
চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছিলেন তাঁর ক্ষিপ্ত-ক্ষুরধার কণ্ঠস্বর
“এটাই সেই সময়, যখন সম্মানের সঙ্গে অর্জিত পদকগুলি অপমানের অসঙ্গতিপূর্ণ প্রেক্ষাপটে লজ্জিত হয়। আমার পক্ষ থেকে সব বৈষম্যকে বাদ দিয়ে সেইসব দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতে চাই, যাঁরা তাঁদের তথাকথিত তুচ্ছতার জন্য, মানবিক অধঃপতনের শিকার হয়েছেন।”
১৯১৯-এর জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর ব্রিটিশ নাইট উপাধি ত্যাগ করতে চেয়ে রবীন্দ্রনাথ যে চিঠি লিখেছিলেন, এই হলো তার নির্যাস। সেই কিংবদন্তি চিঠি, যা সুভদ্র-সৌম্য কবির প্রতিবাদী ভাবমূর্তিটি উন্মোচিত করে।
এর বারো বছর পর, তিনিও আরও একটি চিঠি লিখেছিলেন, যার উল্লেখ খুব একটা মেলে না। তবে, সেটি ছিল আগের চিঠির থেকে আরও ক্ষিপ্ত ও ক্ষুরধার। ১৯৩১ সালের ১৩ অক্টোবর, রবীন্দ্রনাথ যখন স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য দার্জিলিং যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেই সময় হিজলিতে গুলি চালানোর খবর পান। দুই তরুণ ব্রিটিশ পুলিশ নিরস্ত্র বন্দী সন্তোষ কুমার মিত্র এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্তকে গুলি করে হত্যা করে সেখানে (১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১, ডিটেনশন ক্যাম্প)।

১৯৩১ সালের ১৩ অক্টোবর, রবীন্দ্রনাথ যখন স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য দার্জিলিং যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেই সময় হিজলিতে গুলি চালানোর খবর পান। সেখানে ব্রিটিশ পুলিশ দুই তরুণ নিরস্ত্র বন্দী, সন্তোষ কুমার মিত্র এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্তকে গুলি করে হত্যা করে।
ঘটনাটি ঘটেছিল যখন ব্রিটিশ পুলিশ ক্যাম্পটি ঘেরাও করেছিল। পরে বন্দীদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে গুলি চালায়। সন্তোষ কুমার মিত্র’র পেটে এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্ত’র কপালে গুলি লাগে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের ক্ষোভ বাড়তে থাকলে, রবীন্দ্রনাথ দার্জিলিং থেকেই ১৯৩১-এর ২ নভেম্বর স্টেটসম্যান-কে সম্মোধন করে লেখা একটি চিঠিতে, লক্ষ লক্ষ ভারতীয়দের কাছে তাঁর ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর তুলে ধরেন। যে চিঠি পরে সম্পাদনা করেছিলেন আলফ্রেড এইচ ওয়াটসন। চিঠির শুরুটা ছিল এইরকম, “আমরা সম্প্রতি একটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কাগজে দেখেছি, যে ওয়ার্ডারদের জন্য সহানুভূতিশীল ধর্মীয় (খ্রিস্টান) অনুভূতির অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়েছে বারবার, তারাই হিজলিতে বন্দীদের দায়িত্বে ছিল এবং হত্যা করেছিল।”
একই অনুচ্ছেদে, ‘স্নায়বিক চাপে’ পড়ে গুলি চালানোর তীব্র নিন্দা করে লেখেন, “এই উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা – যারা স্বাধীনতা এবং আত্মসম্মান উপভোগ করে, আরামদায়ক ব্যবস্থাপনায় থাকে, যারা অন্ধকারের আড়ালে কারাগারের নিরাশ্রয়-অসহায় বন্দীদের ওপর বর্বরচিত ভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, কাগজে তাদের প্রতিই কোমল মনোভাবের অনুচ্ছেদ লিখে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।”
এভাবেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর যাবতীয় সংযম ঝেড়ে ফেলেছিলেন। পরিমার্জিত বিশ্ব নাগরিকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল ক্ষুব্ধ ভারতীয়। একটি তথাকথিত সভ্য সরকারের ভণ্ডামিকে চ্যালেঞ্জ করে গমগম করে উঠেছিল বন্দুকের নল। আশ্চর্যের বিষয় যে ওয়াটসন চিঠিটি ছাপতে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং ফেরত দিয়েছিলেন অমল হোমকে, যে গেজেট থেকে এই অংশটি নেওয়া হয়েছে তার সম্পাদক এবং যিনি ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের পক্ষে চিঠিটি ওয়াটসনকে পাঠিয়েছিলেন।
উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন যেসব ব্যক্তিরা অন্ধকারের আড়ালে নিরাশ্রয়-অসহায় বন্দীদের ওপর বর্বরচিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, কাগজে তাদের প্রতিই কোমল মনোভাবের অনুচ্ছেদ লিখে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
“ড. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা অন্য কারও থেকে এমন একটি চিঠি প্রকাশ করতে অস্বীকার করছি, যেখানে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে যাঁদেরকে এই পরিপ্রেক্ষিতে কখনও বিচার করা হয়নি। আমি আপনাকে চিঠি ফেরত দিচ্ছি।”অমল হোমকে লেখেন ওয়াটসন।
সৌভাগ্যবশত, অপ্রকাশিত চিঠিটি আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছিল। চিঠিটির বিষয়বস্তু ওয়াটসনের প্রত্যাখ্যানের কিছু দিন আগেই সর্বজনীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩১ সালের অক্টোবরে দার্জিলিং যাওয়ার আগে, গুলি চালানোর প্রতিবাদে টাউন হলে একটি জনসভার নেতৃত্ব দেন রবীন্দ্রনাথ এবং এত বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন যে সেই জমায়েতকে শহিদ মিনারের পাদদেশে, ময়দানে স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল।
প্রখ্যাত আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তকে পাশে রেখে, রবীন্দ্রনাথ বিশাল সমাবেশে তাঁর চিঠিটি পড়ে শোনান, যা সাধারণ নাগরিকদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ স্বরূপ সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে যায়। এরপরও, স্টেটসম্যান চিঠিটি প্রকাশের জন্য উপযুক্ত, গুরুত্বপূর্ণ কোনও কারণ খুঁজে পায়নি।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে, চিঠিটি শাসক এবং শাসিত উভয়ের জন্যই সংযম রাখা ও সহিংসতার অন্তহীন চক্রকে থামানোর বার্তা দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ মনে করেছিলেন, অসংযম এবং সহিংসতা যুক্তির উভয় পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি লিখেছেন, “রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ করা সাধারণ মানুষের জন্য স্বাভাবিক হতে পারে, তবে তা কখনই রাষ্ট্রনায়ক বা শাসকের জন্য বুদ্ধিমানের পরিচায়ক নয়।”
বর্তমানে আমাদের অস্থির সময়ে, এই কথাগুলিই আজ অবাস্তবভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
সূত্র: Calcutta Municipal Corporation Gazette’s Tagore Memorial Special Supplement, published September 13, 1941
