হতেন, একইভাবে লঘুধারার সংগীতের প্রতিও ছিলেন গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। গুরু হিসেবেও উস্তাদজি ছিলেন শিষ্যদের আপনজন। বহু ছাত্রছাত্রীকে সন্তানস্নেহে তালিম দিয়েছেন। সুপ্রসিদ্ধ রামপুর-সাসওয়ান ঘরানা সংগীতের খুঁটিনাটি বা একজন ঘরানাদার শিল্পীর নিষ্ঠা-সাধনা-আচার-ব্যবহার সম্পর্কিতই হোক, কোনোকিছুই গুরু রাশিদ খানের চোখে উপেক্ষিত হত না। শিক্ষা যে একটি পারস্পরিক আদানপ্রদানের মাধ্যম এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। মঞ্চে বহুবার বলেছেন, যে তিনি প্রতিনিয়ত শেখেন তাঁর জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের কাছ থেকে, সহশিল্পীদের কাছ থেকে, আবার শ্রোতাদের কাছ থেকেও। ভালো শ্রোতা, সমঝদার শ্রোতার সামনে গাইবার আনন্দ যে কোনো শিল্পীর মতো তিনিও পেতেন। দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুরে পণ্ডিত কুশল দাস আয়োজিত কলাশ্রী মিউজিক সার্কেলে বহু গুণীজনের সমাবেশে উস্তাদজির গাওয়া মারোয়া, শ্রোতাদের কানে আজও অমলিন হয়ে আছে।

তাঁর সাঙ্গীতিক পরিবারের প্রভাবেই হোক, বা প্রবাদপ্রতিম সংগীতচার্য উস্তাদ নিশার হুসেন খান সাহেবের শিক্ষা ও সান্নিধ্যের কারণেই হোক, রাশিদ হয়ে উঠেছিলেন একজন আদ্যপান্ত স্বয়ং সম্পূর্ণ শিল্পী। তাঁর হাঁটা-চলা-কথা বলা বা মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি, সবকিছুর মধ্যেই ছিলো একজন শিল্পীসুলভ রাজকীয়তা।

জন্মসূত্রে উস্তাদ রাশিদ খান বাঙালি ছিলেন না। চৌদ্দ বছর বয়সে তাঁর দাদু উস্তাদ নিশার হোসেন খানের সঙ্গে কলকাতায় আইটিসি সংগীত রিসার্চ অ্যাকাডেমিতে চলে আসেন। পরবর্তীকালে তিনি একজন বাঙালি সংগীতজ্ঞ হিসেবেই পরিচিত হন। কলকাতা শহরের প্রতি উস্তাদজির অকল্পনীয় দরদ, মমতা ও ভালোবাসা ছিল। আজীবন ভাঙা-ভাঙা বাংলা ও হিন্দি মিশিয়ে কথা বলতেন। এই শহরের ভাষা, মানুষজন আর সংস্কৃতিকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। তাই তো বহু সুযোগের পরেও কখনোই পাকাপাকি ভাবে কলকাতা শহর ছেড়ে চলে যাননি। জাতি-জাতীয়তা-বাঙালিয়ানা এসব নিয়ে যখন তর্কবিতর্কে মজে উঠেছে বাংলা তথা গোটা ভারত, উস্তাদজির মতন শিল্পীরা তখন ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজটিই করেছেন।

২০০৭ সালের পর আর আমেরিকা যাননি উস্তাদ রাশিদ খান। ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে যে অপমানের মুখোমুখি তিনি হয়েছিলেন, তা যেন তাঁর কাছে একটি দুঃস্বপ্ন হয়ে রয়ে গিয়েছিল। বারবার বলেছেন, ভারতে বহু সমস্যা রয়েছে, কিন্তু তার পরেও অন্তত ধর্ম বা বর্ণের জন্য কাউকে বৈষম্যের শিকার হতে হয় না। দেশের রাজনীতি বহু চড়াই-উৎরাইয়ের পরেও তাঁর এই বিশ্বাস, দেশ ও মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট ছিল আজীবন।

বহু গুণমুগ্ধ শ্রোতাকে চোখের জলে ভাসিয়ে একজন গান অন্তপ্রাণ মানুষের এইভাবে মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে চলে যাওয়া আসলেই শিল্প-সংস্কৃতি-সংগীতে অপূরণীয় ক্ষতি।

Developed by DXDasia