
বাংলা নিয়ে কি আমাদের কোনও অন্তর্গত চাহিদা আছে? তাগিদ আছে?
পৃথিবীতে এমন বহু লেখককে পাওয়া যাবে যাঁরা মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা করেননি। ভারতীয় অনেক লেখকও ইংরেজিতে লিখে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছেন। ভাষা নিয়ে অতি আবেগ, শুচিবাই অর্থহীন। আবদুল ওদুদের লেখা বই ‘বাংলার জাগরণ’-এর নতুন সংস্করণের ভূমিকায় সম্পাদক আবুল কাসেম ফজলুল হক লিখেছেন, ‘অন্তর্গত চাহিদার তাগিদে আর ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির অভিঘাতে বাংলার চিন্তানায়ক ও কর্মনায়কদের মধ্যে উনিশ শতকের শুরুতেই এক মহান নবচেতনার প্রকাশসূচিত হয়। এই নবচেতনা তাঁদের তাড়িত করে ধর্মসংস্কার ও সমাজসংস্কার প্রচেষ্টায়, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ও নতুন সাহিত্যসৃষ্টিতে। এ-উপলক্ষে কলকাতায় পর্যায়ক্রমে দেখা দেয় নতুন নতুন কর্মযজ্ঞ। রামমোহন-দেবেন্দ্রনাথ-কেশবচন্দ্রের চিন্তাধারা ও ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারপ্রচেষ্টা, ডিরোজিও-ডেডিড হেয়ার ও ইয়ং বেঙ্গলদের বিচারপ্রবণতা আর উদ্দাম কর্মকাণ্ড, রাধাকান্ত-ভবানীচরণ ও ধর্মসভার প্রতিক্রিয়া, অক্ষয়কুমার-বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমের কর্মমুখী বলিষ্ঠ চিন্তাধারা, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-অরবিন্দের নতুন ধর্মোপলব্ধি ও প্রচারকার্য, ঈশ্বরগুপ্ত- প্যারীচাঁদ-মধুসূদন-দীনবন্ধু-বঙ্কিমচন্দ্র-কালীপ্রসন্ন ঘোষ- গিরিশ ঘোষ-দ্বিজেন্দ্রলাল-রবীন্দ্রনাথ-ত্রিবেদী-শরৎচন্দ্র প্রমুখের সাহিত্যকর্ম, জগদীশবসু- প্রশান্ত মহলানবিশ-মেঘনাদ সাহা-সত্যেন বসুর বিজ্ঞানসাধনা, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-দীনেশ সেনের শিক্ষাব্রত, আবদুল লতিফ-আমির আলির চিন্তা ও কর্ম, বেগম রােকেয়া ও লুতফর রমানের চিন্তাধারা ও সংস্কারপ্রচেষ্টা, নজরুলের সৃষ্টিপ্রয়াস, এস ওয়াজেদ আলি, মোহম্মদ ওয়াজেদ আলি, মোহম্মদ বরকতুল্লাহ, আবুল হুসেন ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, ওদুদ-মোতাহারের সষ্টিসাধনা, প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল ধারার সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র…’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই যে একটা সামগ্রিক কর্মযজ্ঞের কথা বলা হচ্ছে, এই চেতনা আসলে, কেড়ে নেওয়া স্বাধীনতার বিপরীতে এক দুর্বার শক্তির জেগে ওঠা। নতুন মূল্যবোধের জন্ম। মূল্যবোধ কথাটা আমি এখানে মরালিটি অর্থে ব্যবহার করেছি।
ভালোবাসা দিবস, বাবা দিবস, মা দিবস থেকে শুরু করে অগুন্তি দিবসের কথা আমরা জানি। ভাষাদিবস তার থেকে আলাদা, কারণ, বাংলাভাষা কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ভাষা-আধিকার রক্ষায় শাসকের অত্যাচারের মুখে জীবনদানের কথা বলে এই দিন।
পৃথিবী যুক্তি দিয়ে চলে না। ক্ষমতার চরিত্রই হল সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া। যখন বেশিরভাগ মানুষ মনের তাগিদে, প্রাণের টানে, যুক্তি-প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে, সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাঙালির ইতিহাসের তেমনই কয়েকটি পৃষ্ঠা, ভাষা আন্দোলন, ‘আমি কি ভুলিতে পারি’! যে ইতিহাসের পাতা ওল্টানোর কালে ‘তর্জনীতে রক্তের দাগ’ লেগে থাকে। বাঙালি এই ইতিহাস ভুলবে না। কিন্তু তাতে, এই বাংলায়, পশ্চিমবঙ্গে, বাংলা ভাষার সংকট কাটবে না। ধরা যাক পৃথিবীতে ২৫ কোটি বাঙালি। তার মধ্যে ১০ কোটি এই আমাদের রাজ্যে। শুরুতেই একটা কথা বলা হয়েছে, ‘অন্তর্গত চাহিদার তাগিদ’। বাংলা নিয়ে কি আমাদের কোনও অন্তর্গত চাহিদা আছে? তাগিদ আছে?
মাঝে একটা আন্দোলন অনেক রাজ্যেই হয়েছে, এখনও মাঝে মধ্যেই শোনা যায়। কালো রং দিয়ে নিজের রাজ্যের ভাষা বাদে বাকি সব ঢেকে দেওয়া। ৯০-এর দশকে এই কাজের সঙ্গে যুক্তদের একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে ‘বাংলাবাজ’ বলে ব্যঙ্গ করলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-সহ বহু বিশিষ্ট মানুষ প্রতিবাদ করেছিলেন। তারপরেও প্রায় আড়াই দশক কেটে গেল। বাংলা ভাষা ভালো আছে, এমন বলা যাবে না। বাংলা ভাষাকে ভালো রাখতে যারা সরব, তাদের প্রায় সবসময়ই দেখা যায়, অন্য ভাষাকে আক্রমণ করতে। সোশ্যাল মিডিয়াতেই মাঝে মধ্যে সাহসী বাঙালি যুবকদের কোনও ছোট-খাট অবাঙালি ব্যবসায়ীকে ঘিরে ধরে প্রশ্ন করতে দেখা যায়, কেন ওই মানুষটি বাংলায় কথা বলছেন না। সঙ্গে হম্বি-তম্বিও চলে। এই সব স্বঘোষিত বাংলা-সৈনিকদের হাতে বাংলা ভাষা খুব নিরাপদ, তা তাঁদের আচরণ দেখে আমার মনে হয়নি। বিকাশ ভট্টাচার্য মেয়র থাকাকালীন কলকাতা পুরসভার ট্রেড লাইসেন্সের ফর্মের একেবারে নিচে সর্ষেদানার সাইজের হরফে লেখা চল হয়েছিল, হয়তো সে নিয়ম এখনও আছে, দোকানের নাম অন্য ভাষার সঙ্গে বাংলাতেও লিখতে হবে। ভালো নিয়ম, কিন্তু আইনের সাহায্যে বাংলাকে সুরক্ষা দিতে হচ্ছে মানেই তো, কারণ যাই হোক, আসলে ভাষায় অপুষ্টির কামড়। সাইনবোর্ড লেখা নিয়ে আইন করে ভাষার মান-সম্মান বৃদ্ধি করা যাবে বলে মনে হয় না।
বাংলার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার পিছনে অনেক কারণের মধ্যে একটা হল, নকশালপন্থী আন্দোলন। এ এক অদ্ভুত মিল। একদা পরাধীন ভারতে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে দলে দলে ছাত্র-ছাত্রীরা লেখা-পড়া ছেড়ে রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আবার দেখা গেল, স্বাধীনতার ২০ বছর পরে একেবারে ভিন্ন মেরুর রাজনীতিবিদ চারু মজুমদারের ডাকে শত শত ছেলেমেয়ে লেখা পড়া ছেড়ে এসে রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রশ্ন জাগতেই পারে, স্কুল কলেজের লেখাপড়া সম্পর্কে চারু মজুমদারের ধারণাটা ঠিক কী রকম ছিল। ১৯৬৫ সালে জেল থেকে চারুবাবুর স্ত্রী লীলা মজুমদারকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, তিনি একজন সাধারণ বাবার মতোই সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হতেন, এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করলে খুশি হতেন। যে যত পড়ে সে তত বড়ো আকাটমুখ্যু, ৬৫ সালেও তিনি ভাবছেন না। অথচ কিছুদিনের মধ্যেই স্কুল কলেজ পোড়ানো, লাইব্রেরি জ্বালানো, পরীক্ষা ভন্ডুল তিনি সমর্থন করছেন। কেন এই পরিবর্তন, তার স্পষ্ট উত্তর মেলে না। তিনি আসলে ভেবেছিলেন চিনের ধাঁচে সাংস্কৃতিক বিপ্লব জাতীয় কিছু একটা হচ্ছে-টচ্ছে। সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ছিল, তা পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে। চারু মজুমদার ক্যাডারদের বলতেন, লিখেওছিলেন, একটা খবরের কাগজ ভালো করে পড়লেই অনেকের সঙ্গে তর্ক করা যায়। বলতেন, রেডবুক পড়লেই কমিউনিস্ট হওয়া যায়। এই সময়ই আক্রমণ, হামলা ইত্যাদি করে বাঙালি মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের নাগালে থাকা বহু নামী স্কুলের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। উচ্চবিত্তদের স্কুলগুলি মোটামুটি এই বিপ্লবের আঁচের বাইরে থাকল। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার ঝোঁক বাড়তে শুরু করল। বাংলা মাধ্যম স্কুল ধীরে ধীরে দুয়োরানি হয়ে উঠল। হাতে গোনা কিছু স্কুলে ছাড়া ছেলে-মেয়েরা বাংলা শিখছে না। বাংলা বই পড়ছে না। অনলাইনের বাজারে, বাঙালি যেখানে ২০-২৫ কোটি, কলকাতায়, নামী লেখক মানে (রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বলছি) সুনীল, শক্তি, শংকর, বা বিভূতিভূষণ, প্রেমেন, মানিক… এই তালিকাটা মেরে-কেটে ৫০-৬০ বা ৮০ জনের হবে, এর বাইরের লেখকদের লেখা বাঙালি পড়ে না। অতি উঁচু মানের প্রবন্ধ, উপন্যাস, কবিতা, নাটক কিন্তু বাংলায়, এই পশ্চিমবঙ্গে লেখা হচ্ছে। ইংরেজিতে যা লেখা হচ্ছে তার থেকে মানের বিচারে কোনও অংশে কম তো নয়ই, অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েও আছে বাংলা লেখা। কিন্তু সেসবের বিক্রি নেই। প্রকাশকদের দেখেছি, এক বছরে ৩০০ কপি বই বিক্রি হলে নিজেদের ধন্য মনে করেন। ভাবুন, ২৫ কোটি বাঙালি আর ৩০০ কপি বই এক বছরে।
আরও পড়ুন: তোমাদের ভালোবাসা এখনও গোলাপে ফোটে?
কেউ ষড়যন্ত্র করেনি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে। সমস্যার মূল কারণ ‘আত্মঘাতী বাঙালি’। বাংলায় যত উঁচু মানের ‘লিটল ম্যাগাজিন’ বেরোয়, এমন নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। এই সম্পদ সম্পর্কে বাঙালি উদাস। একটা ব্যক্তিগত উদাহরণ দিই। এই শহরে ৪০ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি। একটা লেখা বাংলায় লিখলে একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক যা পান, একজন এলেবেলে সাংবাদিক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, প্রথম সারির কোনও হিন্দি কাগজ বা কোনও ইংরেজি কাগজ থেকে ওই একই লেখার জন্য পাঁচ-ছ’গুণ বেশি টাকা পাওয়া যায়। এটা বাংলা ভাষার প্রতি লেখকদের আকর্ষণ বৃদ্ধি করার মতো তথ্য নয়। পশ্চিমবঙ্গে ১০ কোটি জনসংখ্যা। অথচ সব মিলিয়ে প্রতিদিন ১০ লক্ষ খবরের কাগজ এখন বিক্রি হয় কি না সন্দেহ। বাঙালি কাগজ কেনে না। কাগজের দাম বাড়িয়ে ক্ষতি সামাল দিতে গেলে বিক্রি আরও কমে যাবে, এই ভয়ে বাংলা কাগজ ক্রমাগত সরকারি অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এখনই দেখা যাচ্ছে, সেরা ছেলে-মেয়েরা আর বাংলা সাংবাদিকতায় আসতে সাহস পাচ্ছে না। বাংলা নাটকের সুনাম সারা দেশে। ক’জন বাঙালি বাংলা নাটক দেখেন? যে কোনও মলে গিয়ে এক ঘণ্টা দাঁড়ান, দেখবেন, আড়াই-তিন হাজার টাকার ব্র্যান্ডেড জামা, জুতো, রোদ-চশমা, বেল্ট হু-হু করে বিক্রি হচ্ছে। আর তিনশো টাকা দামের বাংলা বই বিক্রি করতে প্রকাশকের জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে, নাটকের টিকিট কাউন্টারে মাছি উড়ছে।
তাহলে কি বাংলা ভাষা, বাংলা বই, বাংলা নাটকের মৃত্যু হবে? তা কখনই হবে না। যেমন চলছে এমন চলতে থাকলে, ভবিষ্যতে হয়তো এমন হবে, বাঙালি সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশ, ভালোবেসে, প্রাণের টানে, এই আরাধনা চালিয়ে যাবেন। এঁরা কিন্তু মানিকের মদন তাঁতি নন। এঁরা কেউ আর গামছা বুনবেন না। এঁরা নিশ্চিত জয়ী হবেন, কারণ ভাষাটা, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ, কমলকুমার, বিনয়, শক্তি, শঙ্খ ঘোষের ‘বাংলা’ ভাষা।
