
মাটিকে দলা পাকিয়ে হাতে টিপে সাদাসিধে ঘোড়া বানিয়ে নেওয়া হয়
ধর্মঠাকুরের পীঠস্থান, ধর্মরাজতলা, সুর্মানগর গ্রাম, বাঁকুড়া (ছবি-অর্ণব দত্ত)
আগডুম, বাগডুম, ঘোড়াডুম সাজে। সেই থেকে কত না কত ছড়ায় মোড়া ঘোড়ার কাহিনি। কত তাদের নাম। সাবাশ ঘোড়া, টাট্টু ঘোড়া, জলপাই ঘোড়া, দুলদুল ঘোড়া, পক্ষীরাজ ঘোড়া আরও কত কী। এ বাংলা ধর্ম-কর্ম নির্বিশেষে ঘোড়া অন্তপ্রাণ। গ্রামবাংলাও মগ্ন থাকল ঘোড়ায় বহুদিন। বলতে গেলে আজও আছে। আশা-নিরাশা বা চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গেও জড়িয়ে গেল ঘোড়া। নানা বার্তা নিয়ে সে ঘোড়া উঠে এল মাঠের মাঝে মনোস্কামনার থানে। কত গল্প-গাঁথা জড়িয়ে গেল তার সঙ্গে। কেউ বলল, মনের কামনা-বাসনা ঈশ্বরের দরবারে যে পৌঁছবে তার জন্য তো একটা বাহন লাগে। তাই মাটিকে দলা পাকিয়ে হাতে টিপে এমন সাদাসিধে ঘোড়া বানিয়ে নেওয়া। কেউ বলল, গ্রামদেবতা যখন কালাজ্বর, মারণ রোগ, বসন্ত রোগ থেকে গ্রামকে রক্ষা করবার জন্য রাতে গ্রামে টহল দেবে তখন তাঁর তো একটা বাহন লাগবে। তাই থানে ঘোড়া দিতে হবে।
এখন প্রশ্ন হল থানটা কী? থান হল মাঠের মাঝের কোনও বেদি কিংবা গাছতলার থান বাঁধানো অংশ। মনোস্কামনার ঘোড়াকে সেখানেই রাখা রেওয়াজ। এখন এই থানের ঘোড়া সর্ব অর্থে একটা শিল্পদ্রব্য। কারণ এখানে শিল্পী যা নির্মাণ করেন তা হল একটি জটিল রূপের সরল উপাখ্যান। তৈরি হয় সাজেস্টিভ আর্ট। আর রূপকার হলেন গ্রামের সাধারণ মেয়ে-বউ।

আশ্চর্যের বিষয় হল, রাশিয়াতেও এরকম ঘোড়া দেখতে পাওয়া যায়। বাংলার প্রথিতযশা শিল্পীদের দীর্ঘদিন ধরে এই হাতে টেপা মাটির ঘোড়া আকর্ষণ করেছে। যেমন যামিনী রায়। বিগত তিরিশ বছরে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে এই থানের ঘোড়ারই এক বিরল রূপান্তর ঘটেছে। ফলে বিষ্ণুপুরে এই থানের ঘোড়াই তার ভোল পালটে হয়ে গিয়েছে ঘর সাজানোর ঘোড়া। রূপের সারল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জটিল অলঙ্কারের সুষমা। এই সুষমা যোগ করা হয়েছে যাতে লোকশিল্পের নমুনা হিসাবে এই ঘোড়া বিক্রি হয়। ফলে বলতে হয় দৈনন্দিন গ্রাম জীবনে যা ছিল মনোস্কামনা পূরণের বাহন, তা এখন রূপান্তরিত হল কারুশিল্পে। তাই মা-বোনেদের হাতে গড়া এই মননজাত শিল্প আজ এক ইন্ডাস্ট্রি।

এমন চমৎকার রূপ বদল বাংলার আর কোনও পুতুল এর ক্ষেত্রে বিশেষ হয়েছে বলে জানা যায় না। আবার সেই সঙ্গে রঙের বৈচিত্র্যময় ব্যবহারেও এই ঘোড়া সৌন্দর্যে অসামান্য হয়ে যায়। একটাই কথা থানের ঘোড়ার মতো জটিলতা বর্জিত রূপাখ্যান আর দু’টি নেই।
আরও বলতে হয়, বাংলার লোকশিল্পে ঘোড়ার বাহুল্য আছে। বাংলাদেশের সোনারগাঁ-র কাঠের ঘোড়ার শিল্পসুষমা অনবদ্য। মেদিনীপুরের পটুয়াদের হাতেও তৈরি হয় বাচ্চাদের খেলার ঘোড়া। আবার বসিরহাটের ঘোড়ায় চাকা লাগিয়েও দেওয়া হয়।
সে সবেরও শিল্পমূল্য সারল্য ও অলঙ্কারের বিচারে অপরিসীম।
