‘হস্তীর কন্যা বামুনের নারী’ আর মাহুতবন্ধুর গপ্প

গোয়ালপাড়ার হাতির গানে একাকার অরণ্য-মানুষ-সম্প্রদায়-সীমানা

‘হস্তীর কন্যা হস্তীর কন্যা বামুনের নারী
মাথায় নিয়া তামকলসি, ও সখি হস্তে সোনার ঝারি।
সখি ও— ও মোর হায় হস্তীর কন্যা রে—
খানিকো দয়া নাই মাহুতের লাগিয়া রে।’

বর্ষার মেঘ কেটে যেতেই গভীর জঙ্গলে গেছে মাহুত। ভুটানের পাদদেশ থেকে শুরু হয়েছে যে ঘন সবুজ বন, তা এসে ঘিরেছে গোয়ালপাড়াকেও। এই বনে দঙ্গল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় হাতির দল। সেই হাতি ধরতেই তো ঘর ফেলে বনে যাওয়া মাহুত, ফান্দি, দোহারদের। দুঃসাহসী মাহুতরা বনে যায় প্রিয়ার চোখ থেকে নদী খসিয়ে। হাতি ধরতে গিয়ে অকাতরে প্রাণও যায়। ওহে হতির কন্যা বামুনের মেয়ে, মাহুতের লাগিয়া সামান্য দয়া নাই তোর? গানে গানে ঝরে পড়ে আকুতি। সেই গানে উথালপাথাল হয় উপত্যকা। তারপর, একসময় বন ফুরিয়ে যায় গোয়ালপাড়া থেকে। হারিয়ে যায় হাতির ঝাঁক। নিষ্ঠুর শিকার বনজীবন ধ্বংস করে শেষ হয়। কিন্তু থেকে যায় আকাশ ভাসানো, নদী ভাসানো, বন ভাসানো এইসব গান। হাতির গান।

এই গল্প সরাসরি বঙ্গপ্রদেশের নয়। কিন্তু, ভূগোলের মানচিত্র তো ভাঙে-গড়ে। ভাষার মানচিত্র পেরিয়ে যায় সীমানার বেড়া। আসামের গোয়ালপাড়ার এইসব গানগুলোকেই ধরুন। এদের ভাষা কি অচেনা ঠেকে আপনার? অবিভক্ত বাংলায় গোয়ালপাড়া ছিল রংপুরে। পরে গেল আসামের ভাগে। কিন্তু, এখনো তার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে সীমানার নানাদিকে। একদিকে কুচবিহার, মাথার ওপরে ভুটান, আরেকদিকে রংপুর। উত্তরে ব্রহ্মপুত্র, পায়ের নিচে গারো পাহাড়। একসময় তার বুক জুড়ে ছিল বন এবং হাতি-বাঘ-ভাল্লুক-চিতার পাল। ছিল উজাড় করা চাষের জমি। ছিল মাহুতের দল। আর ছিল গান। যে গানের ভাষা রাজবংশী। উপভাষার তত্ত্বে আমি বিশ্বাসী নই। তাই রাজবংশীকে বাংলাভাষারই কামরূপী উপভাষার অন্তর্গত ভাবতে আমার আপত্তি আছে। কিন্তু, এই ভাষার সঙ্গে বাংলার কোনো বিভেদ নেই। বরং একটি জোড় আছে দুইয়ের। শিকড়ের জোড়। যে শিকড়ের টানেই গোয়ালপাড়ার বাঘ-ভাল্লুকের দেবতা সোনারায় একাকার হয়ে যান দক্ষিণবঙ্গের দক্ষিণরায়ের সঙ্গে। যে শিকড় গোয়ালপাড়া থেকে ভাওয়াইয়ার সুর এনে মিশিয়ে দেয় আমাদের কানেও। এই গল্প তাই আসলে বাংলারও।

গোয়ালপাড়াকে ঘিরে আছে হাতির গান। মাহুত শিকারে যায়, জন্ম দিয়ে যায় হৃদয় নিংরানো এক-একটি গানের—‘ও মোর গণেশ হাতির মাহুত রে/ যেদিন মাহুত শিকার যায়, নারীর মন ঝুরিয়া রয় রে।’ একে প্রাণসংশয়, তার ওপরে মাহুতের মনকে বিশ্বাস নেই। কত মেয়ের পানে চোখ যায় তার। চোখের পিছুপিছু মনও উড়ে বসে অন্য ডালে। তাই মাহুতকে নিয়ে ভয় গৃহিণীর। মাহুতের মনে মায়া নেই। সে মন বাসা ছেড়ে বারবার পালায়—
‘বৈদ্যাশিয়া মাহুত তোমরা রে, তোমার কিসের মায়া।
নারীর ভাঙিয়া রে মাহুত যাইবেন ছাড়িয়া রে।।’

এদিকে প্রেমের জালে পড়া নতুন মেয়েটির পক্ষেও মাহুতকে বিশ্বাস করা কঠিন। মাহুতের ঘরে কয়টি নারী, সে শুধোয়। ‘সত্য করিয়া কন রে মাহুত ঘরে কয়জন নারী রে।’

চোখ বন্ধ করলেই কানে যেন উজিয়ে আসে প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডের গলায় গাওয়া প্রশ্নোত্তরের ছাঁদে সেই গোয়ালপরিয়া গানটি। গোয়ালপাড়ার আকাশ, বাতাস ছেনে যেন যন্ত্রণা বুনেছিলেন গানে প্রতিমা বড়ুয়া। গৌরীপুরের মেজো রাজকুমার প্রকৃতিশচন্দ্র বড়ুয়া তথা লালজির বড়ো মেয়ে তিনি। গদাধর নদীর পাড়ে পাড়ে ঘুরে বেড়াতেন মাহুতদের সঙ্গে। তাদের গলা থেকেই তুলে নিতেন গান।   

আর মেজো রাজকুমার প্রকৃতিশচন্দ্র বড়ুয়া তো কিংবদন্তী। হাতি নিয়েই তাঁর গোটা জীবন কেটেছে। পোষ মানিয়েছেন হাজারেরও বেশি হাতিকে। পোষ মানানো, শিকার—এগুলোর আড়ালে থাকা মানুষের ঘোরতর আধিপত্যের দর্শনটি মেনে নিয়েও বলা যায়, তাঁর মতো মানুষ দুর্লভ। হাতিদের প্রকৃতি এত ভালো হয়তো বুঝতে পারতেন না কেউই। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, বুনো হাতিদের পোষ মানানো হয় গান গেয়ে। একই কথা অবশ্য লিখে গেছিলেন তাঁর বোন নীহারবালা বড়ুয়াও। হিংস্র হাতিদের বশ করার জন্য সম্মিলিতভাবে একসুরে নাকি গাওয়া হয় গান। আর প্রকৃতিশচন্দ্র বড়ুয়া-র লেখা থেকে জানা যায়, সেই শিক্ষার শুরু হয় ‘হস্তীর কন্যা হস্তীর কন্যা বামুনের নারী’ গানটি দিয়েই। আর, এখানে এসেই কতগুলো জাদু-দরজা খুলে যায় গোয়ালপাড়ার হাতির গানের।

হাতির কন্যা নাকি বামুনের নারী? কেন? তার আড়ালে রয়েছে একটি উপকথা। সে কথায় পরে আসছি। তারও আগে আরেকটি কথা জানতে পেরে বিস্ময় লাগে, এই বামুনের মেয়ে গানটির আগে গাওয়া হয় আল্লাহ্‌ রসুলের আরাধনার গান—‘কোন মহালের হাতি রে ভাই হায় আল্লাহ্‌ রসুল।’ ধর্ম-নির্বিশেষে এই গানেই শুরু হাতির শিক্ষা। হাতি ধরতে যাওয়া মানুষদের মধ্যে থাকতেন বোরো, রাভা, নেপালি, রাজবংশী, বিহারের মুসলমান, অসমিয়ার নানা মূলনিবাসী মানুষ। বহু সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটত হাতিকে ঘিরে। আর, হাতির গানে তাই যেন মুছে যায় সম্প্রদায়ের, ধর্মের দেওয়ালগুলো। আল্লা রসুলের আরাধনার গান গড়িয়ে যায় বামুনের কন্যা হাতির মেয়ের উপকথায়। এ যদি আমার দেশ না হয় তো কার দেশ বলো!

আর, উপকথাটিও যে কী মায়া-মাখানো। রাজবাড়ির হাতিশালের সর্দার যাদু জমাদারের মুখ থেকে শোনা সেই গপ্প লিখে গেছেন নীহারবালা। ভুটান পাহাড় থেকে গভীর বনের ভিতর দিয়ে বয়ে চলেছে দ্যাওয়া-সিয়া নদী। এই নদী নাকি দৈব নদী। এই নদীর পাড়েই বাস ব্রাহ্মণ জয়নাথ আর তাঁর স্ত্রী জয়মালার। দরিদ্র কুঁড়ে আলো করে আছে প্রেম। একদিন অর্থের লোভে ঘরে দ্বিতীয় স্ত্রী আনে জয়নাথ। বড়োলোকের মেয়ে। দেখতে দেখতে কুঁড়ের পাশে ওঠে তিনমহলা বাড়ি। জয়নাথ ভুলেই যায় জয়মালাকে। জয়মালা রোজ জল আনতে যায় নদীর পাড়ে। তার চোখের জল এসে মেশে নদীতে।

সেই নদীতেই জল খেতে আসে হস্তীরাজার দল। একদিন হাতির রাজা দেখে নদিতে ভাটির জল নোনা। কেন কেন? সঙ্গীরা জানায় জয়মালার কথা। তার কান্নার জলেই নোনা হয়ে গেছে নদীর জল। হাতির রাজা তখন জয়মালাকে ডাকে। বলে, ‘রানি হবে আমাদের?’ হঠাৎ নদীর জল উপচে ভেসে যায় জয়নাথের তিনমহলা বাড়ি আর জয়মালাকে শুঁড়ে করে মাথায় তুলে হাতির রাজা নিয়ে যায় নিজেদের দেশে। সাত-সাতটি ঝরনার জল মাথায় ঢালতেই জয়মালা রুপান্তরিত হয় হাতিতে। মাথার তামকলসী হয় কপালের ঘট, হাতে সোনার ঝারি হয় সোনারঙের শুঁড়। সেই থেকে হাতিদের রানি ‘বামুনের নারী’ জয়মালাই।

উপকথায় জড়িয়ে যায় কত গোপন ঐশ্বর্যের দর্শন, যন্ত্রণার ইতিকথা, কত গোপন স্বপ্নের রং। সেইসব দর্শন, স্বপ্ন, অনুভূতিরা সমাজের আবহমানের সঞ্চয়। আর সেই উপকথা, দর্শন, সঞ্চয়, হাতি, বন, জীবন, বিরহ, প্রেম, অপেক্ষাই নতজানু হয় সুরের কাছে। মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। হাতির গান জন্ম নেয় গোয়ালপাড়ায়। সীমানা পেরিয়ে ভেসে ভেসে যায় দূরে-দূরান্তরে। সেই গান কানে গেলে নাকি শান্ত হয় বন্দি হাতি। চোখ বুজে আসে তার। চোখ বেয়ে নামে জল। সেই একই জল কখন বা বয়ে যায় মাহুতের ঘরে অপেক্ষায় থাকা বউটির চোখেও।

এমন দেশেই তো হাতির কন্যে আর বামুনের নারীরা একাকার হবেন গানে ও যন্ত্রণায়। 
 

তথ্যঋণ: ‘ও মোর হায় হস্তীর কন্যা রে’, মধুময় পাল, বাতিঘর, একাদশ বর্ষ, চতুর্দশ সংকলন, বইমেলা ২০১৯

Developed by DXDasia