বাঁশের ডগায় বানর কিংবা ধোঁয়া ওঠা ট্রেন এঁকে মেয়েকে অংক শেখাতেন ‘তুতু-ভুতু’র স্রষ্টা ধীরেন বল

ষাট বছর পেরিয়ে আজও কচিকাঁচারা গোগ্রাসে পড়ে ‘তুতু-ভুতু’

ছোটোদের কার্টুন বলতেই মাথায় আসে ওয়াল্ট ডিজনি। মিকি মাউস আর ডোনাল্ড ডাক। কিংবা হানা-বারবারার ‘টম এন্ড জেরি’। আরো কিছুক্ষণ টিভির সামনে বসে থাকলে দেখতে পাওয়া যাবে ‘বাগস বানি’- ‘টুইটি’ পাখিদের মজার কাণ্ড-কারখানা। আচ্ছা, পশুপাখিরা যদি মানুষের মতো কথা বলত? আর তাদের ভাষাটা যদি হত বাংলা? এখনো বইমেলা গেলে, খুদেদের হাতে ‘তুতু-ভুতু’ কিংবা ‘চেঙা-বেঙা’ সিরিজ চোখে পড়বেই। এই মোবাইল-কম্পিউটারের যুগেও বইগুলো তো গোগ্রাসে পড়ে ছানাপোনারা। 

পড়বে নাই বা কেন! যেমন উজ্জ্বল মনকাড়া ছবি, তেমনই মিষ্টি লেখা। ছাইরঙা বিল্লি তুতুর, শাড়ি পরা মেনি-মার কাছে বকুনি খাওয়ার দৃশ্য এখনো মনে রেখেছে আবালবৃদ্ধবনিতা। খরগোশ-চেঙা আর কোলা-বেঙা লজঝরে গাড়ি নিয়ে পিকনিক করতে গিয়ে পড়ল মহাবিপদে। মাঝে গোলমাল পাকালো দুষ্টু নেংটি ইঁদুরটা। সেও অবিশ্যি একদিন বেজায় নাকাল হয়। কী মজা! যেমন কর্ম তেমনি ফল! 

এমনতর বই লিখলই বা কে? পাতায় পাতায় এমন মজার ছবিগুলি কার আঁকা? পেছনের মলাটে ছোট্ট জ্বলজ্বলে একটা নাম – ধীরেন বল।

ছোট্টবেলা থেকেই লেখালিখি শুরু। প্রিয় লেখকের নাম সুকুমার রায়। গ্রামের বাড়িতে নিত্য আসত সন্দেশ-শিশুসাথী। সেখানে নিয়মিত পাঠাতেন লেখা। কল্পনাপ্রবণ ধীরেনের মন চলে যেত প্রতিমার চক্ষুদানে। খাতা-পেন্সিল নিয়ে এপাড়া-ওপাড়া উড়ু উড়ু। ইস্কুল-খাতাটাও তাই হঠাৎই যেন হয়ে ওঠে ছোটোপত্রিকা। তখন তাঁর বয়স মোটে দশ। সেই যে তুলি ধরেছেন, ছাড়েননি আজীবন। 

গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে কমার্শিয়াল আর্ট নিয়ে পাশ করেছিলেন। এঁকেছেন একাধিক বিজ্ঞাপনের জন্য। নিম-সাবান, আমলা, হিমানির বিজ্ঞাপন এখনো সেকালের কাগজ ঘাঁটলে পাওয়া যাবে। নিপাট-ভদ্র নিরহংকারী প্রচারবিমুখ এক মানুষ। জীবনে একটিবারই নিজের আঁকা তিনটি ছবি পাঠিয়েছিলেন বার্মা শেল আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতে। বলা বাহুল্য, সবকটিই জিতে নিয়েছিল পুরস্কার।  

১৯৩৯-৪০ সাল নাগাদ নজরে পড়ে গিয়েছিলেন বিমল ঘোষ, ওরফে ‘মৌমাছি’-র। তিনিই ধীরেনকে নিয়ে আসেন আনন্দবাজারে। শিশু বিভাগে। বাকিটা ইতিহাস। আনন্দমেলার পাশাপাশি অবশ্য যুগান্তর, অমৃতবাজার, শুকতারা, মৌচাক, কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞানের মতো পত্রিকার পাতাও ভরে উঠেছিল তাঁর আঁকা ছবিতে। 

ছাইরঙা বিল্লি তুতুর, শাড়ি পরা মেনি-মার কাছে বকুনি খাওয়ার দৃশ্য এখনো মনে রেখেছে আবালবৃদ্ধবনিতা

রবিবাসরীয়তে সদ্য সহকারী হিসেবে তখন যোগ দিয়েছেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ইচ্ছা, লিখবেন কচিকাঁচাদের জন্য। বিমল ঘোষ ‘নীরেন’-কে নিয়ে এলেন ধীরেনের কাছে। তরুণ লেখককে সেদিন বলেছিলেন শিল্পী, “খেয়াল রেখো মনটা যেন বুড়িয়ে না যায়। সেটাকে সব সময় টাটকা তাজা রাখতে হবে।”

মেক-আপ করতে পারতেন অসম্ভব ভালো। একটি নাটকে রবীন্দ্রনাথ সেজেছিলেন বিবেকানন্দ ভট্টাচার্য। চেনাই যাচ্ছিল না তাঁকে। স্বপনবুড়ো বা অখিল নিয়োগী পেয়েছিলেন বিদ্যাসাগরের পার্ট। লহমায় তিনি হয়ে পড়লেন ‘বীরসিংহের সিংহশিশু’। তাঁদের সাজিয়েছিলেন ধীরেন বল। 

চিত্রশিল্পী বাবা ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকতে আঁকতে বোঝাতেন অঙ্ক। কন্যা পৃথা লিখছেন, “…অঙ্কটা শুনতেন, তার পর খানিকটা বোঝানোর পরে হাতের তুলি রেখে নিমেষে কখন আমাদের খাতায় পেনসিল দিয়ে এঁকে ফেলতেন একটা বাঁশের ডগায় লেজওয়ালা বানরের ছবি। কখনও দু-টানে দুটো মুখোমুখি ধোঁয়া ওঠা ট্রেনের ছবি। প্লাটফর্মের দৈর্ঘ্য বার করার জন্য।” এমন বাবা তো আর সবার হয় না !

সবমিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি বই। ঝুলিতে অজস্র পুরস্কার। লীলা মজুমদার ছিলেন তাঁর একাগ্র পাঠক। তাঁর একটি চিঠিতেই পাওয়া যাবে ধীরেনবাবুর সম্পর্কে উচ্ছসিত প্রশংসা। “আমাদের বন্ধু ধীরেন বলের মতো চিত্রশিল্পী আমাদের দেশে খুবই কম জন্মেছেন। ছোটদের জন্য তাঁর আঁকা ছবি যেন লাফায়-ঝাঁপায় মনকে নাড়া দেয়। ধন্য তাঁর তুলি কলম। কেবলই আমার দাদা সুকুমার রায়ের ছবির কথা মনে পড়িয়ে দেয়।”

তবুও প্রায় লোকচক্ষুর অগোচরেই রয়ে গিয়েছেন তিনি। তুতু-ভুতুদের বয়সও তো হলো প্রায় ষাটের কাছাকাছি। তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম, সদ্য অক্ষর চিনতে শেখা কচিকাঁচাদের মনে এখনো জায়গা করে নিচ্ছে তারা। 

ঋণ : আনন্দবাজার, পৃথা বল, পাপিয়া মিত্র,  খবর অনলাইন।
 

Developed by DXDasia