
রসগোল্লার মতো, কলকাতা-চিৎপুরের আতরেরও আছে জিআই তকমা
কেউ কেউ বলেন কলকাতা নাকি ঝিমিয়ে পড়ছে। বয়স বাড়ছে শহরের। বয়স বাড়ছে শহরের মানুষের। কেমন যেন নিষ্প্রাণ নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। এই শহরটা নাকি দিনে দিনে নির্বোধ বেরসিক দুর্বৃত্তদের হাতে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত হতাশ স্বরকে ভেংচি কেটে কলকাতাকে খুঁজে পাবেন কলকাতাতেই।
মায়ার শহর কলকাতা (Kolkata)। বাঙালির রেনেসাঁর (Bengal Renaissance) শহর। হাওড়া স্টেশনে নেমে ব্রিজের মাথাটা দেখা মাত্রই মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা শান্তি এসে ভিড় করে। গঙ্গা পেরিয়ে প্রবেশ হয় এ শহরে। পোস্তা আর বড়োবাজারের ঘিঞ্জি এলাকা। বাড়ির গায়ে বাড়ি। সাবেক আমলের স্নান-ঘাট। পরিত্যক্ত ওয়্যার হাউস। লোকজন, ঠ্যালা, লরি, লোহালক্কড়, বালতি, কড়াই – থিকথিক করছে মানুষের ভিড়। তার সঙ্গে আবার বড়োবাজার (Barabazar) কিংবা স্ট্র্যান্ড রোডের (Strand Road) বিখ্যাত জ্যাম। একটু প্রাচীন, একটু নতুন, একটু স্যাঁতস্যাতে, ভাঙাচোরা, আবার একটু আধুনিকতার ছোঁয়া, এসব কিছু নিয়েই দিব্যি ঝলমলে আমাদের প্রাণের শহর কলকাতা।
কবি শঙ্খ ঘোষ (Sankha Ghosh) বলেছিলেন, “এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা”। তবে সেই আরেকটা কলকাতার সন্ধান করতে বসলে বোধহয় সময়ের হিসেব কষা মুশকিল হবে। কিন্তু এ শহরের ইতিহাস ঘাঁটতে বসে ক্লান্তি আসবে না, এটুকু নিশ্চিত। কলকাতার সবটুকু জুড়ে আজও রয়েছে সেকেলে ইতিহাসের গন্ধ।

কার্নিসের নকশা ঝুলনি, খড়খড়ি আর ঝোলা বারান্দা। উঁচু বাড়ির দেওয়াল বেয়ে নেমে আসা গাছের শিকড়। লাল মসজিদের ঝকঝকে রুপোলি চুড়োয় সোনালি তুলির টান। চোখ নামাতেই দেখা যায়, ঐতিহ্যের এ পথে হাজার লোকের ব্যস্ততা। হরেক দোকানের সারির মধ্যে নজর টানে নকশাদার পাঞ্জাবি, জারদৌসি কাজের টুপি, সুগন্ধি, সুরমা আর শৌখিন পিতলের সম্ভার। সময় যেন এক মুহূর্তে বহু বছর পিছিয়ে যায়।
যে রাস্তাটার কথা হচ্ছে তা হল, চিৎপুর (Chitpur)। মহানগরীর প্রাচীন সড়ক। শোনা যায়, কাশীপুরের চিত্তেশ্বরী দেবীমন্দির থেকেই নাম এসেছে চিৎপুরের। কত কত ইতিহাস আজও এখানে রয়ে গেছে। এ রাস্তায় যেতে যেতে চোখে পড়বে প্রাচীন স্থাপত্য, ধুলোয় ঢাকা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের আদি ব্রাহ্মসমাজের মন্দির, ঠাকুরবাড়ি, শহরের প্রাচীনতম বশরি শা মসজিদ, রয়েল রেস্তোরাঁ, অজস্র পাঞ্জাবি, কুর্তা আর বোরখার দোকান, আরও কতো কী! কলকাতার পুরোনো গুরুদ্বোয়ারারও ঠিকানা এই চিৎপুর। চিৎপুরে এসে দাঁড়ালে যেন নিমেষেই মনে হবে, এই কলকাতায় কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই। চিৎপুর যেন আজও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কলকাতা শহরে ভেদাভেদের স্থান নেই, এখানে পাশাপাশি সহাবস্থান হিন্দু, মুসলিম, শিখ এবং জৈনদের।
গল্পটা অবশ্য সেকেলে কলকাতার, যখন শৌখিন বাবুয়ানি চিৎপুরের বাছাই করা আতরের খুশবুতে মাতোয়ারা হতো। নবাবজাদাদের পাশাপাশি আমির-মেজাজ বাঙালিবাবু গিলে করা পাঞ্জাবির হাতায় সেই সুগন্ধের ছোঁয়া নিয়ে ফিটন গাড়িতে গঙ্গাপাড়ে হাওয়া খেতে যেতেন, রাত কাটাতেন বাঈজিবাড়ির মেহফিলে।
গল্পটা অবশ্য সেকেলে কলকাতার, যখন শৌখিন বাবুয়ানি চিৎপুরের বাছাই করা আতরের খুশবুতে মাতোয়ারা হতো। নবাবজাদাদের পাশাপাশি আমির-মেজাজ বাঙালিবাবু গিলে করা পাঞ্জাবির হাতায় সেই সুগন্ধের ছোঁয়া নিয়ে ফিটন গাড়িতে গঙ্গাপাড়ে হাওয়া খেতে যেতেন, রাত কাটাতেন বাঈজিবাড়ির মেহফিলে। সুর্মাটানা মায়াবী চোখ উঁকি দিয়ে যেত জাফরিকাটা বারান্দায় কিংবা ঘোমটার আড়াল থেকে।
তখনও গ্যাসবাতি বসেনি চিৎপুর রোডে। কেরোসিন বাতি ছিল কোথাও কোথাও। চওড়া খোলা নর্দমা ছিল রাস্তার ধারে। এ শহরের পুরোনো রাস্তা গঙ্গাতীরের চিৎপুর তখন বাণিজ্যে জমজমাট। কিন্তু অন্ধকারে খরিদ্দার মেলা ভার! তাই ভোর থেকেই বেচাকেনার শুরু। ভোর পাঁচটায় রবীন্দ্র সরণি (RabindraSarani) আর কলুটোলার (Kalutola) কোণে ফৌজদারি বালাখানার একতলায় দোকান খুলে বসে পড়তেন হাজি খুদা বক্স (Haji Khuda Baks)। সন্ধ্যায় ঝাঁপ পড়ে যেত। নির্বাসিত নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ (Oyajed Ali Sah) ১৮৫৬ সালে মেটিয়াবুরুজে (Meyiyaburz) আসার বহু আগেই কনৌজের কারখানা থেকে সুগন্ধি নিয়ে এ শহরে চলে আসেন খুদা বক্স ও তাঁর ছেলে নবি বক্স। ১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সেই দোকান আজও একই জায়গায়। ভাড়াটা বেড়ে হয়েছে ১২০০ টাকা। নাখোদা মসজিদ (Nakhoda Moque) তৈরি হয়েছে এ সবেরও বহু পরে। মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে আরও খানদুয়েক আতরের দোকান। কোনও এক অজানা কারণে কলকাতার আতর সাম্রাজ্য এ অঞ্চলেই আটকে থেকেছে।

গরমে বেল, জুঁই, গোলাপ, রজনীগন্ধা, চন্দনের পাশাপাশি মনের আরাম দেয় এ এলাকার খস সুগন্ধি। আগেকার দিনে গরমে, পাটের ঝোলানো খসে জল ছিটিয়ে ঠান্ডা রাখা হত ঘর। বিশেষ ঘাস থেকে তৈরি খস আতর সেই ঘ্রাণ মনে করায়। শীতকালে শামামা, মুস্ক, হিনার সুঘ্রাণ গায়ে মাখতে এখনও পছন্দ করেন গন্ধবিলাসীরা। জাফরান-সহ বিভিন্ন মশলার মিশ্রণে তৈরি হয় শামামা। মুস্ক তৈরিতেও লাগে বিভিন্ন মশলা। আতরের সব থেকে জরুরি উপাদান চন্দন তেল। দুর্মূল্য চন্দন তেল এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের মিশ্রণে তৈরি খাঁটি আতরের দাম তাই বেশি। দশ গ্রাম আতরের দাম হয় ছ’শো থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে। আতর তৈরিতে কম করে সপ্তাহ দুয়েক সময় লাগে। তবে আগর গাছ থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি উদ আতর সময় ও খরচসাপেক্ষ। তাই এর দামও বহুগুণ বেশি। এ ছাড়া দু-তিন রকম খাঁটি আতর মিলিয়ে তৈরি হায়াতি, সাবা এবং অপ্সরাও জনপ্রিয়।
আগেকার দিনে গরমে, পাটের ঝোলানো খসে জল ছিটিয়ে ঠান্ডা রাখা হত ঘর। বিশেষ ঘাস থেকে তৈরি খস আতর সেই ঘ্রাণ মনে করায়। শীতকালে শামামা, মুস্ক, হিনার সুঘ্রাণ গায়ে মাখতে এখনও পছন্দ করেন গন্ধবিলাসীরা। জাফরান-সহ বিভিন্ন মশলার মিশ্রণে তৈরি হয় শামামা। মুস্ক তৈরিতেও লাগে বিভিন্ন মশলা।
অথচ রাজা-নবাবদের আগল থেকে বার করে আনা আতর কিন্তু এক সময়ে বাঙালি বনেদি ঘরেও আদর পেয়েছিল। শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) মনে ধরেছিল গোলাপ আর জুঁইয়ের সুগন্ধি। ঠাকুরবাড়ি থেকে নিয়মিত বরাত আসত আতরের। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ (Moulana Abdul Kalam Azad), নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhash Chandra Bose), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শাহিদ সুরাবর্দি, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান-সহ বহু নেতারা এসেছেন কলুটোলার আতর সাম্রাজ্যে। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের বংশধর, প্রয়াত রাজ্যপাল নুরুল হাসান এবং গনি খান চৌধুরীর পরিবার সাবেক আতরের একনিষ্ঠ খরিদ্দার। জানা যায়, জাকারিয়া স্ট্রিটে থাকাকালীন বিড়লা পরিবারেও নিয়মিত যেত চন্দন সুগন্ধি।
বেঙ্গল কেমিক্যালের (Bengal Chemical) কাছেই ছিল বিশাল ফুল বাগিচা। সেই ফুল থেকেই এ শহরে আতর তৈরি হত। সে সব চুকেছে স্বাধীনতারও আগে। এখন অবশ্য আতর আসে কনৌজের কারখানা থেকে।

সময় বদলালো। চিৎপুরের পুরোনো বাড়ি, ট্রাম লাইন, ঘুপচি রাস্তা থেকে গেলেও ফিটন-বাঈজিনাচ-বাবু কালচারের মতোই হারিয়ে গেল বাঙালির আতর-মুগ্ধতা আর সুর্মা-প্রেম। ব্যবসা গুটিয়ে নিতে থাকলেন একের পর এক আতর-সুর্মা কারবারি। শহরের একটা প্রান্ত থেকে কয়েক শতাব্দী পুরোনো গোটা একটা ঐতিহ্য উবে যেতে লাগল ক্রমশ। আজকের বাজার চলতি কমদামী বিদেশি ডিও কিংবা পারফিউমের ভিড়ে এঁটে উঠতে পারলো না সেকেলে মেজাজের আতর। কেবল কিছু মানুষ শখ করে মাঝে মধ্যে উঁকি দেন এ পথে এখন। নতুবা ওই ইদ, বনেদি বিয়ে, কিংবা দুর্গাপুজোয় খানিক বিক্রিবাট্টা হয় আতরের।
বিষয়টা ভাবিয়েছিল রাজ্যের অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও বস্ত্র দফতরের অন্তর্গত ‘বিশ্ব বাংলা মার্কেটিং কর্পোরেশন’-এর কর্তাদের। বাংলার হারিয়ে যাওয়া শিল্প, সংষ্কৃতি, ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন এবং নতুন আঙ্গিকে তার বিপণন নিয়েই তাঁদের কাজ। পুরোনো চিৎপুরের অলিগলিতে শুরু হয়েছিল খোঁজ। প্রকৃত কারিগর পরিবারগুলিকে চিহ্নিত করা, তাঁদের সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা। বিশ্ব বাংলার বিপণিগুলিতে ‘চিৎপুর’ ব্র্যান্ড-এ শুরু হয়েছিল খাস চিৎপুরের আতর, আতরের তৈরি সাবান, সুর্মা, গোলাপ জলের বিক্রি। তাতেই দু’বছরের মধ্যে কিস্তিমাত। পরিসংখ্যান বলছে, গত দু’বছরের চিৎপুরের আতরের চাহিদা বেড়েছে ৫৪% এবং সুর্মার চাহিদা বেড়েছে ৯৪%।
তাই, হারিয়ে যেতে যেতেও আবার যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে চিৎপুরের আতরের ঐতিহ্য। কলকাতার রসগোল্লার (Kolkata Rasogolla) মতো, চিৎপুরের আতরেরও আছে জিআই তকমা। আজ কলকাতার গন্ধ বিচার করতে বসলে হয়তো বারবার ভিড় করে আসে মেছোয়ার পচা ফলের গন্ধ, পার্ক সার্কাসের চামড়া পোড়ার গন্ধ কিংবা যান্ত্রিক শহরের প্যাচপ্যাচে ঘামের গন্ধ। কিন্তু চিৎপুর রোডের ইতিউতি হানা দিলে আজও নাকে ভেসে আসে সুগন্ধের রেশ। আর সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে এগিয়ে যেতে পারলেই ব্যাস, বর্তমান প্রজন্মও সহজেই গুঁড়ি ছুঁয়ে যেতে পারবে বাংলার ঐতিহ্য আর সাবেকিয়ানায়।
তথ্যসূত্রঃ
১. বাঙালির ইতিহাস, নীহাররঞ্জন রায়
২. ‘আতর যেত ঠাকুরবাড়ি, নবাবি মহলেও’, এই সময়
৩. ‘Hand Book Of Perfumes With Formulations’, by Eiri Board.
৪. ‘সুগন্ধির আবিষ্কার ও এর ব্যবহার’, itibritto.com

