শহরের রানি গো, আমরা তোমায় চিনি গো…

ঊষা উত্থুপের সঙ্গীত-জীবন ৫০ বছর পূর্ণ করল

মাথায় বিন্দি, চুলের খোঁপায় রঙিন ফুল, পরনে কাচেপুরাম শাড়ি- সব মিলিয়ে নিজেই ‘গোল্ডেন ডিভা’ হয়ে আছেন সঙ্গীতশিল্পী ঊষা বিদ্যানাথ সোমেশ্বর সামী ওরফে ঊষা উত্থুপ, আমাদের প্রিয় ‘কলকাতার রানি’। গান গাইতেন সেই ছোটো থেকেই। কিন্তু পেশাগতভাবে গান গাইতে শুরু করলেন ১৯৬৯ সালে। চেন্নাইয়ের মাউন্ট রোডের কাছে এর্‌স্টায়াল সাফির থিয়েটার কমপ্লেক্সের নিচতলায় “নয় রত্ন” (Nine Gems) নামের একটি নাইট ক্লাব- সেখানেই গান গাইতেন ঊষা। জীবনে বাধা-বিপত্তি এসেছে বহুবার। কিন্তু পিছু হটেননি। তাঁদের ছোটোবেলায় মহিলা সঙ্গীতশিল্পী মানেই তাঁকে হতে হবে সুরেলা মিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী। স্কুলে গানের ক্লাস থেকে শিক্ষিকা ঊষাকে বের করে দিয়েছিলেন তাঁর ওই দৃপ্ত পুরুষালি কণ্ঠের জন্য। হাল ছাড়েননি। সেই অর্থে কোনো প্রশিক্ষণ নেই তাঁর। তাতে কী! সেই সাতের দশক থেকে শুরু করে ২০১৯-এর যুবসমাজ- ঊষার গানে শরীর দোলে না, এমন মানুষ খুব কমই আছে। এটাই আসলে একজন শিল্পীর জাদু। 

ভারতীয় ঘরানার সঙ্গে পশ্চিমী পপ জ্যাজকে মিলিয়ে দেওয়ার ধারা ঊষা উত্থুপের কণ্ঠেই প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল। এক্কেবারে অন্যরকম তাঁর গায়কী। চেন্নাইয়ের পর চলে আসেন কলকাতায়। তারপর আবার চলে যান দিল্লি। সেখানে ওবেরি নামের একটি হোটেলে গান গাইতেন। একদিন হঠাৎ করেই শশী কাপুর সহ বলিউডের একঝাঁক তারকা এলেন সেই হোটেলে। ঊষার গান শুনে তাঁদের এতই ভালো লাগে যে প্লেব্যাক করার জন্য অফার দিলেন। ১৯৭১ সালে ঊষা উত্থুপের গাওয়া “হরে রামা হরে কৃষ্ণ” সেই প্রথম গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যায়। তারপর আর ঊষাকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। “এক দো চা চা চা”, “হরি ওম হরি”, ‘বন্দে মাতরম’, “রাম্ভা হো” এরকম একের পর এক হিট গান উপহার দিয়েছেন শ্রোতাদের। 

ঊষা বারবার বলেন, “আই বিলিভ ইন মিউজিক। আই বিলিভ ইন লাভ।” সঙ্গীত আর ভালোবাসার সাধনা করেন তিনি। কখন যে কলকাতার আইকন হয়ে উঠেছেন, নিজেও বুঝতে পারেননি। বাঙালি না হয়েও বাংলার প্রতি, বাংলার মানুষের প্রতি, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা তা তো প্রত্যেকেরই জানা। ঊষা উত্থুপকে কি ‘ক’ লেখা টিপ ছাড়া মানায়? চুলের পিছনে ফুলটা না থাকলে? কিংবা তাঁর ওই প্রশস্ত হাসিটা না দেখলে? এবছর (২০১৯) ঊষা উত্থুপের সঙ্গীত জীবনের ৫০ বছর পূর্ণ হল। এই পঞ্চাশ বছর পূর্তিকে সম্মান জানাতে দ্য কলকাতা ফেস্টিভ্যাল শুরু হল ঊষা উত্থুপের কনসার্ট দিয়ে। অনুষ্ঠানের আয়োজক রোটারি ক্লাব অফ ক্যালকাটা অ্যাভিয়ানা, আর্ট অ্যান্ড হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট এবং পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তর। যুবতী ঊষা সেই কবে এসেছিলেন কলকাতায়। তারপর থেকে শহরটাকে ভালোবেসে ফেলেছেন। এই শহর তাঁকে অনেক কিছু দিয়েছে। সুবর্ণজয়ন্তি বর্ষে তাই কলকাতা আরেকবার স্মরণ করল প্রিয় ‘শহরের রানি’কে। ঊষা মানে শুধু বাংলা-হিন্দি গান নয়। পাঞ্জাবি, গুজরাতি, মারাঠি, ওড়িয়া, কন্নড়, তামিল, তেলুগু, মালয়ালি-সহ প্রায় পনেরোটি ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছেন। ইংরেজি ছাড়া আরও পাঁচটি বিদেশি ভাষায় গেয়েছেন। 

ঘন কালো হালকা চেক-সহ পিওর সিল্ক, বড়ো কালো টিপ তাঁকে আরও বর্ণময় করে তুলেছে। চিরকালীন রঙে ঊষা কোনো এক বিস্তৃত সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে ভৈরবী ধরেছেন। সমুদ্রের অকূল থেকে ভেসে আসছে শ্রোতাদের করতালি। সকালের প্রথম আলো গায়ে মেখে ঊষা হাঁটতে শুরু করবেন ঠিকানাহীন এক সকালের উদ্দেশে। সেইখানেই লুকিয়ে আছে পঞ্চাশটা বছর। শহরের রানি গো, আমরা তোমায় চিনি গো… আমরা তোমারই ‘ঊষা’।

ছবি- সংগৃহীত<

Developed by DXDasia