
লেপের রং কেন লাল
বিগত কয়েক বছর শীত নিয়ে মন কষাকষি চলছেই। কিছুতেই সে বেশিদিন থাকবে না! চার থেকে পাঁচদিন বড়োজোর এক সপ্তাহ। যে কারণে মন বেজার লেপ-কম্বলদেরও। পুরোনো দিনের মতো বেশিক্ষণ সময় কাটাতে পারা যাচ্ছে না ওদের সঙ্গে। অনেকরই মনে শীতকালে লাল রঙা লেপের স্মৃতি উজ্জ্বল। আজকালকার রেডিমেড ‘কম্ফোটার’, ‘কুইল্ট’-এর তুলনায় হয়তো ওজনে খানিক ভারি, অথচ চড়া শীতে এর কদর ছিল, আরামও। ইংরেজিতে ‘কুইল্ট’ মানেই কিন্তু লেপ নয়। স্থানভেদে এর রকম ফের আছে।
অনেকেরই মনে থাকবে লেপ তৈরি হতো ইট-লাল রঙা সুতির কাপড় দিয়ে। কখনও ভেবে দেখেছেন, এর নেপথ্যে কোনো বিশেষ কারণ আছে কিনা? পৃথিবীতে এত রং থাকতে ধুনুরিরা লেপ বানাতে কেন শুধু লাল রঙের কাপড়ই বেছে নিতেন? এই লেখায় আমরা এর উত্তর খোঁজার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে দেখবো লেপ তৈরির প্রক্রিয়া।
প্রথম ধাপ
তুলো পেঁজা বা তুলো ধুনা: এই পদ্ধতিতে তুলো কার্ডিং করে অর্থাৎ তুলোকে ধুনে লেপের জন্য প্রস্তুত করা হয়। ভিতর থেকে ধুলোময়লা সাফ করে তুলোকে হালকা করে তোলার জন্য ধুনা হয়। যতক্ষণ না এক কেজি তুলো ১০০ গ্রাম ওজনে পরিণত হচ্ছে, ততক্ষণ ধরে চলে পরিশ্রুত বা তুলো ধুনাই প্রক্রিয়া। ধুনার পর শুধুমাত্র নরম, সূক্ষ ছাঁটাই তুলোই লেপ বানানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এর পরের পদ্ধতি হলো ভোয়েল। এই স্তরটি বেশ জটিল এবং দক্ষ পরিচালনার প্রয়োজন। লাল কাপড়ে মধ্যে তুলো ভরে সবদিকে সমান ভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। তুলো কম-বেশি থাকলে লেপও উঁচুনিচু হবে।

দ্বিতীয় ধাপ
হাতে সেলাই: এটিই শেষ স্তর, যেখানে লেপ সেলাই করা হয়। হিন্দিতে এই প্রক্রিয়াকে 'তাগাই' বলে। এই সেলাই যেমন তেমন হলে চলবে না। লেপ ভেদ করে যাতে ঠান্ডা না ঢুকতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে সেলাই করা হয়। মনে রাখতে হবে, খাঁটি তুলো থেকেই সবথেকে ভালো লেপ তৈরি হওয়া সম্ভব। খাঁটি তুলোর লেপই যে সবথেকে আরামদায়ক উষ্ণতা দিতে পারে, এ নিয়ে দ্বিমত নেই।
আজকালকার রেডিমেড ‘কম্ফোটার’, ‘কুইল্ট’-এর তুলনায় হয়তো ওজনে খানিক ভারি, অথচ শীতে বাংলার ঘরে ঘরে এর কদর ছিল, আরামও। ইংরেজিতে ‘কুইল্ট’ মানেই কিন্তু লেপ নয়। স্থানভেদে এর রকম ফের আছে।

লাল কাপড় দিয়ে লেপ তৈরি শুরু হয়েছিল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিভিন্ন জায়গায়। শোনা যায়, বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খানের (মোহাম্মদ হাদি নামেও পরিচিত ছিলেন) রাজত্বকালে (১৭১৭-১৭২৭) শুরু হয়েছিল লাল কাপড় দিয়ে লেপ তৈরির চল। মুর্শিদাবাদ সেই সময় মখমল ও কার্পাস তুলোর জন্য বিখ্যাত ছিল। ধুনাই করা তুলোতে আতর মিশিয়ে ভরা হতো মখমলের লাল কাপড়ের ভিতর। শীতকালে নবাবের জন্য তৈরি হতো বিশেষ লেপ।
মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর পর, তাঁর জামাতা, সুজা-উদ-দিন মুহম্মদ খান লেপ কারিগরদের বলেন মখমলের পরিবর্তে রেশম ব্যবহার করতে, কিন্তু লেপের রং যেন অপরিবর্তিত থাকে।
সে দিন গিয়েছে। মখমল, রেশম, সুতি থেকে আমরা পলিয়েস্টার, লেপের কাপড়ের গুণগত মান পরিবর্তিত হয়েছে ধুনুরিদের হাতে গড়া লেপের রং কিন্তু লাল-ই থেকেছে। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা এই ভাবে লাল রঙা লেপের ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন, যা আজও একই আছে। কোনও কোনও ব্যবসায়ী/কারিগরদের মতে, লেপে লাল রঙের কাপড় ব্যবহার করা হয় কারণ সহজে দাগ বা ময়লা বোঝা যায় না। আবার, অনেকে মনে করেন এটা একটি ব্যবসায়িক কৌশল যা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য কারিগররা অবলম্বন করেন।
লেপ জলে ধোয়া যায় না। লেপ পুরোনো হলে তুলো জমাট বেঁধে যায়, পাতলা আর ভারী হয়ে যায়। তখন ঠান্ডায় যথেষ্ট আরাম পাওয়া যায় না। শরৎ থেকে শীত শুরু হওয়ার আগে, হার্প বা বীণার মতো যন্ত্র (ধুঙ্কি) ঘাড়ে ঝুলিয়ে, তাতে টং টং শব্দ তুলে এলাকায় ঘুরেবেড়াতে দেখা যায় ধুনুরিদের। তাঁদের কাজ পুরোনো লেপ থেকে তুলো বের করে তা পুনরায় ধুনে প্রথমাবস্থায় নিয়ে যাওয়া, কখনও কখনও লেপের তুলো ও কাপড় পাল্টে ফেলা।
খাঁটি তুলো ও কাপড় দিয়ে লেপ তৈরিতে ১০০০-১৫০০ টাকা লাগে। অধুনা লেপ-কম্বলের পরিবর্তে পাওয়া যায় হালকা, সিন্থেটিক বা পলিয়েস্টারের ‘কুইল্ট’। তবে, বাজারে যাই চলুক না কেন শীতে বাংলা ও বাঙালির মনে লাল কাপড়ের চিরাচরিত লেপের আবেগ কখনও মুছে যাবে না, একথা বলাই যায়।

