তারাপদ চক্রবর্তীর ‘চামেলি মেলো আঁখি’ — এ শুধু গান নয়, অজানা সময়ের গর্ভে প্রবেশরত

তারাপদ ছিলেন বাংলার খেয়াল ধারার স্থপতি

ভোর হয় ধীরে ধীরে, রাত্রি শেষ হয়ে আসে। একটা অদৃশ্য ছায়া যেন গিয়ে বসে বুকের উপর। বাতাসে সুরের গন্ধ। কোথাও দূরে কোনো রেকর্ড ঘোরে— ‘চামেলি মেলো আঁখি’। আর তারপরেই শুরু হয় এক অন্তর্গত কাঁপুনি, যেন হৃদয়ের ভিতরে এক পর্বত নামছে আস্তে আস্তে।

তারাপদ চক্রবর্তী-র গলায় গানটি শোনেননি এমন মানুষ বোধ করি কম। ভূপাল টোড়ি-র সেই গম্ভীর আহ্বান। মনে হয়েছিল, এ তো কোনো সাধারণ গান নয়—এ এক অস্তিত্ব-ছাপানো সুরমালা। পণ্ডিত শুভাশিস মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “সুর রূপী ব্রহ্ম যখন শরীর ধারণ করেন, তখন এমন একজন মহাপুরুষের জন্ম হয়।” তারাপদবাবুর কণ্ঠ যেন সেই ব্রহ্মের শরীর—গলায় এক মহাসমুদ্রের গর্জন, আবার শিশির বিন্দুর মৃদু স্পর্শ, যেন কোনো এক চিরকালীন সন্ধ্যায়, প্রকৃতির গভীরতম নিস্তব্ধতার মধ্যে এক ব্রহ্মমুহূর্তের উন্মোচন ঘটেছে। দুই বিপরীত অনুভব মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অলৌকিক ভারসাম্য। 

তারাপদবাবুর কণ্ঠ যেন সেই ব্রহ্মের শরীর—গলায় এক মহাসমুদ্রের গর্জন, আবার শিশির বিন্দুর মৃদু স্পর্শ, যেন কোনো এক চিরকালীন সন্ধ্যায়, প্রকৃতির গভীরতম নিস্তব্ধতার মধ্যে এক ব্রহ্মমুহূর্তের উন্মোচন ঘটেছে।

তারাপদ চক্রবর্তীর জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায়। সংগীত তাঁর রক্তে ছিল—পিতামহ, প্রপিতামহ—সবাই ছিলেন সংগীতজ্ঞ। সেখান থেকেই শুরু এক গভীর সুরের সাধনা। কিন্তু ইতিহাস, যেমন হয়, তার জন্য সহজ ছিল না কোনো পথ।

কলকাতার আকাশবাণীর স্টুডিওতে জ্ঞান গোঁসাই অনুপস্থিত। করিডরে উদ্বেগ। অনুষ্ঠান শুরু হবার কথা, গায়ক নেই। হঠাৎই এক কর্মকর্তার চোখে পড়লেন তরুণ এক তবলিয়া, যিনি গুনগুনিয়ে গান করেন মাঝে মাঝে। নাম—তারাপদ চক্রবর্তী। ডিরেক্টর ঝুঁকি নিলেন, বসালেন তাঁকে মাইকের সামনে। গান শুরু হল। সবাই স্তব্ধ। মুহূর্তে সেই তান, সেই স্বরলিপি, স্বরধর্ম যেন জ্ঞান গোঁসাইয়েরই নতুন জন্ম। পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন এক কিংবদন্তি।

সেই তরুণ ফরিদপুর ছেড়ে কলকাতার অচেনা গলিতে এসে পৌঁছেছিলেন কেবল একজোড়া কানের জন্য। নামজাদা উস্তাদদের আসরে টিকিট নেই, পয়সা নেই—শামিয়ানার বাইরে বসে কাগজ পেতে শুনতেন গান। জানালার নিচে দাঁড়িয়ে একলব্যের মতো শিখতেন সাতকড়ি মালাকারের গান। তারপর গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর হাতে পরিপূর্ণ তালিম।

তারাপদ শুধু গায়ক ছিলেন না, ছিলেন বাংলার খেয়াল ধারার স্থপতি। নিজেই রচতেন বন্দিশ। তাঁর লয়কারির জটিলতায় তবলিয়ারা হতবাক। উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খান বলতেন, “আজ তারাবাবুকে শুনে নেওয়ার পর গান গাওয়া মুশকিল।” পণ্ডিত রবিশঙ্কর প্লেনের টিকিট বাতিল করতেন তাঁর গান শোনার জন্য। আলাউদ্দিন খান বলতেন, “ভারতের রত্ন।”

তবু, তাঁর পথে কাটা তো বেশি বৈ কম ছিল না। বাংলার গায়কেরা তখনও হিন্দুস্তানি সংগীতের মূলধারায় একপ্রকার অনাহূত। উত্তর-পশ্চিম ভারতের দখলে ছিল মানচিত্র। “ওরা এই জিনিসের লোক নয়”—এই ধারণার দেওয়াল ভাঙতে পারলেন না পুরোপুরি। তবুও গান থামেনি। লড়াই থামেনি।

গুর্জরী টোড়ি শোনার সময় এখনও আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য—এক তরুণ, এক অচেনা শহর, এক অনামি স্বপ্ন। সেই তরুণ যে অলিতে গলিতে গান বুনেছেন, যার পরাজয়ের ভিতরেও ছিল এক গোপন জয়গান। আমাদের তারাপদ, আমাদের ইতিহাস।

গুর্জরী টোড়ি শোনার সময় এখনও আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য—এক তরুণ, এক অচেনা শহর, এক অনামি স্বপ্ন। আমাদের তারাপদ, আমাদের ইতিহাস।

তাঁর গান তো কেবল শুধু সুর নয়, এক জ্যামিতি। যেখানে লয়, তান, বোলবাঁট—মিলে তৈরি করে এক গূঢ় রচনার খসড়া। যেমন আড়া চৌতালের বন্দিশ—যেখানে ধীরে শুরু করে এমন এক দ্রুত লয়ে পৌঁছাতেন, যেখানে শ্রোতারা নিশ্বাস নিতে ভুলে যেতেন। তবলিয়ারা ঘেমে যেতেন, কিন্তু গলায় তাঁর ত্রুটি ছিল না। তারাপদ তানের গণিত জানেন, কিন্তু তা যন্ত্র হয়নি কখনও। প্রতিটি স্বর ডুব দিত ভাবের গভীরে।

এখানে হিরাবাই বরোদকরকেও মনে পড়ে। তাঁর খেয়াল ছিল এক ঝর্ণাধারার মতো, লয়কারির সূক্ষ্ম নির্মাণে ভরপুর। কিন্তু তারাপদ চক্রবর্তীর গলায় সেই লয়কারী হয়ে উঠত গণিতের থেকেও স্পষ্ট, এক অলীক কারুকার্য। তুলনার জন্য বলছি না, বলছি কারণ এই দুই মানুষ একে অপরকে স্মরণ করায় —তাঁদের গান, তাঁদের সাধনা, তাঁদের আত্মনিবেদন। বিষ্ণপুরে কিরানার ছোঁয়ায় তারাপদবাবুর তৈয়ারি যে কেমন হয়ে উঠেছিল এ কথা কেমন করে বোঝাই? চামেলি মেলো আঁখি শুনলে, মনে হয় না গান শুনছি—মনে হয়, কোনো অজানা সময়ের গর্ভে প্রবেশরত। এই গান এক সাধনা, এক রাত্রির প্রার্থনা। 

তারাপদ চক্রবর্তীর গলায় ছিল বিস্ময়। কখনও মনে হতো, আকাশের গহনতার সঙ্গে কথা বলছেন তিনি, আবার কখনও মনে হতো, মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে আকুল কোনো প্রার্থনার সুর। প্রতিটি অলংকার, প্রতিটি মুর্ছনায় ছিল গুরু পরম্পরার এক নিবিড় সাধনার ছায়া। সেই সাধনার সুর আজও আমাদের বুকের মধ্যে এসে বাজে—স্মৃতির এক পূর্ণাঙ্গ সৌধ নির্মাণ করে।

এই সৌধে লেখা থাকে সুরের মহত্ব, সংগীতের শুদ্ধতা, আর এক শিল্পীর আত্মার প্রকৃত উচ্চারণ। এমন করে কেউ যদি গান গায়, তবে সে কেবল শিল্পী নয়—সে হয় এক সুরস্নানে ভেজা ঋষি। আর আমাদের সেই ঋষির নাম—তারাপদ চক্রবর্তী।

_____________
তথ্যঋণ: আনন্দবাজার পত্রিকা

Developed by DXDasia