
গোপেশ্বর ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গীতজীবন
দেবদত্ত গুপ্ত ও পার্থ দাশগুপ্ত
গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। কণ্ঠ সঙ্গীত, সেতার, সুরবাহার ও এসরাজ বাদন প্রায় সমস্ত দিকেই ছিল তাঁর প্রশ্নাতীত দক্ষতা। তিনিও ছিলেন সঙ্গীত গবেষণার পৃষ্ঠপোষক। তিনি বর্ধমান মহারাজার রাজসভায় ও কলকাতার মহারাজ যতীন্দ্রমোহনের রাজ সভায় গায়ক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস, গীতমালা, সঙ্গীতচন্দ্রিকা, সঙ্গীতলহরি, গীতদর্পণ, গোপেশ্বর গীতিকা। প্রত্যেকটি গ্রন্থই ভারতীয় সঙ্গীতের বিষয়ে গবেষণালব্ধ ফসল। এই গবেষণাই বিষ্ণুপুর ঘরানার অবয়ব নির্মাণের সহায়ক হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও গোপেশ্বর বন্দ্যপাধ্যায়ের সম্পর্ক ছিল অন্য রকম। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ভারতের সঙ্গীত গুণীদের মধ্যে গোপেশ্বর বাবু অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী থেকে গোপেশ্বরবাবুকে ‘স্বর-সরস্বতী’ উপাধি দিয়েছিলেন। এবং রবীন্দ্রনাথ মনে করেছিলেন, বিষ্ণুপুর ঘরের মর্যাদা সর্ব ভারতীয় অন্যান্য রাগ সঙ্গীতের মর্যাদার সমতুল। এই মনে করেই সঙ্গীত ভবনে তাঁকে যোগ দিতেও বলেন রবীন্দ্রনাথ।
কিন্তু সে কাজ করা সম্ভব হয়নি। যদিও পরে তিনি সেখানে সম্মানিত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তবে সর্বভারতীয় একটি প্রসঙ্গ এখানে বলে নেওয়া যাক। তা হল, ১৯১৯ সাল থেকে শুরু করে প্রায় এক দশক সময় কাল ধরে পণ্ডিত ভাতখণ্ডেজী এবং তার সহযোগীরা নিখিল ভারত সঙ্গীত সম্মেলনের যে আয়োজন করতেন সেখানে গোপেশ্বরবাবুকে আমন্ত্রণ জানানো হত নিয়মিত। সেই সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের বহু সদস্য গোপেশ্বরবাবুর কাছে নিয়মিত তালিমও নিতেন। কিন্তু আশ্চর্যের কথা হল, দীর্ঘদিন ধরে লোকে জানতেন যে রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের গান করেননি গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও এমন তথ্য সঠিক নয়। একটি দুর্লভ ও ক্ষণস্থায়ী কোম্পানি তাঁর কণ্ঠ রেকর্ডে চয়ন করেছিল। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর সঙ্গীত রচয়িতা। তাঁর লেখা গান যেমন আমরা ‘গোপেশ্বর গীতিকা’, ‘গীতমালা’, ‘তানমালা’, ‘গীতদর্পণ’ তেমনই পাই রেকর্ড সঙ্গীত গ্রন্থেও। এই গানগুলির চরিত্র অন্বেষণ করলে বোঝা যায় যে, এগুলির অনেকটাতেই বাংলা ও ব্রজভাষার মিশ্রণ রয়েছে। জীবনের শেষ পর্বে জন্মভুমি বিষ্ণুপুরে ফিরে আসেন। সেখানে রামশরণ সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।
গোপেশ্বরবাবুর ভাই সুরেন্দ্রনাথও ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। সুরেন্দ্রনাথকে গোপেশ্বরই প্রথম নিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের গানগুলি সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করার জন্যে একজন দক্ষ স্বরলিপিকার খুঁজছিলেন। এক লহমায় জোড়াসাঁকো বাড়িতে বসে বেশ কয়েকটি গানের স্বরলিপি করে দিয়েছিলেন সুরেন্দ্রনাথ। সেই থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলতেন স্বরলিপির যাদুকর। অগ্রজদের কাছ থেকে গান তো শিখেই ছিলেন সাথে সাথে তিনিও সুরবাহার, সেতার, এসরাজ ইত্যাদিও শিখেছিলেন। এই ভাবে প্রথম থেকেই বিষ্ণুপুরে যন্ত্র সঙ্গীতেরও একটা আলাদা ক্ষেত্র গড়ে উঠেছিল। সুর বাহারের কৌশল সুরেন্দ্রনাথ শিখেছিলেন গদাধর চক্রবর্তীর পৌত্র নীলমাধব চক্রবর্তীর কাছে। কিন্তু যে কথাটা না বললেই নয় তা হল বিষ্ণুপুর ঘরের এই গায়ক নিজে কয়েকটি রাগ রাগিণী সৃষ্টি করেছিলেন। ১৯৪০ সালে তিনি সৃষ্টি করেন ‘সুরেশ্বরী’ নামের একটি রাগিণী। এই সময়ই আবার যখন মহাত্মা গান্ধী অনশন করছেন তখন আবার সুরেন্দ্রনাথ তৈরি করেছিলেন ‘গান্ধী’ নামের একটি রাগ। এই ঘটনা আরও স্পষ্ট ভাবে আমাদের এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সাহায্য করে যে বিষ্ণুপুর ঘরানা বাংলার একমাত্র ঘরানা। এই সুরেন্দ্রনাথ আবার বাংলা ও হিন্দি ভাষাতে বহু গান রচনা করেছিলেন। এসবের সাথে সাথে সুরেন্দ্রনাথ তৈরি করেছিলেন বহু উল্ল্যেখযোগ্য ছাত্র ছাত্রী। তাঁরা হলেন লেডি অবলা বসু, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, সাহানা দেবী, মালতী ঘোষাল, রমা চৌধুরী, প্রমদা চৌধুরী, মিসেস আকুহার্ট, বিচারপতি উড্ররফ প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের পরিবার ছাড়াও যে যে গুণী ব্যক্তিদের গৃহে সুরেন্দ্রনাথ নিয়মিত শিক্ষা দিতে যেতেন তাঁরা হলেন যথাক্রমে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, দেশ বন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, এটর্নি ভুপেন বসু, ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় ও কুন্তলীনের হেমেন্দ্রমোহন বসু। শুধু তাই নয় সুরেন্দ্রনাথ নিয়মিত রবীন্দ্রনাথের দুই কন্যাকে গান শিখিয়েছেন। সত্যেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতেও তিনি নিয়মিত সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন।
