রাজ্য সরকারের উদ্যোগে কলকাতায় চন্দন গাছের পকেট গার্ডেন

ভারতীয় চন্দন কাঠ হলো বিশ্বের সবথেকে দামি চন্দন কাঠ

ন্দন গাছ ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ এবং হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রতিভূ। যার বৈজ্ঞানিক নাম স্যান্টালুম অ্যালবাম (Santalum Album)। সংস্কৃত ভাষায় নাম চন্দন। প্রাচীন ভারতের সঙ্গে অন্যদেশের বাণিজ্য সামগ্রী হিসাবে অন্যতম প্রধান ছিলো চন্দন কাঠ। বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি গাছ। চন্দন কাঠ (Sandalwood) তার মনমাতানো সুগন্ধের জন্য জগৎবিখ্যাত। আর একটি কারণ হলো চন্দন কাঠের তৈরি মূর্তি। কাঠের মূর্তি তৈরি করার জন্য চন্দন কাঠ অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক উপাদান। অতি প্রাচীন সময়কাল থেকেই চন্দন গাছ তার সুগন্ধ আর ভেষজ গুণাবলির জন্য প্রসিদ্ধ। পরম্পরাগত ভাবে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে চন্দনের ধূপ পোড়ানোর রেওয়াজ বহুবছরের। চন্দন কাঠ থেকে তৈরি হতো বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। চন্দনের ব্যবহার একাধিক- পারফিউমে, প্রসাধনীতে, অ্যারোমাথেরাপি এবং ঔষধি তৈরিতে।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তর কলকাতার বিভিন্ন অংশে চন্দন গাছের পকেট গার্ডেন এবং রাজ্য জুড়ে চন্দন গাছের বন তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে যে, শহরের যে অংশে ১০ হেক্টর ফাঁকা জমি আছে, সেখানে আর্বান ফরেস্ট পকেট বা নগর বাটিকা বন তৈরি করা হবে। রাজ্য বন দপ্তর এই প্রকল্পের জন্য রাজ্য সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে গিয়েছে। তারা দক্ষিণ ভারত থেকে প্রায় ১ কোটি চন্দন গাছের চারা নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে।

অপরদিকে, একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়েছে, যাঁরা বিভিন্ন জেলায় যাবেন। তাঁরা জমি জরিপ এবং মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন, কোন অঞ্চলগুলি চন্দন গাছ লাগানোর জন্য উপযুক্ত। এই প্রকল্পটি শুরু হবে সবুজশ্রী স্কিম-এর অধীনে। এই স্কিমটি ২০১৬ সালে শুরু করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এই প্রকল্পটি রাজ্যের বন দপ্তর, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর এবং স্বাস্থ্য পরিবারকল্যাণ দপ্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ। এই প্রকল্পের অধীনে, রাজ্যের সমস্ত সদ্যোজাত শিশুকে একটি চন্দনের চারা উপহার হিসেবে দেওয়া হবে। শিশুটির পরিবার নিজেদের জমিতে সেই চারাগাছ রোপণ এবং লালন পালন করবে। এর ফলে রাজ্যের প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যত জীবনের আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং গোটা রাজ্যের সবুজায়ন করা, দুটি লক্ষ্যই একত্রে পূরণ করা সম্ভব হবে।

রাজ্যের বর্তমান বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক প্রকল্পটি নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। তাঁর মতে, যদি দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে চন্দন গাছ রোপণ করা এবং চন্দন বনের প্রসার করা সম্ভব হয়ে থাকে, তবে পশ্চিমবঙ্গেও তা সম্ভব। চারাগুলি রোপণ করার পর রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সবরকম পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চারাগাছগুলির চারিদিকে বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হবে। রেড রোড সংলগ্ন ময়দান এলাকাতে চন্দন গাছের চারা রোপণ করার জন্য, ইতিমধ্যেই ইস্টার্ন কমান্ড আর্মির সদর দপ্তর ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে।   

ভারতে চন্দন গাছ পাওয়া যায় দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চলের শুষ্ক পর্ণমোচী অরণ্যে। গাছগুলি সর্বোচ্চ পরিমাণে মেলে কর্ণাটকে। এছাড়াও পাওয়া যায় মহারাষ্ট্রের সংলগ্ন জেলাগুলিতে, তামিলনাড়ু, কেরল এবং অন্ধ্রপ্রদেশে। অনুকূল পরিবেশে গাছগুলি প্রাকৃতিক উপায়ে পুণ উৎপাদিত হয়, বেড়ে ওঠে এবং সারা অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঘন অরণ্যে, চন্দন কাঠের সুগন্ধযুক্ত অংশটি তৈরি হতে কমপক্ষে ৭ বছর সময় লাগে। চন্দন গাছকে ১৫ থেকে ২০ বছর বেড়ে ওঠার সময় দিয়ে তারপার তার থেকে বিভিন্ন অংশ সংগ্রহ করা হয়, যাতে গাছের সুগন্ধি অংশটি বেড়ে ওঠার সময় পায়। চন্দন গাছ একটি হেমি-প্যারাসাইটিক উদ্ভিদ, অর্থাৎ এদের বৃদ্ধির জন্য একটি উপযুক্ত হোস্ট গাছ প্রয়োজন, যার কাছ চন্দন গাছ জল ও পরিপোষক পদার্থ সংগ্রহ করে। চন্দন গাছের শিকড় এবং কান্ড, দুটিই অত্যন্ত মূল্যবান। তাই চন্দন কাঠ সংগ্রহের সময় গাছটিকে গোড়া থেকে তুলে ফেলা হয়। কিছু বিশেষ পদ্ধতিতে চন্দন গাছকে তার হোস্ট গাছের কান্ড থেকে আলাদা করা হয়।

কিন্তু চন্দন কাঠ আদতে কী এবং কেনই বা সেটি এত মূল্যবান? ‘চন্দন’ শব্দটি বিভিন্ন প্রজাতির গাছকে নির্দেশিত করে, যারা সকলেই স্যান্টালুম গোষ্ঠীর অন্তর্গত। বিভিন্ন প্রজাতির চন্দন গাছের মধ্যে ভারতীয় চন্দন গাছ সবথেকে দামি। ভারতীয় চন্দনে সর্বোচ্চ মাত্রায় এ-স্যান্টালল (A-Santalol) এবং বি-স্যান্টালল (B-Santalol) পাওয়া যায়। এই রাসায়নিক পদার্থ দুটিই চন্দন কাঠের রাজকীয় সুগন্ধের জন্য দায়ী। ভারতীয় চন্দন কাঠ থেকে প্রাপ্ত তেল খুবই উচ্চমানের অ্যান্টিসেপ্টিক। চন্দন কাঠের তেলের এই গুণ আসে বি-স্যান্টালল থেকে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিইয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অফ নেচারের (IUCN) পক্ষ থেকে স্যান্টালল অ্যালবামকে বিপন্ন প্রজাতি রূপে ঘোষণা করা হয়েছে। চন্দন গাছের বিপন্ন হয়ে পড়ার পিছনে উল্লেখযোগ্য কারণ গুলি হলো অতিরিক্ত পরিমাণে চন্দন কাঠ সংগ্রহ করা, বারবার চাষ করার ফলে ভূমিক্ষয়, দাবানল, স্পাইক রোগ, কৃষিকাজ এবং জমি পরিষ্কার করা।

Developed by DXDasia