আজ ২০ জুলাই, ৪৮ বছর আগে নাট্যকর্মী প্রবীর দত্তের মৃত্যুর কথা…

আজকের ভিয়েতনাম জানতে হলে, আগে নিজের দেশটা ভালো করে জানতে হবে

জ ২০ জুলাই। ১৯৫৪ সালের এই দিনে জেনেভা সম্মেলন ঠিক করে ভিয়েতনাম (Vietnam) থেকে ফরাসি সৈন্যরা সরে যাবে। আগে ভিয়েতনাম ছিল ফরাসি উপনিবেশ। জেনেভা সম্মেলনের (Geneva Conference) পর ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ সরে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ইতালির মতো ফ্যাসিস্ট সরকারগুলোর সঙ্গে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেনের মতো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো দুর্বল হল। আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যমণি হয়ে উঠলো। 

১৯৫৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেভিড এইসেনহাওয়ার। তিনি জেনেভা সম্মেলনে বলেন ১৭ অক্ষরেখা ধরে ভিয়েতনাম ভাগ হবে। উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম। উত্তরের রাজধানী হলো হ্যানয় (Hanoi)। দক্ষিণের সাইগণ। উত্তর ভিয়েতনাম চালাবে কমিউনিস্টরা (Vietnam Communists)। দক্ষিণে বসবে আমেরিকার তাবেদার সরকার বাও দাই, পরে থিউ। কিন্তু কমিউনিস্টরা বললেন দক্ষিণ থেকেও সাম্রাজ্যবাদীদের তাড়াব। তবে যতটুকু সুযোগ জেনেভা সম্মেলনে পাওয়া গেছে সেটা মানব। উত্তরের কমিউনিস্ট সরকারের প্রেসিডেন্ট হলেন হো চি মিন। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফাম ভ্যান দং। ১৯৩০ সালে ভিয়েতনাম লাওস ও কম্বোডিয়া মিলে তৈরি হয়েছিল ইন্দো-চিনের কমিউনিস্ট পার্টি। সেই বড়ো পার্টির এক নম্বর নেতা ছিলেন চাচা হো। ১৯৫৪ সাল থেকে শুরু হল দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকা হটানোর যুদ্ধ। 

সে বছর হো চি মিন ভারতে এসেছিলেন। দিল্লি হয়ে কলকাতায় (Kolkata) আসেন। তখন কলকাতার ডেকার্স লেনে ছিল সিপিআই-এর দফতর। হো সেখানে যান। সে-সময় সিপিআই-এর রাজ্য সম্পাদক ছিলেন জ্যোতি বসু (Jyoti Bose)। এটাও মাথায় রাখতে হবে তখন ভারতের নেহেরু সরকারের বিদেশ নীতি ছিল প্রগতিশীল। চা-চা নেহরু চা-চা হো কে বলেন আমরা আপনাদের দাবি মানি । দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকা হটানোর লড়াই চলবে। আমেরিকার টাকার প্রবাহে পুরো দক্ষিণ ভিয়েতনাম না হোক, রাজধানী সায়গণ ছিল কিছুটা উন্নত। কমিউনিস্ট শাসিত উত্তর ছিল অন্নুনত। ততদিনে লাওস, কম্বোডিয়া আলাদা হয়ে গেছে। ইন্দো-চিন কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে তিনটি কমিউনিস্ট পার্টি (Communist Party) হয়েছে। ভিয়েতনামে দুটো নয়, একটাই কমিউনিস্ট পার্টি। ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টি।

১৯৫৪ সাল থেকে শুরু হল দক্ষিণ ভিয়েতনাম মুক্ত করার লড়াই। চা-চা হো বললেন শুধু কমিউনিস্টরা নয়, দেশের সবাই মুক্তি চাইছেন। তাই ডেমোক্রেটিক পার্টি, বুদ্ধিস্ট লিগ সবাইকে নিয়ে তৈরি হল ন্যাশনাল লিবারেশন ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট। কিন্তু অন্য দলগুলি আমেরিকাকে হটাতে চাইলেও তারা সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাস করতো না। জীবনযাত্রায় পুরো গান্ধিবাদী, কিন্তু চিন্তা ভাবনায় হঠকারিতা না করলেও প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন হো।

তখন ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক ছিলেন ট্রুওং চিন, মিলিটারি মন্ত্রী তথা গেরিলা যুদ্ধের নেতা ছিলেন ভো নগন গিয়াপ। দশ বছর পর আমেরিকা আরও আগ্রাসী হল। নাপাম নামে এমন এক বোমা ফেললো, যে মাটি ক্রমশ পুড়তে লাগলো। একে ইংরেজিতে বলা হত আমেরিকার স্কর্চ আর্থ পলিসি। সেই মাটিতে আর ফলন হবে না। হো বললেন ঘরের মেয়েরা অন্য কাজ করার ফাঁকে রাইফেল চালানো শিক্ষা নেবে। বিরাট লড়াই। চিনে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা করার জন্যে মাও সে-তুং সশস্ত্র বিপ্লব করতে বলেছিলেন। হো-ও তাই বললেন। দুটো দেশেই মানুষের ভোটাধিকার-সহ কোনো অধিকার ছিল না। ভারতের সঙ্গে এখানেই পার্থক্য। ভিয়েতনামের যুদ্ধ নিয়ে ১৯৬৫ সালে সাংবাদিক উইলফ্রেড লিখেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বই ‘ভিয়েতনাম’। ফরাসি সাংবাদিক লাখ চুরে লিখেছিলেন ‘হো চি মিন’। বাংলায় ১৯৬৬ সালে সৌরিন সেন লিখেছিলেন ‘ভিয়েতনাম’। এই তিনটি বই পড়ার জন্যে আমি ছটপট করতাম। তিনটি বই পড়তে পেরেছি বলে আমি গর্বিত না বললেও আনন্দিত।

১৯৭৪ সালে সত্যযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর

আবার ১৯৭১ সালে সিপিআইএমএল (CPIML) ছাড়ার সময় বুঝেছি লেনিন-মাও-চাচা-হো-ফিদেল সবাই বলেছেন দেশের অবস্থা না বুঝে অন্য দেশের লড়াইয়ের খবরে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই লড়াইয়ের নকল করতে যাওয়া আত্মহত্যার রাজনীতি করা। ওতে দেশের মানুষের কোনো লাভ হয় না। যেটা করতে গিয়ে ১৮৪৮ ও ১৯৬৯ সালে অনর্থক প্রচুর ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। দু-বারই দু-পবছরের মাথায় প্রচুর ক্ষতি স্বীকার করে হারতে হয়েছে। শত্রু ও নিজেদের শক্তির ভারসাম্য না বুঝে লড়াই করতে গেলে যা হয়। যাই হোক, ১৯৭১ সালে বিপর্যস্ত সিপিআইএমএল দলের কর্মীরা ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি শনিবার কার্জন পার্কে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে থাকে। গান, নাটক, কবির লড়াই হয়। ২০ জুলাই তারা ভিয়েতনাম দিবস (Vietnam Day) পালন করে। ১০০ কর্মী জড়ো হতেন। সংখ্যা বাড়িয়ে বলা আমার স্বভাব নয়। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঘটলো অঘটন। সেদিনও সাংস্কৃতিক কর্মীরা জড়ো হয়েছিলেন। হঠাৎ জমায়েত থেকে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করে। কর্মীরা ভ্যান ঘিরে বিক্ষোভ দেখায়। আরও পুলিশ আসে। বেপরোয়া লাঠি চালায়। লাঠির ঘায়ে ওখানেই মারা যায় ভবানীপুরের শাঁখারিতলার ১৭ বছরের নাটক অনুরাগী প্রবীর দত্ত (Prabir Dutta)। দীপা চ্যাটার্জি তাকে ট্যাক্সি করে মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যান। ততক্ষণে মৃত। তারপর হাসপাতালে পৌঁছান এপিডিআর-এর সঞ্জয় মিত্র। আসেন তখনকার সিপিআই যুব নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত। তিনি দু-ঘণ্টা হাসপাতালে ছিলেন। কিন্তু সঞ্জয়দা সারারাত কাটিয়ে সকাল থেকে দুপুর ময়নাতদন্ত পর্যন্ত ছিলেন। সেই ঘটনার প্রতিবাদে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে বিরাট সভা হয়। তারপর ১৯৭৭ সালের ২০ জুলাই উদ্যোগ নিয়ে সুজাতা সদনে একটি সভা করা হয়। সভাপতিত্ব করেন গণেশ ঘোষ। বক্তা ছিলেন অরুণ প্রকাশ চ্যাটার্জি, রাজ্য সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের নেতা সিপিআইএমের অরবিন্দ ঘোষ। সঞ্চালনার দায়িত্ব ছিল আমার। প্রবীর দত্তর মা রানু গুপ্ত পুলিশের বিরুদ্ধে কেস করেছিলেন। কিন্তু বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছিল।

আজ সেই ২০ জুলাই। ৪৮ বছর আগের কথা কমরেডদের একটু মনে করিয়ে দিলাম। ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল দক্ষিণ ভিয়েতনাম মুক্ত হয়েছে। দুটো ভিয়েতনাম এক হয়েছে। দেশের লোকসংখ্যা দশ কোটি। আজকের ভিয়েতনাম আমাদের জানতে হবে। তার আগে নিজের দেশটা ভালো করে জানতে হবে।

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia