দাদা ধনঞ্জয়ের মতো সিদ্ধিলাভ হল না, এই অবসাদেই আত্মহত্যা করেছিলেন পান্নালাল?

ছোটো ভাইয়ের মৃত্যুর পর নিজেকে গুটিয়ে নিলেন ধনঞ্জয়ও

“অন্তবিহীন এই অন্ধ রাতের শেষ…”
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত বারোটা। সলিল চৌধুরীর মায়ালীন সুর ভরিয়ে দিয়েছে ঘর। একর্ডিয়ান-গিটারের মাঝে গানের গলাটি অনেকের চেনা। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। রুপোলি আলো খেলা করে সুরের ওঠানামায়। চড়ায়-খাদে। পরতে পরতে এক অজানা বিষণ্নতা আর একাকীত্ব। এহেন বিষণ্ণতার ছোঁয়াই যেন মেলে আরো একটি গানে। সে গান অবশ্য পুরোনো। সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, ‘মা তারা’-কে খোলা চিঠি লিখছিলেন সাধক রামপ্রসাদ সেন। “আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায়…” সুরে ভেজা সেই অভিমানকেই বহন করছিল আরেকটি কন্ঠ। সেই কন্ঠকে ধনঞ্জয় বড়ো কাছ থেকে চিনতেন। তাঁর ছোটো ভাই পান্নালাল ভট্টাচার্যের গলা যে…

দুই ভাই বড়ো হয়ে উঠছিলেন ঘোর শাক্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে। ‘মায়ে’-র গান আর মার্গসঙ্গীত শিখেছেন নাড়া বেঁধে। এগারো ভাইবোনের পান্নালাল সর্বকনিষ্ঠ। জন্মের কয়েকমাস আগেই বাবার মৃত্যু। তাঁকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখে গান শিখিয়েছিলেন মেজদা ধনঞ্জয়। চোদ্দো বছর বয়সে মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে চোখে আঘাত পেলেন পান্নালাল। যদিও তাতে গানের সাধনায় ছেদ পড়েনি। দাদা ধনঞ্জয়ই তাঁকে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ ও যামিনীরঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতে পাঠান। কৈশোরে ভালোবাসতেন মাছ ধরতে, ঘুড়ি ওড়াতে আর ফুটবল খেলতে। এরই মাঝে চলত কালীর সাধনা।

১৯৪৭ সালে প্রথম মেগাফোনে শুনতে পাওয়া গেল পান্নালালের কণ্ঠ। তখন তাঁর মাত্র সতেরো বছর বয়স। একের পর এক শ্যামাসঙ্গীতে মুগ্ধ শ্রোতারা লুটিয়ে পড়েন মায়ের চরণতলে। রাষ্ট্র হয়ে যায় পান্নালালের ঐশ্বরিক প্রতিভার কথা। রামপ্রসাদের রচনা ও সুর পূর্ণতা পায় যাঁর কণ্ঠে… খেলতে। পরে বেশকিছু আধুনিক গানও গেয়েছিলেন পান্নালাল। ‘রুপালি চাঁদ জাদু জানে’, ‘তোমার উৎসবে আমারে তো ডাকো নাই’, ‘তোমার মতো আমিও তো কত সয়েছি’-র মতো জনপ্রিয় সব আধুনিক গান আছে তাঁর। তবুও তাঁর প্রধান পরিচিতি শ্যামাসঙ্গীত শিল্পী হিসেবেই।

অন্যদিকে, দাদা ধনঞ্জয় শুধু শ্যামাসংগীতে আটকে থাকেননি। তিনি গেয়েছেন আধুনিক, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, ভজন, কীর্তন, লোকগীতি এমনকি হিন্দি গানও। তবুও পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভক্তিগীতির জগতে দুই ভাই ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও শ্যামাসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে বরাবরই অগ্রাধিকার পেয়ে এসেছেন কনিষ্ঠ ভাই পান্নালালই।

দু’জনেই কালীর সাধক। তাঁদের সাধনার মাধ্যম গান। তুলনায় অন্তর্মুখী পান্নালাল, যৌবন পার হতে না হতেই নিজেকে খানিক গুটিয়ে নিয়েছিলেন। খুব বেশি বেরোতেন না তাঁর বাড়ি ছেড়ে। মেতে থাকতেন সাধনায়। অন্যদিকে ধনঞ্জয়কে আমরা দেখতে পাই সাড়ে চুয়াত্তরের মতো ছায়াছবিতে। “আমার-এ-যৌবন” গানটিতে গলাও মিলিয়েছিলেন তিনি, এক মেস-বোর্ডার এর ভূমিকায়। বাংলা সিনেমায় গান, বিপুল জনপ্রিয়তা, তবু ‘মা’-কে ছেড়ে যাননি ধনঞ্জয়। বজায় ছিল তন্ত্র ও রুপোলি জগতের মধ্যে এক অদৃশ্য ব্যালেন্স।

অপরদিকে, একাকীত্বের ঘেরাটোপে ক্রমশ্য অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন পান্নালাল। অনেকের মতে, তাঁর ধারণা জন্মেছিল যে, দাদা ধনঞ্জয় কালীর সিদ্ধি লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। আর তিনি নিজে আর কোনোদিন পারবেন না সাধনায় সফল হতে। মাকে পাওয়ার ‘সাধ’ আর কোনোদিন মিটবে না তাঁর। অবসাদ ঘন হতে থাকে। ‘সকলই ফুরায়ে’ যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণাবোধ পান্নালালকে অবশেষে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর দিকে। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে বাংলা গানের জগতকে বিমূঢ় করে দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।

ছোটো ভাইয়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি ধনঞ্জয়। দাদার দায়িত্ব পালন করে পান্নালালের পরিবারের সমস্ত ভারই তুলে নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে। কিন্তু সরে গিয়েছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। রেকর্ডিংয়ের সংখ্যাও কমছিল ধীরে ধীরে। হয়তো ভাই-এর মৃত্যুর জন্য মনে মনে নিজেকেই দায়ী করছিলেন দাদা। সেই ক্ষত জুড়োতেই মন উজাড় করে দিয়েছিলেন মায়ের সাধনায়। পান্নালাল চলে গেছে, ধনঞ্জয়ের জীবনের অবশিষ্ট প্রায় সব রাতই যে তখন অন্ধরাত…

১৯৯২ সালে অন্ধরাতের অবসান ঘটেছিল একটি  কলকাতার মেসবাড়িতে। সব ছেড়ে ভাইয়ের কাছে চলে গিয়েছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য।
 

Developed by DXDasia