
ন্যাশনালিজমের নামে কি এবার কাউ সায়েন্স, গোট আর্টস, ডঙ্কি কমার্সও পড়ানো হবে?
গত কয়েক বছরে দেশে কৌতুক অভিনেতারা কখনও গ্রেফতার হয়েছেন, কখনও তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে, কখনও অভিযোগ উঠেছে তাঁদের ফোনে ভয় দেখানোর। এসব চলছিলই। রাষ্ট্র আমাদের বলেছে, হাসি নিষেধ। সবাইকে রামগরুড়ের ছানা নয়, রামগরুড়ের বাবা হয়ে থাকতে হবে। আমরা যে সে চেষ্টা করি না তা তো নয়, কিন্তু মাননীয় সরকার এমন সব কাণ্ড কারখানা করে চলেন, একের পর এক, একের পর এক, তখন আমরা তো কোন ছাড়, রামগরুড়ের নাতি-পুতিরাও অট্টহাসি হেসে ওঠে। খবরটা আপনাদের বলি। এতদিন সরকারের সমর্থক নেতা, মন্ত্রী কেউ বলতেন গরুর দুধে সোনা-দানা আছে, কেউ বলছিলেন গরুর পিঠে হাত বোলালে কেমোথেরাপি হয়, ক্যান্সার সারে, কেউ ঢক ঢক করে দু-পেগ গোমূত্র গিলে বলছেন, তাতে করোনার পোকা উড়ে যায়। এসবও চলছিল। কেউ ফিক ফিক, কেউ হি হি, কেউ মুচকি, কেউ হো হো, কেউ হা হা, কেউ চোখ টিপে, কেউ অট্টহাসি হাসছিলেন। এরই মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় যারা চালায়, সেই ইউজিসি বলে বসল, গরু নিয়ে এবার অনলাইনে পরীক্ষা দিতে হবে। দেশ জুড়ে ছি-ছি শুনে সে পরীক্ষা অবশ্য আপাতত পিছিয়ে গিয়েছে, কিন্তু এমন একটা খবর থেকে আমরা পাঠককে বঞ্চিত করতে চাই না বলে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
কামধেনু গো-বিজ্ঞান প্রচার-প্রসারের পক্ষ থেকে একটি নোটিশ
খবরটা ছিল এরকম- দেশের রাষ্ট্রীয় কামধেনু আয়োগের উদ্যোগে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘কামধেনু গো-বিজ্ঞান প্রচার ও প্রসার পরীক্ষা’ হতে চলেছে। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সেই পরীক্ষায় বসার জন্য শিক্ষকরা যাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেন, এমনই নির্দেশ দিয়েছেন ইউজিসির সচিব রজনীশ জৈন। পরীক্ষায় বসলে মিলবে শংসাপত্র। তাতে ব্যচেলর অফ সায়েনস ব্র্যাকেটে কাউ বা মাস্টার অফ সায়েন্স ব্র্যাকেটে কাউ লেখা থাকবে কি না তা অবশ্য স্পষ্ট করে ওই খবরে বলা হয়নি।
বিরোধীরা বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেননি। তারা বলেছেন, গরু দিয়ে শুরু হয়েছে এরপর যে ছাগল, গাধাও পর পর আসবে না তার গ্যারেন্টি কী? এখন স্কুলে ছেলে-মেয়েরা সায়েন্স, আর্টস, কমার্স পড়ে। এরপর হয়তো ন্যাশনালিজমের নামে কাউ সায়েন্স, গোট আর্টস, ডঙ্কি কমার্সও পড়ানো হবে।
আর সরকারের মাথা থেকে যখন এই সব থট-প্রোভোকিং আইডিয়া বেরোচ্ছে, ঠিক তখনই আমাদের হরি ঘোষ শোনালেন সুইস ব্যাংকে জমা রাখা কালো গোরুর গল্প।
রাষ্ট্রীয় কামধেনু আয়োগ সংস্থা আসলে কী
আপনারা বিশ্বাস করুন আর না করুন আমাদের সাংবাদিকের সঙ্গে হঠাৎই দেখা হয়ে গেল হরি ঘোষের। কোন হরি ঘোষ বলুন তো? সেই যে, সবাই বলে, হরি ঘোষের গোয়াল, সেই হরি ঘোষের। হরিবাবুর নাকি কোটি কোটি গরু ছিল। তখন নাকি, খবরের কাগজে প্রতিদিন বড়ো বড়ো গরুর ছবি ছাপা হত। কোন গরু কী বলল, তা নিয়ে কাগজে লিড হত। গরুদের কোনও ‘কারিয়োকর্তা’ মারা-টারা গেলে গার্ড অফ অনারও দেওয়া হত গরুদের। হরিবাবু নাকি খবর পেয়েছেন তেমনই সুদিন ফের আসতে চলেছে। তাই খবর-টবর নিতে তাঁর কলকাতায় আসা। সে যাই হোক, হরিবাবু বলে চললেন, এসব অনেক আগের কথা, হরি ঘোষের গোয়াল তখন বাড়তে বাড়তে একটা দেশ হয়ে উঠেছিল। সেই দেশেরই প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন হরিবাবু। কোথায় দেখা হরি ঘোষের সঙ্গে সঙ্গে? এই দিন কয়েক আগে আমাদের রিপোর্টারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল কলকাতার প্রিন্সেপ ঘাটে। তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। চারিদিকে জনমানুষ নেই। শীতকাল। চোখে পড়ল, একটা পাগড়ি পরা বয়স্ক দাড়িওয়ালা লোক গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার করো আমারে’ গাইছেন। রিপোর্টার গিয়ে আলাপ করতে যে গল্প তিনি শোনালেন, তা এখানে হুবহু তুলে দেওয়া হল।
হরিবাবু বলে চললেন, দেশে তখনও কোটি কোটি গরু ছিল। গরুদেরই যুগ ছিল সেটা। সব গরুই সাদা রঙের ছিল। আজকাল আপনারা যেসব লাল, কালো, ছোপ-ছোপ নানা ধরনের গরু দেখেন, সেসব তখন ছিল না। সব সাদা গরু। আর প্রতিটি সাদা গরু পিছু কর দিতে হত নাগরিকদের। যার যত সাদা গরু, তার তত কর। গরু থেকেই রাজকোশের যাবতীয় আয় হত। গরু ছিল আমাদের মায়ের মতো। ভালো ভালো সাদা গরু তখন দোভাষী নিয়ে ঘুরত। গরুরা ওদের হাম্বা ভাষায় যা বলত, দোভাষী তার অনুবাদ করে দিত। অনেকেই গরুকে বাড়িতে শাড়ি পরিয়ে মায়ের আদরে রাখত। হরি ঘোষ বলে চললেন আমি তখন ‘স্বচ্ছদেশ’ কর্মসূচি চালু করেছিলাম। এমন সময় খবর পাওয়া গেল, কর ফাঁকি দিতে আমার দেশের বড়ো বড়ো গরুওয়ালারা বহু সাদা গরুকে কালো রং করে লুকিয়ে রেখেছে। সুযোগ বুঝে সেই সব কালো গরু তারা বিদেশে পাচারও করে দিচ্ছে। দেশে রাজস্বের ক্ষতি হচ্ছে। আর আমাদের কর আদায় কমে যাচ্ছে। আগে জানতাম ব্যাঙ্কে শুধু টাকা রাখা হয়। বিদেশি ব্যাঙ্কে কালো টাকা লুকিয়ে রাখে কেউ কেউ তাও আমরা জানতাম। কিন্তু পরে জানা গেল এখন নাকি ব্যাঙ্কে গরুও রাখা হচ্ছে। খবর পাওয়া গেল বিভিন্ন বিদেশি ব্যাঙ্কে কোটি কোটি ভারতের কালো গরু জমা রাখা আছে। এর মধ্যে ভোট এসে গেল। তখন আমি ভোটারদের খুশি করতে বললাম, বিদেশি ব্যাঙ্কে রাখা সব কালো গরু ফিরিয়ে এনে ফের সাদা রং করে নাগরিকদের মধ্যে বিলিয়ে দেব। প্রত্যেকে কম করেও ১০০০ করে গরু পাবে। বলে তো দিলাম। পরে বুঝলাম, ওই কালো গরুর দঙ্গল বিদেশি ব্যাঙ্ক থেকে ফিরিয়ে আনা আমার কম্ম নয়। ওসব আমি পারব না। যতই ৫৬ ইঞ্চি ছাতি বলে লাফাই না কেন। অত সাহস আমার নেই। তখন আমি লোকের দৃষ্টি ঘোরাতে দেশে যত সাদা গরু ছিল, দিলাম তাদের বাতিল করে। ঘোষণা করলাম, গোয়ালে যার যত সাদা গরু আছে, আমাদের কাছে নিয়ে এলে সেগুলো জমা রেখে আমরা তাদের গায়ে ‘স্বচ্ছদেশ’ সিল মারা নতুন কড়কড়ে সাদা গরু দিয়ে দেব। আর ওই সব বাতিল সাদা গরুদের আমরা গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দিতে শুরু করলাম।
এমন চলতে থাকল। মাস গেল, বছর গেল। গরু বদল চলতেই থাকল। শেষ আর হয় না। পুরোনো সাদা আসছে। নতুন সাদা যাচ্ছে। সেই পুরোনো সাদাকে জঙ্গলে ছাড়া হচ্ছে। সে এক অন্তহীন প্রক্রিয়া। এদিকে হল কী জঙ্গলে তো কোটি কোটি গরুর থাকার জায়গা নেই। অত খাবারও নেই। গরুরা সংখ্যায় এত বেশি হয়ে গেল যে খিদেয় তারা দল বেঁধে সব গাছ-পালা, এমন কি জঙ্গলের বাঘ সিংহ, গন্ডার, জলে কুমির, হিপো সব খেয়ে ফেলল। তার পর লাখে লাখে গরু হাম্বা ডাকতে ডাকতে শহরে-গ্রামে ঢুকে পড়ল। তখন অ্যান্টি ন্যাশনালরা দুষ্টুমি করে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে আসা ওই লাখ লাখ পুরোনো সাদা গরুর গায়েও জাল সিল তৈরি করে আমার ‘স্বচ্ছদেশ’ স্লোগানের সিল মেরে দিল। পুরোনো সাদা, নতুন সাদা সব গরু এক রকম হয়ে মিলে মিশে সব গেল গুলিয়ে। আর হুড়মুড করে আমার অর্থনীতি ভেঙে পড়ল।
এই বলে হরিবাবু পাশে রাখা চটের বস্তাটায় হাত বোলাতে লাগলেন। আমি বললাম কী আছে ওই বস্তায়? হরিবাবু ফিসফিস করে বললেন, ভেঙে পড়া অর্থনীতির হাড়গোড়। গরু নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে দেশটাই গোবর হয়ে গেল। দেখি যদি কোনও দিন ফের জোড়া-টোড়া দিতে পারি, তাই এগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়াই।
