
বঙ্গদর্শন আয়োজিত বইমেলায় বইপড়া : ৩
দীর্ঘদিন। একরোখা বেঁচে থাকা আমাদের এই সাধারণের জীবনে কোনো ফিসফাস না করা রাত আসে। এমন কিছু রাতের মধ্যে পুরোনো কিছু গল্প ফিরে আসে। সেসব তখন আর স্মৃতিউপাদেয় থাকে না। স্মৃতিগুলো তখন আর নিছক স্মৃতি থাকে না, আবার কল্পনা হিসেবেও সে সবের স্থায়িত্ব থাকে না। এ এক অন্য ডিসকোর্সের প্রসঙ্গ, এর সঙ্গে আমার আজকের আলোচনার যোগসূত্র তৈরি করা যায়। মিশরের লেখক নাগিব মাহ্ফুজ-এর স্মৃতিকথার ইংরেজি অনুবাদ ‘দ্য ইকোস অফ অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’-র বাংলা অনুবাদ ‘আত্মজীবনীর প্রতিধ্বনি’ এ লেখার আলোচ্য বিষয়।
মিশরের লেখক নাগিব মাহ্ফুজের স্মৃতিকথার বাংলা অনুবাদ। অধিকাংশ স্মৃতিই কোনো একটা গল্প বলছে। বঙ্গদর্শন আয়োজিত বইমেলায় বইপড়ার ৩ নং লেখা পড়ুন
তৃতীয় বিশ্বের চিন্তাপ্রক্রিয়ার প্রতিফলন আমরা নাগিব মাহ্ফুজের অন্যান্য লেখাগুলির মতো তাঁর স্মৃতিকথার মধ্যেও পাই। যদিও ইংরেজি ও বাংলা উভয় অনুবাদেই ‘আত্মজীবনী’ শব্দটাকে ব্যবহার করলেও আমাদের বুঝতে হবে এই বইয়ের সব লেখাই প্রতিধ্বনি। কোথাও কোনো এক সময় ধ্বনি সৃষ্টি হয়েছিল তারই প্রতিধ্বনি এই বইয়ের বিভিন্ন লেখা। তাই অনেক প্রতিধ্বনির সমষ্টি এই বই।
আমরা প্রচলিত অভ্যেসে আত্মজীবনীর মধ্যে লেখককে খুঁজতে যাই। অনুপুঙ্খ জীবনকে ইতিহাসের তাগিদ থেকে জুড়ে নিই। অথচ একবারও ভাবি না যে নিজের সময়, সমকালের কথা অন্য এক সমকালে এসে সরাসরি ওভাবে স্মৃতিধর্মিতা বজায় রেখেও সেটা স্মৃতি-ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে না। স্মৃতিকে লিখতে গেলেও তো কল্পনা করতে হয় তাই স্মৃতিকথাও এক অর্থে কল্পকথন। আর বইপত্তর পরিবেশিত নাগিব মাহ্ফুজের আত্মস্মৃতির এই অনুবাদগ্রন্থ আরও খানিকটা ভিন্ন গোত্রের। এই বই সম্পর্কে ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকায় নাদিন গর্দিমার সেটাই লিখেছেন।
ইংরেজি অনুবাদ বইটাতে ২০৩টে স্মৃতির প্রতিধ্বনি আছে। আর বাংলা অনুবাদ বইতে ১০৭টার মতো প্রতিধ্বনি। ভালো লেগেছে যে একটা ফুরিয়ে যাওয়া সময়ের ধ্বনি আমাকে শুনতে হচ্ছে না, বরং আমার সমকালের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে সেসব ধ্বনির প্রতিধ্বনি শুনছি। আসলে এই প্রতিধ্বনিগুলো লেখকের আর সেসবের আরও ক্ষীণ প্রতিধ্বনি শুনছি এখন। মূল ভাষা থেকে ইংরেজিতে আরও প্রতিধ্বনিত হয়ে সেখান থেকে বাংলায় অনূদিত হওয়ার পর আরও আরও প্রতিধ্বনিত হয়ে আমার কাছে পৌঁছেছে। সম্পূর্ণ বইটা তরজমা করেননি তরজমাকারী শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়। তবে অর্ধেকের বেশিই তরজমা করেছেন। সঙ্গে একটি যথাযথ ভূমিকাও যোগ করেছেন। ভীষণ যত্ন নিয়ে বইটি পরিবেশন করেছেন বইপত্তর প্রকাশনা। আর অপরদিকে বইটির যথাযথ ভূমিকা এবং তরজমাকারীর কথা থাকলেও সেখানে মাহ্ফুজের সাহিত্যকীর্তির লম্বা তালিকার সঙ্গে এই একটি নির্দিষ্ট লেখার কী যোগাযোগ তা স্পষ্ট হয়নি। আর তরজমাকারীর কলমে গ্রন্থপ্রসঙ্গে লেখায় গ্রন্থপ্রসঙ্গে কিছু থাকলেও সেখান থেকে তরজমাকারীর অনুবাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়নি আমার কাছে। আর সেখান থেকেই স্পষ্ট করতে চাই এই তারিখবিহীন এক-একটা অণুস্মৃতির কথারূপের কী গুরুত্ব। অধিকাংশ স্মৃতিই কোনো একটা গল্প বলছে। যেভাবে বহু বছর পর মনের মধ্যে স্মৃতি ভেসে ওঠে আবার ডুবে যায়। এরকমই সেসবের স্থায়িত্ব। অথচ সেসবই একটি জীবনের ধ্বনির প্রতিধ্বনি বহন করে। একজন মানুষ সেভাবেই তৈরি। অনুভূতিমালা। অনুবাদের একটি নমুনা পড়লেই টের পাব তার প্রসাদগুণ আর অনুবাদের স্বচ্ছলতা। এই সুন্দর অনুবাদ বইটি লেখার দর্শনের সঙ্গে ঠিকঠাক বিচার করতে পেরেছে বলে মনে হয়েছে।
“বিস্মরণ
এই বুড়ো লোকটা কে, রোজ সকালে হাঁটতে বেরোয়, আর ব্যায়াম করে যতটা সাধ্যে কুলোয় তার?
ইনিই সেই শেখ, আরবি শিক্ষক, কুড়ি বছরেরও আগে অবসর নিয়েছেন।
যখনই ক্লান্ত বোধ করেন বসে পড়েন রাস্তার ধারে, বা কারও বাড়ির বাগানের পাথরের পাঁচিলে, লাঠি হেলিয়ে ঘাম মোছেন উড়ুনির খুঁটে। এলাকার সবাই তাঁকে চেনে, ভালোও বাসে; কিন্তু কদাচিৎ কেউ সম্ভাষণ জানায়, তাঁর দুর্বল স্মৃতি আর চোখ-কানের জন্য। তিনি ভুলে গেছেন আত্মীয়স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীদের, ছাত্রদের আর ব্যাকরণের নিয়ম।”
নিবিড়ভাবে না ভাবলে এই স্মৃতি নিছকই স্মৃতি। তবে প্রতিটি বাক্য ঠিকমতো পড়লে মাহ্ফুজের উদ্দেশ্য বুঝতে পারব আমরা। এ যে নিছকই বিস্মরণের গল্প না তা পরিষ্কার হয় যখন দেখি তাঁর বিস্মরণের জন্য তাঁর সঙ্গে কেউই প্রায় কথা বলে না, এই আখ্যান কিছুটা বিস্মরণের হলেও অনেকটাই নিঃসঙ্গতার। এমনতর স্মৃতিআখ্যান এই স্মৃতিকথনকে অনেক অনেক স্মৃতিকথার ভিড়ে নিজেকে সাহিত্যগুণে প্রাঞ্জল করে তুলেছে।
_____
আত্মজীবনীর প্রতিধ্বনি | নাগিব মাহ্ফুজ | প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ভূমিকা গ্রন্থপ্রসঙ্গে তরজা: শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায় | পরিবেশক: বইপত্তর | মুদ্রিত মূল্য: ২৪০ টাকা | কলকাতা বইমেলায় পাওয়া যাবে মনফকিরার স্টল ৫৭১-এ
