
ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে নিয়মিত রবি ঠাকুরের পুজো হয় এই বাড়িতে…
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট। সারা দেশ মেতেছে স্বাধীনতার আনন্দে। দক্ষিণ কলকাতার এক স্কুলছাত্রী নিজের হাতে সেলাই করে বানিয়ে ফেলল স্বাধীন ভারতের পতাকা। তাতে জ্বলজ্বল করছে একটা শব্দ – ‘বন্দেমাতরম্’। রানি রাসমণির জামাই মথুরামোহন বিশ্বাসের বংশধর এই মেয়েটির নাম অনিমা বিশ্বাস। মথুরা্মোহন এবং জগদম্বার তিন ছেলের মধ্যে একজন ছিলেন দ্বারিকানাথ। দ্বারিকানাথের ছেলে গুরুদাস বিশ্বাস এখনকার ভবানী সিনেমার উলটো দিকে রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনের পাশে একটি বাড়ি তৈরি করেন, নাম দেন ‘কমলা কুটির’। এই বাড়িতেই গুরুদাসের বংশ থাকতে শুরু করেন'। অনিমা বিশ্বাস (বিয়ের পর ‘মণ্ডল’) যে পরিবারেরই সন্তান। গুরুদাসের ছেলে শিবনাথ বিশ্বাসের সেজ মেয়ে তিনি। ‘কমলা কুটির’ বাড়িটি যদিও গুরুদাস বিশ্বাস তৈরি করেছিলেন, এই জমিটি কিন্তু তাঁর কেনা নয়, এটি দানপত্র যোগে পাওয়া জমি। মথুর বাবুর পরিবার ছিল বাংলার আদি ভূস্বামী বংশগুলির একটি, অবিভক্ত ২৪ পরগনায় ছিল তাঁদের জমিদারি। রাসমণির পরিবারে বিয়ের সূত্রে মথুর বাবু জানবাজারে যে জমি-জমা সম্পত্তি পেয়েছিলেন, তার বাইরেও কলকাতায় মথুরামোহনের আরও সম্পত্তি ছিল। নিউ মার্কেটের কাছে এরকমই একটি জমিতে দ্বারিকানাথ বাস করতেন। সেই বাড়ি বিক্রি হয়ে যায় দেনার দায়, যে কারণে ‘কমলা কুটির’ তৈরি করার প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

‘কমলা কুটির’-এর দেওয়ালে দেওয়ালে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে বনেদি সংস্কৃতির আশ্চর্য পরিশীলন। শরৎকালে মাসের প্রথম শুক্র শনি রবি এখানে আলপনা পরব হয়। বিচিত্র সব আলপনায় সেজে ওঠে গোটা বাড়ি। শীতকালে হয় পৌষ পরব। এই বছর থেকে ভাদ্র মাসে ঘুড়ি পরব শুরু হয়েছে। এত সব পরবের সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যেক মাসের প্রথম শনি রবি সকালে এখান থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে নানা রকমের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মুক্ত জৈব খাবার, যে আয়োজনের পোশাকি নাম ‘বিষমুক্ত হাট’। দ্বারিকানাথ পরিবারের বর্তমান তথা শেষ প্রতিনিধি গৌতম মণ্ডল একজন পরিবেশকর্মী। এই হাট রমরমিয়ে চলছে তাঁর উদ্যোগেই। প্রতি বছর ২৫শে বৈশাখ আর ২২শে শ্রাবণেও হয় অনুষ্ঠান। তবে কমলা কুটিরে এখন বিশ্বাস পরিবারের কোনো সদস্যই থাকেন না। সিদ্ধার্থ বিশ্বাস ফ্ল্যাট নিয়েছেন গড়িয়ার কাছে, দেবপ্রসাদ বিশ্বাস কর্মসূত্রে চলে গিয়েছেন কানাডায়। তাঁদের বোন অনিমাদেবীর ছেলে গৌতম মণ্ডল বাবার বাড়ি টালিগঞ্জ রোডে থাকেন।

বিশ্বাস পরিবারের কেউ এখানে থাকেন না ঠিকই, তা বলে কিন্তু এই বাড়ি এখনও পোড়ো হয়ে যায়নি। ২০০৯ সাল থেকে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সত্যব্রত চৌধুরীর সভাপতিত্বে একটি ট্রাস্ট গোটা বাড়িটার তত্ত্বাবধান করে। কমলা কুটির বাড়িটির দেখভালে নিযুক্ত আছেন অন্যতম ট্রাস্টি সীমা বিশ্বাস। নিয়মিত এই বাড়িতে মঞ্চস্থ হয় অন্তরঙ্গ নাটক, আয়োজিত হয় নানা বিষয়ে আলোচনা সভা, শিল্প প্রদর্শন আরও অনেক কিছু। যখন এখানে বিশ্বাসেরা থাকতেন সেই সময়েও দুর্গাপুজোর পর এই বাড়িতে পাড়ার বিজয়া সম্মেলনী হত, সরস্বতীপুজোর নাটক হত ঠাকুরদালানে। নামী রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় গান গেয়ে গেছেন তখন। সেই ঐতিহ্যই লালন করে নিয়ে চলেছে এখনকার ট্রাস্ট। ‘প্রাচ্য’, ‘জেড গ্রুপ’, ‘আয়না’র মতো বিভিন্ন নাটকের দল এখানে নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে রিহার্সাল করে। এই সব দলের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখে ব্যারাকপুরের নাট্যদল ‘বিসর্গ’।

নানান অনুষ্ঠানে জমজমাট ‘কমলা কুটির’-এ যদি কখনও যান, ঠাকুরের আসনে পূজিত রবীন্দ্রনাথের মূর্তিটা দেখে আসতে ভুলবেন না। একটা মন ভালো করা গল্প রয়েছে এই মূর্তির পেছনে। অনিমাদেবীর পালিতা মেয়ে সীমা বিশ্বাস অনেকদিন আগের এক সকালবেলা ডাস্টবিনে নোংরা ফেলতে গিয়ে এই মূর্তি দেখতে পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভক্ত সীমাদেবী তখনই মূর্তিটা তুলে পরিষ্কার করে ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে রীতিমতো ফুল বেলপাতা দিয়ে তার পুজো শুরু করেন। এখনও লোকনাথ, চৈতন্যদেব, জগন্নাথের ছবির সঙ্গে কৃষ্ণের গোপাল মূর্তির ঠিক পাশে বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ দ্রষ্টার ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছেন পেছনে হাত দিয়ে।

ছবি সূত্র – অনীক মিত্র
