অঞ্জনা, ডুলুং, নাগর, গুড়গুড়ে : নাম না-জানা নদীর উপকথা

বঙ্গদর্শন আয়োজিত বইমেলায় বইপড়া : ৪

…কোন কথা সারাদিন কহিতেছে অই নদী?–এ নদী কে?–ইহার জীবন
হৃদয়ে চমক আনে; যেখানে মানুষ নাই–নদী শুধু–সেইখানে গিয়ে
শব্দ শুনি তাই আমি–  আমি শুনি– দুপুরের জলপিপি শুনেছে এমন
এই শব্দ কতদিন; আমিও শুনেছি ঢের বটের পাতার পথ দিয়ে
হেঁটে যেতে–ব্যাথা পেয়ে; দুপুরে জলের গন্ধে একবার স্তব্ধ হয় মন;
মনে হয় কোন শিশু মরে গেছে, আমার হৃদয় যেন ছিল শিশু সেই;
আলো আর আকাশের থেকে নদী যতখানি আশা করে–আমিও তেমন
একদিন করি নি কি? শুধু একদিন তবু? কারা এসে বলে গেল, ‘নেই–
গাছ নেই– রোদ নেই, মেঘ নেই– তারা নেই–আকাশ তোমার তরে নয়!’–
হাজার বছর ধরে নদী তবু পায় কেন এই সব? শিশুর প্রাণেই
নদী কেন বেঁচে থাকে?…

-নদী, জীবনানন্দ দাশ

ত নদীর কাছে আমার কত মুহূর্ত গচ্ছিত আছে। শান্তিপুর যেতে যেতে ট্রেন হঠাৎ দাঁড়াল এক স্টেশনে। কোনো সমস্যা ছিল হয়তো, যতক্ষণ দাঁড়ায়, তার চেয়ে একটু বেশি দাঁড়াল। যাতে ধীরেসুস্থে স্টেশনের নাম পড়া যায়। কুন্তীঘাট! ঘাট মানে একটা নদীও তো থাকবে। আছে তো। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম কালো রঙের মেঘ ঝুঁকে পড়েছে একটা নদীর ওপর, একটা নৌকা বাঁধা আছে ঘাটে, মস্ত বট গাছের নিচে একটি বালক খেলা ভুলে বসে আছে, পেছন থেকে কে যেন ডাকছে, ‘খাবি আয়’…

‘খাবি আয়’ নদীর তীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে সেই স্বর, কুন্তী, রাজার ঘরে জন্মেও দুখিনী এক নারী, তার নামে নাম যে নদীর, ‘খাবি আয়’ শুনে তার কি একটু অভিমান হচ্ছে? তাকে কেউ ভাত খেতে ডাকার নেই, তার ফেরার কোনো ঘর নেই, তাকে কেবলই সামনের দিকে বয়ে চলে যেতে হয়। সেই নির্জন মেঘলা দুপুর, সেই ডাক আর অভিমানী নদী কুন্তী রয়ে গেছে বুকের ভেতর। তাকে নিয়ে একটা গল্পও লিখেছিলাম – মোহনা।

কীভাবে কেউ হয় নদ, কেউ হয় নদী – তা নিয়েও গভীর আলোচনা আছে এই বইয়ের দ্বিতীয় বিভাগে। আবর্তনীর আখ্যানমালাতে নদীর নাম কীভাবে এল, তার পেছনের লোকগল্প এবং তার ব্যাখ্যা আছে খুব সুন্দর করে। এই কাজটি, বোঝাই যায় করা হয়েছে ক্ষেত্র সমীক্ষা করে।

আরও একটা নদী দেখেছিলাম এমন নির্জন দুপুরে। তার নাম ছিল লিশ। মালবাজারের পথে পরপর এমন সব নদী- মাল, চেল, লিশ, ডায়না। লিশকে দেখেছিলাম বাস থেকে, বর্ষণক্লান্ত আকাশে কয়েকফালি শসার মতো শান্ত সবুজ মেঘ, নিচে সরু সেই নদী, তার বুকের জলের থেকে তীরের বালি বেশি। সেই বালির ওপর বসে আনমনে চুল খুলছিল দুটি মেয়ে, স্নানের যেন কোনো তাড়া নেই তাদের। নদীর কথা বললে আমার সেই দুপুরের অলস মায়ার কথাও মনে পড়ে।

নদীর কত যে গল্প। সেই মেয়েটি, যার নাম সরস্বতী, পিতা ব্রহ্মার কাম দৃষ্টি পড়েছিল যার ওপর, ছুটতে ছুটতে নদী হয়ে গেছিল। কেন? নদী হয়ে পুরুষের হাত থেকে বেঁচেছিল বুঝি? তাহলে গঙ্গা? সে তো শান্তনুর প্রস্তাব ফেরাতে পারেনি। একের পর এক আটটি সন্তান এসেছিল তার কোলে। প্রথম সাতটিকে সে ভাসিয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনায় নাকি ইঙ্গিত আছে সেই যুগে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির।

আসলে পুরাণের গল্প, কিংবা লোককথায় সমাজ, তার প্রথা, প্রকৃতির সংকট – সব নিয়েই ইঙ্গিত থাকে। যা নিছক গল্প মনে হয়, তার পেছনে সত্য থাকেই। সেই সত্য খুঁজতে চেয়েছেন বিশিষ্ট নদীবিজ্ঞানী ও প্রাবন্ধিক সুপ্রতিম কর্মকার। আগের বই ‘নদীজীবীর নোটবুক’ ছিল বিভিন্ন খবরের কাগজ ও পত্রিকায় তাঁর নদী বিষয়ক চিন্তাভাবনার একটি সংকলন। বাংলার নদীর ইতিহাস নির্মাণের যিনি পুরোধা পুরুষ, তিনি হলেন ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়। যিনি প্রথম বললেন বাংলার নদীগুলোর ইতিহাসই আসলে বাংলার ইতিহাস। বাঙালি ইতিহাস বিস্মৃত জাতি। সেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবার আগে বড়ো মমতায় বাংলার প্রাকৃতিক ধনসম্বল নদীগুলির ইতিহাস রচনার আন্তরিক চেষ্টা করেছেন সুপ্রতিম, নদীর দূষণ, জল রাজনীতি, ভবিষ্যতের জল সংকট – কিছুই প্রায় বাদ যায়নি। বড়ো মমতায় বিষয় ধরে ধরে নদীর সাতকাহন তুলে এনেছেন তিনি। নদী মানে তো তীরের মানুষ, চরের মানুষও,  তাদের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। নিবন্ধগুলি হয়তো দৈনিক সংবাদপত্রের জন্যে লেখা হওয়ায় খুব সংক্ষিপ্ত।

এবার ‘জলের ইতিকথা নদীর উপকথা’-য় তাঁর অনুসন্ধান আরও সূচিমুখ। এই বইয়ের দুটি বিভাগ- জলের ইতিকথা – তা মূলত আবর্তিত হয়েছে সৃষ্টিকথা ঘিরে। সারা বিশ্বে সৃষ্টিকথার একটা প্রধান উপাদান জল। সব ভাষাতেই সৃষ্টিতত্ত্বের নিজস্ব গল্প আছে, আর তাদের মধ্যে একটা ভীষণ মিলও আছে। প্রায় সব গল্পেই আছে মহাসমুদ্র কিংবা জনপদ তোলপাড় করে ভাসানো আসন্ন জলপ্লাবনের কথা। যেমন অবন ঠাকুরের একটি গল্পে আছে জন্ম থেকে কেঁদে চলা একটি শিশু, যে আসলে তার জনগোষ্ঠীর মানুষজনকে সতর্ক করতে চেয়েছিল আসন্ন প্লাবনের বিষয়ে। অথবা কূল নাই সীমা নাই অথই দরিয়ার সেই পানি বেয়ে সৃষ্টিকে রক্ষা করার লড়াই। নোয়ার নৌকা, মনুর মাছ সবই চলে যায় সমুদ্র বেয়ে। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে আছে ঈশ্বরের আত্মা জলের ওপর অবস্থিতি করিতেছিলেন। আরমেনিয়ান পুরাণে আছে লেভিয়াথান বলে একটা মাছের কথা, সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে তার নিজের লেজটাকে একবার কুট করে কামড়াতে। পারছে না। আর পারছে না বলেই ধবংসের হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছে পৃথিবী। হিন্দু পুরাণের বিষ্ণু অনন্ত শয্যায় আছেন, কিন্তু সে শয্যাটি ভাসছে পারাপারহীন জলরাশির ওপর। তাঁর দশটি অবতারের অন্যতম মীন। যজুর্বেদে তো একটি প্রার্থনাই আছে ‘পয়স্বতী প্রদিশ সন্তু মহ্যম’। অর্থাৎ দশদিক আমার জন্য জলময় হোক। জলে রেতঃপাত এবং তা থেকে মাছের গর্ভধারণ ঘুরে ঘুরে আসে পুরাণ কাহিনিতে। আমাদের মনে থাকতে পারে মহাভারতকার ব্যাসদেবের জন্ম-ইতিহাস। জলে ভাসা নৌকোর ওপর মিলনে যে শিশুর জন্ম তার শরীরে কিন্তু রয়েছে জলজীবী ধীবর জাতির রক্ত। এইভাবে জল যেমন আমাদের পৃথিবীকে ধারণ করে আছে, তেমনই আমাদের আদি কথাকেও ধারণ করে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রতীকী কাহিনি বোধহয় সমুদ্র মন্থন, মন্থন শেষে অমৃতের সঙ্গে বিষও উঠে আসে। আধুনিক পরিবেশবাদী দৃষ্টিতে দেখলে সে পুরাণকাহিনি কবে যেন সত্য হয়ে গেছে। আমরা এই পৃথিবীকে, তার নদী মাটি অরণ্যকে নির্বিচারে মন্থন করে দু-হাত ভরে বিষ তুলে এনেছি।

বাঙালি ইতিহাস বিস্মৃত জাতি। সেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবার আগে বড়ো মমতায় বাংলার প্রাকৃতিক ধনসম্বল নদীগুলির ইতিহাস রচনার আন্তরিক চেষ্টা করেছেন সুপ্রতিম, নদীর দূষণ, জল রাজনীতি, ভবিষ্যতের জল সংকট – কিছুই প্রায় বাদ যায়নি।

কীভাবে কেউ হয় নদ, কেউ হয় নদী – তা নিয়েও গভীর আলোচনা আছে এই বইয়ের দ্বিতীয় বিভাগে। আবর্তনীর আখ্যানমালাতে নদীর নাম কীভাবে এল, তার পেছনের লোকগল্প এবং তার ব্যাখ্যা আছে খুব সুন্দর করে। এই কাজটি, বোঝাই যায় করা হয়েছে ক্ষেত্র সমীক্ষা করে। যেমন তুলাই একটা ছোটো নদী, এখন মৃতপ্রায়। এর একটা ছোটো উপনদী আছে। তার নাম গাঙ্গুর। লোককথায় আছে এক তৃষ্ণার্ত দৈত্যকে ঘর থেকে এক কলসি জল এনে দেয় ছোট্ট মেয়ে তুলতুলি। তাকে দেখে ভালো লাগে দৈত্যের, চায় তাকে নিয়ে যেতে, সে তাকে রান্না করে দেবে। এইসব ভেবে যখন তুলতুলিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল দৈত্য, দূর থেকে দেখে তার বন্ধু গাঙ্গু। গাঙ্গু গিয়ে হাত চেপে ধরে তুলতুলির। তারপর দৈত্যের রাগের তাপে দুজনেই নদী হয়ে যায়। তুলতুলির নাম হয় তুলাই। গাঙ্গু হয় গাঙ্গুর। (আচ্ছা এই তুলাই নদীর পাড়ের চাল কি তুলাইপাঞ্জি?)

আমার বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল একটি মেয়ে। কথায় কথায় বলেছিল তার গ্রামে নদী আছে। নদী? কী নাম সে নদীর? সে জানিয়েছিল সে নদীর নাম সাতপুকুর। নদীর নাম সাতপুকুর! কী ভীষণ অবিচার মনে হয়েছিল এমন নাম।

প্রথম বিভাগের নদীর ভাষা – নদীর মতো ভাষা বড়ো চিত্তাকর্ষক। সুপ্রতিম সঠিক লিখেছেন, “নদীর সঙ্গে নদীর পারের ভাষার এক পরিবর্তন হয়। পাহাড়ের ভাষা যখন সমতলে নামে, সেই ভাষা নদীর স্রোতের মতো করেই পালটে যায়। ঠিক তেমনভাবেই নদীর উৎসের কাছের ভাষা আর নদীর মোহনার এলাকার ভাষা অনেক আলাদা।”

রায়ের ডাক থেকে যে নদীর নাম হল রায়ডাক, তার পারের মানুষরা ছড়া কাটে, ‘ডাক ভুলে যায় ডাক ডুকুরি/ ডাকুর বুকুর ছেরন ছাড়/ ডাকে রায়ডাক হুক্কীপানে/ রায়ডাকের বুক্কে বান হানে…’। এই অধ্যায়টি মাত্র সাড়ে সাত পাতার। যেন মুখের সামনে অমৃতকলস এগিয়ে দিয়ে আবার টেনে নেওয়া হল। সুপ্রতিমের কাছে অনুরোধ, পরের বইটি যেন হয় নদীর ভাষা নিয়েই, যার মধ্যে থাকবে নদীকেন্দ্রিক ছড়া গান, উৎসব সংস্কৃতির কথা।

গ্রন্থটির মুদ্রণ সৌকর্য মনোমুগ্ধকর। অ্যাকোয়া ব্লুতে আঁকা প্রচ্ছদটি কল্পনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সুদূরে।

________ 
জলের ইতিকথা নদীর উপকথা | সুপ্রতিম কর্মকার | প্রকাশক: ধানসিড়ি | প্রথম প্রকাশ: অগাস্ট ২০২৪ | প্রচ্ছদ: সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায় | মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা | কলকাতা বইমেলায় পাওয়া যাবে ধানসিড়ির ২২১ নং স্টলে

 

Developed by DXDasia